হযরত মুহাম্মদের আগমনী বার্তা কি ইহুদী-খ্রিস্টানদের কিতাবে উল্লেখ আছে?

ছোটবেলায় বড়দের মুখে শুনতাম গৌতম বুদ্ধ তার শিষ্যদের কাছে হযরত মুহাম্মদের আগমনের সংবাদ পৌঁছে দিয়ে বলেছিলেন তিনি যা করতে বলবেন তা শুনতে কিন্তু বুদ্ধের মৃত্যুর পরে শিষ্যরা সেটা না করে নিজেদের মত ধর্ম চালাতে থাকে। …এখন জানি গৌতম বুদ্ধ ঈশ্বর, স্বর্গ, নরক বিবর্জিত একটি নাস্তিক্য মতবাদ প্রচার করেছিলেন। উনার “ধর্মে” ঈশ্বর পরকালের কোন স্থান নেই। সেখানে কেমন করে মুহাম্মদের আগমন বার্তা তিনি প্রচার করেন এখন ভাবলে হাসিই পায়। একজন সাধারণ মুসলিম জ্ঞান হবার পর থেকে কিছু কমন বিষয়ে বিশ্বাস রাখে যেমন- শুধুমাত্র মুসলিমরাই বেহেস্তে (এখন জান্নাত বলার চর্চা দেখছি!) যাবে, বাকী অমুসলিমরা সব দোযগে প্রবেশ করবে। হযরত মুহাম্মদ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং উনার আগমন বার্তা দুনিয়ার সমস্ত ধর্মীয় কিতাবে উল্লেখ ছিল যা কফেররা হীন স্বার্থে বিকৃত করে ফেলেছে। সাধারণ মুসলমানের এসব বিশ্বাস করতে কোন কিতাব লাগে না। তারা এগুলো কুসংস্কারের মত পরিবার থেকে পায়। তাদের ধারণা অন্য ধর্মে হযরত মুহাম্মদের নামধাম, ঠায়-ঠিকানা, বাবা-মার নামধাম, বংশ-ঠিকজি মায় মক্কার আবদুল মোতালিবের নাতি উল্লেখ করে বুঝি লেথা ছিল! ব্যাপারটা আসলে তা নয়। এরকম লেখা থাকলে কথিত হযরত মুহাম্মদ ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মানোর আগে এরকম আরো বহু হযরত মুহাম্মদ জন্মাতো! এ যাবত কালে কথিত “ঈমাম মেহেদী” জন্মানোর সংখ্যাটা কত সেটা স্মরণ করলে বুঝতে পারবেন ধর্মীয় গ্রন্থে ভবিষ্যত নবীদের আগমনী বার্তা কি ফল বয়ে আনে। ইমাম মেহেদীর কিছু লক্ষণ ছাড়া ধর্মীয় বইতে কোথায় কোন বাড়িতে জন্মাবে এরকম কোন নিদের্শনা নেই। তাতেই এইসব ঈমাম মেহেদী দাবীকারীরা দেখিয়েছে ধর্মীয় বর্ণনা তার সঙ্গেই সবচেয়ে খাপেখাপ মিলে যায়! অথচ ইমাম মেহেদী তো একজনই হবেন- তাই না? এইসব ইমাম মেহেদীদের ভক্ত ও অনুসারীদের সংখ্যাও কিন্তু অনেক। তারাও মিল খুঁজে পান কিতাবের বর্ণনায় সঙ্গে। যেমনটা মুসলিম পন্ডিতরা খুঁজে পান তাওরাত কিংবা অন্যান্য ধর্মের কিতাবে হযরত মুহাম্মদের আগমনী সুসংবাদ! কি আছে তাহলে এইসব ভবিষ্যত বাণীতে? কি লেখা থাকে মহাপুরুষ সম্পর্কে?

আসলে বইয়ের মধ্যে “ক” অক্ষর আর কুত্তার লেজের মধ্যে “কলেজ” যেভাবে মিশে থাকে, (বইয়ের ক + কুকুরের লেজ = কলেজ!) এইসব নবীদের আগমনী বার্তা আসলে এরকমই কষ্ট কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। এসব নিয়ে আলোচনার আগে একটু বলে নেয়া ভাল যে, কেন ধর্মীয় বইগুলোতে ভবিষ্যতে আরেকজন নবীর আগমনের সংবাদ লেথা থাকে? কি উদ্দেশ্য এসবের? এর উদ্দেশ্য আসলে রাজনৈতিক। খেয়াল করুন মুসার বিদ্রোহ কিন্তু শাসক ফেরাউনের বিরুদ্ধে। ফেরাউনের স্বৈরাচারী শাসনে অতিষ্ট নিপিড়িত শোষিত জনগণকে একটা আন্দোলনে সামিল করতে ইহুদী ধর্মের সৃষ্টি। সে যুগে রাজাও হতেন ঈশ্বরের প্রতিনিধ নয়ত স্বয়ং ঈশ্বর। ফেরাউন ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর। নিজেদের সম্পর্কে এসব বললে জনগণ ভয়ে কোনদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না এটাই ছিল সম্রাটদের উদ্দেশ্য। যেমন রাজা দাউদ নিজেকে নবী বলতেন। তো একজন ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা স্বয়ং ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়তে হলে একজন ঈশ্বর প্রতিনিধি ছাড়া জনগণ তার পাশে আসবে কিভাবে। এভাবেই মুসার কিংবদন্তির মাধ্যমে ঈহুদী, যীশুর কিংবদন্তির মাধ্যমে খ্রিস্টান ধর্মের সূচনা। আর ইহুদীদের তাওরাত গ্রন্থে ভবিষ্যত আরেকটি ঈশ্বর প্রেরতি প্রতিনিধির কথা বলা হয়েছে রাজনৈতিক কারণেই যাতে সময় ও যুগ বিবেচনায় ধর্মকে পরিবর্তন করার জন্য মডিফাই করা যায়। খ্রিস্টান ধর্মটি তো ইহুদীদের একটা অংশ দাঁড়া করিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে অনেকগুলো ধর্মের সূচনা হয়েছে। যা পরবর্তীকালে সমকালিন সামাজিক-রাজনৈতিক চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতের ধর্মীয় জঞ্জালের পাহাড় সৃষ্টি করেছে। সেমেটিক ধর্মের এই তিন জঞ্জালের পাহাড় হচ্ছে ইহুদী, খ্রিস্টান আর ইসলাম।

অনুগ্রহ করে এই লেখাটিকে কেউ ভাববেন না যেন হযরত মুহাম্মদকে মিথ্যা প্রতিয়মান করাই একমাত্র উদ্দেশ্য, বরং লেখাটি বলতে চায়- এই জগতের সমস্ত জীবিত ও মৃত মানুষই জন্মেছিল কোটি কোটি তার সহধর প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে মাত্র একটি শুক্রাণুই শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকে বজায় রাখার মাধ্যমে। তাই এই জগতের সমস্ত মানুষই বাইচান্স জন্মেছেন! রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, গান্ধি, হযরত মুহাম্মদ, গৌতম বুদ্ধ, স্বামী বিবেকান্দ, শেক্সপিয়র- সবাই না জন্মে তাদের মায়ের গর্ভে অন্য কেউ জন্মাতে পারত! এটি গূঢ় চিন্তার বিষয়। বিগত এক-দেড়শো বছরের বিজ্ঞান মানুষকে জানিয়েছে- তুমি পূর্ব নির্ধারিত কেউ নও। কাজেই কারুর জন্মের কয়েক হাজার বছর পূর্বেই তার ভবিষ্যত বাণী মানুষের কল্পনা মাত্র। এ ধরণের প্রচারণার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হচ্ছে বংশ মর্যাদা, জাত্যাভ্যিমান, সামন্তবাদী রাজতন্ত্রকে ঐশ্বরিকভাবে সাধারণ অন্ত্যজ জনগণের কাছ থেকে সম্ভ্রম আদায় করা নেয়া। তাই দেখা যায় প্রাচীনকালে শুধু রাজাই ঈশ্বরের প্রতিনিধি হন। কয়েক পুরুষ নিজেদের নবী বলে দাবী করেন। ইব্রাহিমের পুত্রের সুসংবাদ পাওয়া, কৃষ্ণের জন্মের আগমনী বার্তা এসবই ছিল উদ্দেশ্য।

হযরত মুহাম্মদের নিজেকে নবী বলে ঘোষণার যত রকম সামাজিক আর রাজনৈতিক কারণ বা উদ্দেশ্য থাক, নিজেকে নবী বলে দাবী করতে তাকে তাওরাতের পুরাতন ও নতুন নিয়মে যে ভবিষ্যত নবীর আগমনের সুসংবাদ ঘোষণা করা হয়েছে, নিজেকে সেই বর্ণনার সঙ্গে মিলাতে হবে। তিনি নবী কিনা সেটি সেমিটিক ঐতিহ্য, লক্ষণ ও ভবিষ্যতবাণী দ্বারা প্রমাণ করতে হবে। কুরআন এই বিষয়ে কোন প্রমাণ দেখাতে পারেনি স্রেফ এটুকু বলা ছাড়া-

হে নবী! আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষি রূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী ও সাধারণ লোকদের প্রহরী রূপে…”- (সুরা আল আহযাব- ৩৩:৪৫)।

তবে একটি হাদিসে দাবী করা হয়েছে হযরত মুহাম্মদই তাওরাত বর্ণিত নবী। হাদিসটি সহি বোখারী যেখানে হযরত আতা বিন ইয়াসা বলেছ্নে, আমি হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর আসের সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করি তাওরাতে কি রাসূল্লাহ সম্পর্কে কিছু বলা আছে? তিনি জানান যে হ্যা সে সম্পর্কে বলা আছে। তারপর তিনি তাওরাত থেকে বলেন, তাওরাতে লেখা আছে, দেখো আমার গোলাম ও আমার রাসুল আমার বাছাই করা বান্দা যার উপর আমি সন্তুষ্ট। সে চিৎকার করবে না বা জোরে কথা বলবে না। সে রাস্তায় রাস্তায় তার গলার স্বর শোনাবে না। সে মন্দের বদলে মন্দ করবে না। কিন্তু সে ক্ষমা করবে এবং দয়া করবে। ঈশ্বর তাকে তুলে না নেয়া পর্যন্ত তাকে দিয়ে বক্র ধর্মমতকে সরল করবেন। ফলে লোকেরা বলবে- আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুত নাই। আর সে অন্ধদের চোখ খুলে দিবে। কালাদের কান খুলে দিবে। কঠিন হৃদয়কে খুলে দিবে।… তাওরাতের পুরাতন নিয়মে ৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নবী ইশাইয়া এমন ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন।

হাদিসটি তাওরাতের ভবিষ্যতবাণীটিকে গ্রহণ করেছে। আগেই বলেছি কুরআনে হযরত মুহাম্মদের আগমনী বার্তা সম্পর্কে নিশ্চিত কোন প্রমাণ দেখাতে পারেনি বার বার “তারা তাদের কিতাব বিকৃত করে ফেলেছে” এই জাতীয় কথা বলে। প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কি এতটাই অসহায় যে মানুষ তার কিতাবকে বিকৃত করে ফেললে সেটিকে আর উদ্ধার করতে পারে না? প্রমাণ দেখাতে পারে না শুধু মুখের কথা ছাড়া! যেহেতু কুরআনে কিছু নেই নবীর নবীত্ব প্রমাণে সেহেতু তাওরাতে কি আছে সেটা থেকেই প্রমাণ করতে হবে আসলই কি এখানে হযরত মুহাম্মদের সম্পর্কে কিছু বলা আছে কিনা। খুব সোজাসাপ্টা প্রশ্ন: হযরত মুহাম্মদের আগমনী বার্তা কি ইহুদী-খ্রিস্টানদের কিতাবে উল্লেখ আছে?

আমরা যদি ধরে নেই ইহুদীদের একটা অংশ নতুন নবীর ধোঁয়া তুলে রাজনৈতিক ফয়দা লুটতে খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তন করেছে তাহলে কিন্তু তাওরাতের পুরাতন নিয়মের সঙ্গে যীশুর মিলটাই বেশি মেলে। যীশু নম্র মৃদুভাষী ছিলেন। এখানে মুহাম্মদকেও ফেলা যায়। এরপরে আছে সে মন্দের বদলে মন্দ করবে না। যীশুর সঙ্গে এটা মেলে। যীশু বলেছেন কেউ একটা চড় দিলে অন্য গালটা পেতে দিতে। কেউ তোমার চাদর ধরে টান দিলে চাদরটাই দিয়ে দিতে…। কিন্তু মুহাম্মদ চুরির দায়ে হাত কাটতে বলেছেন। বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে পাথর ছুড়ে মারতে বলেছেন। তিনি খুনের বদলে খুন নির্ধারন করেছেন। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। বহু পরিবার সেই যুদ্ধগুলোতে ধ্বংস হয়েছে। তাদের স্বজনকে হারিয়েছে। এই অংশটি তাই মুহাম্মদের সঙ্গে বেমানান! এরপরে আছে আল্লাহ তাকে তুলে নেয়ার আগ পর্যন্ত, -এখানে এই “তুলে নেয়া” কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইসলামই বলে যীশুকে আল্লাহ তুলে নিয়েছেন। তাওরাতও সেটা বলছে। তারপর আছে, অন্ধকে চোখ দান, কালাকে শ্রবন শক্তি ফিরিয়ে দেয়ার কথা। তাওরাতের নতুন নিয়মে দেখা যায় যীশু অন্ধদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিচ্ছেন। মৃতদের জীবিত করছেন। কালাকে জবান খুলে দিচ্ছেন। যদি তাওরাতে বর্ণনাকে রূপক অর্থে ধরি যেমন অন্ধ মানে যারা সত্যের পথে নেই আর কালা মানে হচ্ছে যারা হেদায়ত পায়নি তাহলেও কিন্তু মুহাম্মদ একক চান্স পাচ্ছেন না কারণ রূপক অর্থে ধরলেও এসব যীশুর কাজের মধ্যেও পড়ে। উপরন্তু মুহাম্মদের যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামকে বিজয়ী করার কথা বিবেচনা করলে এই বৈশিষ্টের সঙ্গেও তাকে রাখা যায় না। অস্ত্রের মাধ্যমে কোন ধর্মকে প্রতিষ্ঠা নিশ্চয় অন্ধকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়া বলা যায় না। আমার জানা মতে কথিত যীশু কোন যুদ্ধ করেননি। যীশু কোন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও করেননি। কাজেই পুরাতন নিয়মে খুব বেশি করে যীশুকেই ভবিষ্যত নবী বলা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। যীশুকে যারা তৈরি করেছেন তারা তাওরাতের বর্ণনাকে মাথায় রেখেই করেছেন। মুহাম্মদের সে সুযোগ ছিল না। উল্টো তাওরাতের মধ্যে নিজেকে আবিস্কার করতে গিয়ে ভক্তদের কাছে নিজেকে সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। এবার তাহলে দেখি নতুন নিয়মের তাওরাতে কি বলা আছে।

নতুন নিয়মের তাওরাতের কথা বলার আগে কুরআনের সুরা আল সাফ (৬১:৬) নিয়ে একটু বলি। এখানে বলা হয়েছে যে,

মরিয়ম তনয় ঈসা বলেছেন যে, হে বণি ইজরাইল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহ’র রাসূল এবং আমার আগে থেকে বর্ণিত তাওরাতের একজন সমর্থক। এবং আমার পরে “আহমদ” (এর অর্থ প্রশংসাকারী) নামের যে নবী আসবে আমি তার সুসংবাদদাতা। কিন্তু যখন সে আসিল তারা স্বীকার করল না, বলল এ তো স্পষ্ট এক জাদু!

… কুরআন এখানে তাওরাতের নতুন নিয়মে যীশুর বর্ণিত একজন ভবিষ্যত নবীকে মুহাম্মদ বলে দাবী করা হচ্ছে। বলে রাখা ভাল যে তাওরাত বিকৃত হয়ে গেছে বলে বলে নবী মুহাম্মদ মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন কিন্তু এখন সেই তাওরাতকেই সাক্ষি মানছেন! তবু আমরা নিরাশ হবো না। দেখতে চাইবো এর মধ্যে আসলেই মুহাম্মদ আছেন কিনা। তুমুল বিতর্ক আছে তাওরাতের একটি শব্দকে নিয়ে যার অর্থ হয় উকিল, সহায়ক, মধ্যস্থকারী ইত্যাদি রূপে। মুসলিমরা দাবী করেন এই শব্দটির অর্থ হচ্ছে মুহাম্মদ নামের অনুরূপ। রূপকভাবে এখানে মুহাম্মদকে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যীশু তাওরাতে বলছেন,

যদি তোমরা আমাকে ভালবাস তাহলে আমি যা হুকুম করেছি তা পালন করো। এবং আমি পিতার কাছে চাইব আরেকজন সহায়তাকারী তোমাদের জন্য যেন তিনি চিরদিন তোমাদের সঙ্গে থাকেন (ইউহোন্না ১৪:১৪-১৫)।

এই আশ্বাসে কোথায় মুহাম্মদের আগমনীর কথা বলা হয়েছে বুঝা যায় কি? মুহাম্মদ যীশু যা বলেছেন তা করতে বলেন নাই। বরং বলেছেন যীশুর অনুসারীরা বিকৃত হয়ে গেছে। খেয়াল রাখুন যীশু কিন্তু কখনই তাওরাতের পুরাতন নিয়মকে (মুসার উপর লিখিত) বিকৃত বা বাতিল করেননি। মুহাম্মদ শুধু বাতিলই করেননি নিজেকে মুসা ও ঈসার চেয়ে এত উঁচু করেছেন যেখানে মুসা আর ঈসা তুচ্ছ! তাদের অনুসারীদেরকে অবিশ্বাসী কাফের বলেছেন। যীশু ইহুদীদের সেরকম কিছু বলেননি। গুরুতর বিষয় হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ যখন নিজেকে নবী বলে দাবী করেন তখন মক্কার ইহুদীরা তার কাছে প্রমাণ চেয়েছিল তিনি যে নবী তার প্রমাণ দিতে। কারণ ইতপূর্বে তাওরাতে দেখা গেছে আল্লাহ মুসার সঙ্গে সিনাই পর্বতে তার সাহাবীদের সম্মুখে কথা বলে চমক দিয়েছেন। যীশু কয়েকবার তার প্রভুর সঙ্গে কথা বলেছেন যা তার সাহাবীরা নিজ কানে শুনেছিলো। এসব তাওরাতে আছে। খোদ ইসলাম ধর্মও মুসার সঙ্গে আল্লার বাক্যালাপকে উল্লেখ করেছে। ইউহোন্না লিখিত সুসমাচারে আছে তিনি যীশুকে প্রশ্ন করছেন,

“তাহলে কি এমন আশ্চর্য কাজ আপনি করবেন যা দেখে আমরা আপনার উপর ঈমান আনতে পারি? (ইউহোন্না ৬:৩০)।

এরপর যীশু ৫টি রুটি ও ২টি মাছ দিয়ে পাঁচ হাজার মানুষকে খাইয়ে তার মুজেজা দেখিয়েছিলেন। এরকম কিছু মুহাম্মদকে দেখাতে বললে আল্লাহ আশ্চর্য রকম নিষ্কৃয় হয়ে পড়েন! কুরআনে তিনি মুহাম্মদের হয়ে জবাব দেন,

“উহারা বলে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে নিদর্শন প্রেরিত হয় না কেন? … বলো নিদর্শন আল্লাহরই এখতিয়ারে। আমি তো একজন প্রকাশ্য সতর্ককারী মাত্র। ইহা কি উহাদের জন্য যথেষ্ঠ নহে যে, আমি তোমার কাছে কুরআন অবর্তীর্ণ করেছি যাহা উহাদের নিকট পাঠ করা হয়…( সুরা আল আনকাবুত, ২৯:৫০-৫১)।

কি অদ্ভূত কথা! অবিশ্বাসীদের কাছে কুরআনের কি মূল্য আছে? “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের” জন্য আল্লাহ তার কুদরাতের একটিও নিদর্শন না দেখিয়ে এসব কি ধানাইপানই বলছেন! যার কথা তিনি দু-দুটো তাওরাতে অগ্রিম বলে রেখেছেন!

আসলেই কি বলা ছিল তাওরাতের নতুন নিয়মে। ইসলাম যে ইমাম মেহেদীর গল্প করেছে তাওরাতের নতুন নিয়মে যীশুর মুখ দিয়ে সেই কথাটিই বলা হয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ বিজয়ী হয়েছিলেন বলেই নব্যুয়ত খতম করে শুধু ইমাম মেহেদীর আসার একটা রাস্তা রেখে গেছেন। এটি রাখার উদ্দেশ্য সম্ভবত তাওরাতের কথার সঙ্গে কুরআনের মিল রাখা। কিন্তু এই ছিদ্রটি দিয়েই আজতক যতজন নিজেকে ইমাম মেহেদী বলে দাবী করেছেন তারা কুরআন-হাদিস-সিরাত থেকে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছেন। ভবিষ্যতে আরো বহু ইমাম মেহেদীর পয়দা হবে। তাদের পক্ষে-বিপক্ষে দু ধরণের প্রমাণই থাকবে। তবে তাওরাত অনুসারণ করে মুহাম্মদকে কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়েছিল। মুহাম্মদ ইহুদীর সন্তান না হওয়ায় তাওরাত অনুসারে তার নবী হওয়ার ন্যুনমত যোগ্যতাও থাকে না। একজন নবী পাঠানোর যে শপথ আল্লাহ তুর পবর্তে করেছিলেন সেখানে তিনি কি বলেছিলেন দেখা যাক।

“আমি তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তাদের জন্য তোমার মত একজন নবী দাঁড় করাবো। তার মুখ দিয়েই আমি আমার কথা বলব, আর আমি তাকে যা বলতে হুকুম দিবো সে তা-ই তাদের বলবে। সেই নবী আমার নাম করে যা করতে বলবে কেউ যদি আমার সেই কথা না শুনে, তবে আমি নিজেই সেই লোককে দায়ী করবো।“ তাওরাত, ১৮:১৮-১৯।

“তোমাদের মাবুদ তোমাদের মধ্য থেকে, তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য আমার মত একজন নবী দাড় করাবেন। তার কথা মত তোমাদের চলতে হবে। তুর পাহাড়ের নিকট যেদিন তোমরা সকলে মাবুদের নিকট সমবেত হয়েছিলে, তোমরা তখন মাবুদের নিকট তা-ই চেয়েছিলে। তোমরা বলেছিলে, আর আমরা আমাদের মাবুতের কথা শুনতে কিংবা এই মহান আগুন দেখতে চাই না, তাহলে আমরা মারা যাবো। তাওরাত, দ্বিতীয় ববরণ সিপারা ১৮:১৫,১৯।

তাওরাত অনুসারে তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ নবী পাঠাবেন ইহুদীদের মধ্য থেকেই একজনকে। তিনি বলছেন “তোমাদের মাবুত তোমাদের মধ্যে থেকে”, “তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকে” একজনকে নবী পাঠাবেন। আমরা জানি যে হযরত মুহাম্মদ আরব পৌত্তলিক বাবা-মার ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। ইসলাম ঘোষণার পর তিনি দাবী করেছিলেন তিনি ইব্রাহিম পুত্র ইসমাইলের বংশধর যার আসলে কোন প্রমাণ নেই। আবদুল মোতালেব অর্থ্যাৎ মুহাম্মদের দাদা কি এমনটা দাবী করতেন? তবু তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে মুহাম্মদ ইসমাইলের বংশধর তবু তাওরাত অনুযায়ী তিনি নবী হন না কারণ বলা হচ্ছে ইহুদীদের মধ্য থেকেই একজন নবীকে পাঠানো হবে। এই অসংগতির কথাটা ইসলামী পন্ডিতরা জানেন তাই তারা এখানে এসে দাবী করেন তাওরাত উল্লেখিত “তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকে” বলতে আসলে ইসমাইলকে বুঝানো হয়েছে। অর্থ্যাৎ ইসহাকের ভাই ইসমাইলের বংশ থেকে নবী করা হবে। উপরের তাওরাতের আয়াতের যে উল্লেখ করেছি সেখানে একটাতেও কি মনে হয়েছে এখানে ইসহাকের অবৈধ ভাই ইসমাইলের বংশে নবী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে? সেটা যে ইহুদীদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ঈশ্বর বলেননি তার প্রমাণ তাওরাতে ভয়ংকর উগ্র ইহুদী প্রেমি আল্লাহ অন্যত্র বলছেন-

“তোমাদের মাবুত তোমাদের জন্য যে দেশটি দিতে চাচ্ছেন, সেখানে গিয়ে তোমরা যখন বলবে, আমাদের আশেপাশের জাতিগুলোর মত এসো, আমরা আমাদের জন্য একজন বাদশাহ খুঁজে নেই। সে যেন তোমাদের ইজরাইলী ভাইদের মধ্যে একজন হয়। যে তোমাদের ভাই নয়, এমন ভিন্ন জাতির কোন লোককে তোমরা তোমাদের বাদশাহ করবে না।– তাওরাত, ১৭:১৪-১৫।

ইহুদী রক্তের প্রতি এখানে ঈশ্বর যে পক্ষপাত দেখালেন তাতে কি আর কারুর সন্দেহ থাকতে পারে যে তাওরাত ইব্রাহিমের অবৈধ পুত্র ইসমাইলের বংশে নবীর কথা বলেছেন? প্রাসঙ্গিক বলে রাখা ভাল ইয়াকুব নবীর বংশধরকেই ইহুদী বলা হয়। ইয়াকুব ইব্রাহিম পুত্র ইসহাকের বংশধর। ইহুদী ধর্মের সঙ্গে মৌলিক ও নিউক্লিয়াস বিরোধ ইসলামের এখানেই। এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছিলাম ইস্টিশনে একটা লেখায়। লেখাটা এখানে পাবেন।

ইসমাইল আসলে কখনই ইব্রাহিমের উল্লেখযোগ্য পুত্র ছিল না। দাসী হাজেরার পুত্র হওয়ায় তাকে ইব্রাহিমের অবৈধ পুত্র হিসেবে পরিচিতি পেতে হয়েছে। ইসমাইলকে তার মা হাজেরার সঙ্গে মরুভূমিতে নির্বাসন দেয়া হয়। হযরত মুহাম্মদ দাবী করেছিলেন ইসমাইলকে তার মায়ের সঙ্গে মক্কায় নির্বাসন দেয়া হয়েছিল কিন্তু সেই যুগে জেরুযালেম থেকে পায়ে হেঁটে মক্কায় আসা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাছাড়া ইহুদীদের মধ্যেই বরাবর নবী উৎপাদন হয়ে এসেছে। এর কারণটা হচ্ছে সেমিটিক ধর্মের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী শাখা হিসেবে ইহুদী ধর্মই ছিল সরব। খোদ কুরআনে আছে-

সুরা আল-আ’রাফ, আয়াত- ৭:৬৫, ৭৩, আদ জাতির কাছে আমি উহাদের ভ্রাতা হূদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো…ছামুদ জাতির কাছে তাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠিয়েছিলাম।

… এই নবীদের সবাই ইহুদী বংশের। একমাত্র কথিত ইসমাইল বংশে জন্মে ছিলেন হযরত মুহাম্মদ! যা কিনা তাদের বংশ কুরাইশদেরই অজানা আর অজ্ঞাত ছিল! নইলে সেমিটিক ধর্ম রেখে কেন হুবাল দেবতার কাবাঘরের রাখাল হবেন তারা বংশ পরম্পরায়?

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

1 thought on “হযরত মুহাম্মদের আগমনী বার্তা কি ইহুদী-খ্রিস্টানদের কিতাবে উল্লেখ আছে?”

  1. Pingback: কিছু মিথ্যাচার খন্ডন - সুষুপ্ত পাঠক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix