মধুসূদনের হিন্দু পুরাণ অবলম্বণ ও বাঙালী মুসলমানের ‘সরকারী বৈশাখ’ অনুসন্ধান

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সূচনায় কবি মাইকেল মধুসূদর দত্ত সরস্বতী বন্দনা করে লিখেছেন-

 

“হায় মা, এ হেন পুণ্য আছে কি এ দাসে?

কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে

মূঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি সমধিক। উর তবে, উর দয়াময়ি…”

 

আমাদের ফেইসবুক ‘বামুন নাস্তিকদের’ ‘হিন্দুয়ানী’ ছুতমার্গ এড়িয়ে ‘সহি নাস্তিক’ হওয়ার তড়িকায় মাইকেল মধুসূধন দত্তের ‘বিজেপি কানেকশন’ কিংবা তার ‘হিন্দুয়ানী সাহিত্য’ এখনো কেন খোঁজা শুরু হয়নি সেটার একটা কারণ হতে পারে মধুসূদন রবীন্দ্রনাথের মত বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতে বিপুল প্রভাব বিস্তার করে বসতে পারেননি। যদিও কবি হিসেবে মাইকেল মনে হয় বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বড়। সেটা ভিন্ন বিতর্ক এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ‘অহিন্দু’ হওয়ার পরও, তার কাব্যনাট্যে কালি মূর্তি আছাড় দিয়ে ফেলার মত ঘটনা থাকার পরও, খিস্টান ধর্মের আদলে জন্ম নেয়া ‘ব্রাহ্ম’ ধর্মের অনুসারী হওয়ার পরও তিনি ‘হিন্দুয়ানী’ এমন অভিযোগ পেতে হয়েছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে মাইকেল তার কাব্য রচনা করতে গিয়ে যীশুর লাস্ট সাপার, তার ক্রুশ বিদ্ধ হওয়ার মত বেদনাবিধুর ঘটনাকে বেছে নিলেন না কেন? তিনি হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ‘বাঙালী খ্রিন্টান’ সম্প্রদায়ের নিজস্ব ‘তমুদ্দিন’ ‘তাহজীব’ তুলে না ধরে কেন হিন্দু পুরাণ থেকে কাব্যের বিষয় বেছে নিলেন? মধুসূদন যদি হিন্দু থেকে মুসলমান হতেন, তাহলে কি তিনি মেঘনাদবধ কাব্য লিখতেন? নাকি মীর মোশাররফ হোসেনের মত আরবের ইতিহাসকে কাব্যে স্থান দিতেন?

 

মাইকেল প্রখম জীবনে ইউরোপীয়ান হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি তাঁর কপোতাক্ষ নদে ফিরে এলেন, তখন তাঁকে নিজস্বতাকে অবলম্বন করে সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে ‘হিন্দুয়ানী’-তে ফিরে আসতে হযেছিলো। এই ভূমির সবটাই ‘হিন্দুয়ানী’। এটাকে ত্যাগ করলে মাইকেলকে পুরোপুরি ইউরোপীয়ান খিস্টান হতে হত। বাঙালী মুসলমান ‘হিন্দুয়ানী’ ত্যাগ করলে যা অবশিষ্ঠ থাকে তা আরবী অবয়ব। পূর্ববঙ্গে কৃষকের পাট বেচা টাকায় রাধাকৃষ্ণ কিংবা মনসা মঙ্গল পাঠ করতে না চাইলে বাঙালী মুসলমান তার নিজের জন্য ‘সোহরাব রুস্তম’ বেছে নিয়েছিলো। কিন্তু সোহরাব রুস্তম তার নিজস্ব কি? যদিও এই মহাকাব্য প্রাক-ইসলামী যুগের সময়কে ধারণ করে আছে। তবু পারস্য তুর্কি আরবী ভূখন্ড এই অঞ্চলের মানুষের কাছে মুসলমানদের পূর্বপুরুষদের গৌরব নিশানা!

 

ফেইসবুকে অবরোধ থাকার সময় বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে একজন ইনবক্সে খোঁচা দিতেই বোধহয় লিখলেন, আপনাকে কোন বৈশাখের শুভেচ্ছা জানাবো, ‘সরকারী বৈশাখ’ নাকি ‘হিন্দু বৈশাখের’? আমি বললাম, সরকারী মানে ‘মুসলমান বৈশাখের’?

 

আমি ‘হিন্দু বৈশাখ’ কথাটাকে এখন আর অগাহ্য করি না। কারণ কথিত ‘হিন্দু বৈশাখ’ শুধু যে সনাতন ধর্ম সম্প্রদায় লোকনাথ পঞ্জিকা অনুসারে পালন করে তা নয়, বাংলাদেশে আদিবাসীদের মধ্যে বর্ষবরণের সময়ক্ষণও সেই কথিত ‘হিন্দু বৈশাখ’ অনুসারে। কিন্তু সরকারী ওরফে মুসলমান বৈশাখ সৃষ্টি হয়েছিলো পাকিস্তান আমলে। বাঙালী মুসলমানকে হিন্দুদের থেকে পৃথক করতে না পারলে বাঙালী মুসলমানকে পাকিস্তানের মুসলিম জাতি হিসেবে কখনোই সুদৃঢ় করা যাবে না এই ভাবনা আইয়ুব খানের ছিলো। খুব সম্ভবত তার সময়কালে বাংলা ক্যালেন্ডার সংশোধন করে ১৪ এপ্রিল ফিক্সড করা হয়। সেই ক্যালেন্ডার তখন বাস্তবায়ন না হলেও এরশাদ শাহী তার সময়ে বাস্তবায়ন করে মূলত হিন্দুদের সঙ্গে ৯০ ভাগ বাংলাদেশী মুসলমানের সংস্কৃতিগত অনৈক্য সৃষ্টি করতে। এরশাদ এ দেশের আইডোলজির বাইরের কেউ নন। তিনিও ‘বাঙালী মুসলমানের নিজস্বতা’ অন্বেষণকারী সৃষ্টিশীল কবি সাহিত্যিকদের চিন্তার বাইরে কিছু করেননি। তাই ‘হিন্দুয়ানী বৈশাখ’ হলো আদি বৈশাখের পঞ্জিকা। সে হিসেবে মাইকেলও মেঘনাদবধ লিখে স্পষ্ট ‘হিন্দুয়ানী’ প্রমাণ করেছেন?

 

লেখাটি শেষ করার আগে আরেকটি কথা বললে মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না, মধুসূদন রাম-লক্ষণকে ‘পামর’ বলেছেন তার কাব্যে। পামর অর্থ হচ্ছে ‘দুর্বৃত্ত, অধম, নীচ, পাপী’। এসব লিখেও মাইকেলকে কোন মন্দিরের পুরোহিত পান্ডা মাথার মূল্য ঘোষণা করেনি। আশ্চর্য যে মেঘনাদবধ কাব্য লেখার পর মাইকেলকে নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিলো। দুইশো বছর আগেও এই অঞ্চলের মানুষ কতখানি ধর্মীয় সহিষ্ণু ছিলো চিন্তা করুন। মাইকেল লিখেছেন-

(মেঘনাদ বলছেন)-

“ পিত:, বুঝিতে না পারি!

কিন্তু অনুমতি দেহ; সমূলে নির্মূল

করিব পামরে আজি! ঘোর শরানলে

করি ভষ্ম, বায়ু-অস্ত্রে উড়াইব তারে”

 

মাইকেল এই যুগে জন্মালে আরএসএস তাঁকে না জানি সালমান রুশদী বানিয়ে দিতেন! বলছি এখান থেকে শেখার আছে। সহিষ্ণুতা মানে হীনতা নয়। ইসলামিক অসহিষ্ণুতা থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কিছু নেই। ইসলামিকের এই দপ করে জ্বলে যাওয়া মানে আখেরে তাদের দ্রুত নিভে যাবার আভাস। তাই ভারতবর্ষকে (ভারত রাষ্ট্র অর্থে নয়) এখানে থেকেই শেখার আছে। সহিষ্ণুতার বিকল্প নেই। আর ‘বাঙালী মুসলমানের নিজস্বতা’ আসলে কোথায়, কোন মহাদেশে তার শিকড় তা বুঝতে মিশরীয়দের পিড়ামিড মমি ফারাওদের নিয়ে গর্ব, পারস্যদের পৌত্তলিক যুগের সাহিত্যকে পূর্বপুরুষদের কীর্তি হিসেবে গর্ব করা থেকে শিখে নিতে পারে। তবু, এই লেখা পড়ে বা না পড়ে, যারা আমার বিজেপি আরএসএসের পয়সা খাওয়া কল্পনা করে মনের রাগ প্রশমন করতে চাইছেন- সেটা আমি জানি, মেঘনাদের মত ‘এতক্ষণে’ বুঝলাম তা নয়, সবটাই পন্ডশ্রম জেনেও নিজের মনের দায় মেটানোর জন্যই লেখা। বাঙালী মুসলমান কখনই তার নিজস্বতা খুঁজে পাবে না! মেঘনাদ তার ‘রাজাকার’ চাচা বিভিষণের উদ্দেশ্যে যে কথা ক’টি বলেছিলেন, লেখাটি শেষ করছি তার কিছু উল্লেখ করে-

“এতক্ষণে”- অরিন্দম কহিলা বিষাদে,
“জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল
রক্ষপুরে! হায়, তাত, উচিত কি তব এ কাজ?

নিকষা সতী তোমার জননী!
সহোদর রক্ষ:শ্রেষ্ঠ!
শূলিশম্ভুনিভ কুম্ভকর্ণ!
ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী!

নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?

(এখানে লক্ষণকে তস্কর মানে ‘চোর’ বলা হচ্ছে! মাইকেলের ফাঁসি চাই)!

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix