হ্যারি হুডিনি

“হ্যারি হুডিনি” নামটি প্রথম শুনি একদম শৈশবে। খবরে কাগজে ওকে নিয়ে একটা ফিচার পড়েছিল। আমার একটা খাতায় দুনিয়ার সব আজব-অদ্ভূত-রহস্যময় কোন তথ্য পেলে তাকে আঠা দিয়ে সেঁটে রাখতাম। শৈশবের সেই ইচ্ছেরঙিন খাতাটি কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে।… হুডিনি জাদুশিল্পী- সর্বকালের সেরাদের অন্যতম। এটুকুই জানতাম। কিন্তু জানতাম না তার আধুনিক মনটি। জানতাম না আধ্যাত্বিকবাদী ভন্ড প্রতারক গণক-জ্যোতিষিদের মুখোশ খুলে দিতেন তিনি। যেন একালের প্রবীর ঘোষ! প্রবীর ঘোষ যেমন ঈশিতা নামের একজন ডাইনীকে তার প্রতারণা ধরিয়ে দিয়ে প্রকাশিত করেছিলেন হুডিনি তেমনই তখনকার একজন পেশাদার প্লাণচ্যাটকারীকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছিলেন। জানি না, প্রবীর ঘোষ হুডিনি দ্বারা অনুপ্রেণিত কিনা…।

সেদিন হিস্টোরি চ্যানেলে শৈশবের রহস্য মানব হুডিনিকে নিয়ে একটা প্রোগ্রামটা দেখলাম। হুডিনিকে নিয়ে যে সিনেমাটা তৈরি হয়েছিল সেটাই দেখাচ্ছিল। দ্য পিয়ানিস্ট খ্যাত অভিনেতা এড্রিয়েন ব্রডির (আমার প্রিয় অভিনেতাদের একজন) হুডিনি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। হুডিনি সাধারণ গরীব ইহুদী ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। লেখাপড়া তেমন নেই। ভবিষ্যতে জাদু দেখিয়ে মানুষকে বিনোদন দেয়াই তার পেশা হবে। কিন্তু এই “জাদুকে” তিনি বিজ্ঞানের কৌশল আর তার নিজের দক্ষতা ছাড়া অন্য কোন নেপথ্য কারণ বলতে নারাজ। অথচ অনেকেই তাকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করতেন। সেই ১৯২৫ সালে যখন তিনি খ্যাতির তুঙ্গে তখন নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকার হিসেবে ঘোষণা করলে তার প্রতাপ-প্রতিপত্তি বেড়ে যেতো আরো। কিন্তু তিনি সব সময়ই বলছেন, না, তিনি কোন অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করেন না কারণ তিনি তার কোন প্রমাণ পাননি। হুডিনির জীবনে তারপর তার মায়ের মৃত্যুতে একটা নাটকীয় পরিবর্তন চলে আসে। হুডিনি প্ল্যানচ্যাটের মাধ্যমে তার মৃত মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চান কারণ আত্ম নিয়ে কাজ করা “অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারীরা” তাকে জানিয়েছে তারা তাকে তার মৃত মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন। হুডিনি ইংলেন্ডের তখনকার নামকরা সব প্লাণচ্যাটকারীদের সভায় যান। আত্মা নেমে আসে। হুডিনির মায়ের আত্মা কথা বলে উঠে। কিন্তু হুডিনির চোখকে ফাঁকি দেয়া তো ছেলেখেলা নয়। প্রতারকদের হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ১০ হাজার ডলার ঘোষণা করেন হুডিনি- কেউ যদি তাকে আধ্যাত্বিকতাকে প্রমাণ করে দেখাতে পারেন তাকে দেয়া হবে টাকাটা…।

সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল ছিলেন একজন অলৌকিক ও আধ্যাত্বিকে বিশ্বাসী মানুষ। এটি কোন বড় ঘটনা নয়, বড় ঘটনা হলো তিনি সে সময় এ বিষয়ে নানারকম বক্তৃতা, সেমিনারের আয়োজন করে প্রচারও চালাতেন। হুডিনির জাদুশিল্প দেখে তিনি মুগ্ধ ছিলেন। হুডিনিকে বলেন, আপনার নিশ্চয় আধ্যাত্বিক ক্ষমতা আছে নইলে কেমন করে খেলাগুলো দেখান! হুডিনি অস্বীকার করেন তার অলৌকিক ক্ষমতাকে। তিনি বলেন এসব তার নিজস্ব কৌশল। স্যার আর্থার একজন শিক্ষিত মানুষ। পেশায় ডাক্তার। তার মত মানুষ কেমন করে প্লাণচ্যাটের মত প্রতারণাময় একটা কাজের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন ভাবলে বিস্মিত হতে হয় যখন তারই হাত দিয়ে কঠিণ যুক্তিবাদী চিন্তাশীল শার্লক হোমসের মত চরিত্র বেরিয়ে আসে! স্যার আর্থারের স্ত্রী প্লাণচ্যাটে আত্মা নামানোর দাবী করতেন। হুডিনিকে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়ার কথা বলেন তিনি। ইংলেন্ডের সেই সমাজে স্যার আর্থারের প্রতাপ-প্রতিপত্তি ছিল সাংঘাতিক। লেডি আর্থারকে সেরকম বাস্তবতায় প্রতারক বলে ঘোষণা করা, তাও গণমাধ্যমে- চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু প্রতারকদের বিষয়ে হুডিনি তখন যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ফাঁস করে দেন স্যার আর্থার দম্পত্তির মিথ্যাচার। মানুষকে ঠকানো, সরল বিশ্বাসী মানুষদের বিশ্বাসকে পুজি করে এইসব আধ্যাত্বিকবাদীদের মুখোশ উন্মোচনে নেমে পড়েন হুডিনি। চ্যালেঞ্জের পুরস্কারের টাকাও বাড়িয়ে দেন হুডিনি- যদি কেউ তাকে প্রমাণ দেখাতে পারেন অতিপ্রাকৃত কিছু আছে তাহলে তিনি পাবেন ২৫ হাজার ডলার!…

হুডিনি জানতেন এইসব প্রতারকদের সমাজে খুটির জোর কতদূর এবং এসব করতে গিয়ে তার পরিণতি কি হতে পারে। হয়েছিলও তাই। এক আঁততায়ীর আক্রমণে ভীষণভাব আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা যান এই জাদুশিল্পের মহান মানুষটি। না দেখে, যাচাই না করে বিশ্বাস না করার যে ব্রত তিনি তার সময়ে কঠিনভাবে জারি রেখেছিলেন, ইউরোপের তখনকার তরুণদের মধ্যে নিশ্চয় তার একটা প্রভাব ফেলেছিল যুক্তি ও যাচাইকে প্রাধান্য দেয়ার, তার জন্য তিনি আমার কাছে শ্রদ্ধ ও ভালবাসায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন…।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix