সহিহ্ ইসলাম কে জানে?

পুরোনো একটা ভিডিও আজ আবার দেখা হলো। অভিনেতা ও এমপি আসাদুজ্জামান নূর জঙ্গিবাদ ও ইসলাম নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। সেই ভিডিও আজকে অমি রহমান পিয়াল শেয়ার করেছেন। পিয়ালদের মত ব্লগাররা মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের ইতিহাস যতখানি বেশি জানে ততখানিই কম জানে ইসলাম সম্পর্কে। এটা দোষের কিছু নয়। দোষ হচ্ছে না জেনেই সেই বিষয়ে সব জেনে বা আমিই সঠিকটা জেনে বসে আছি ভাব করা। নূর সাহেব বড় অভিনেতা। তাকে সবাই ভালোবাসে। আমরা বাসি। কিন্তু তিনি যখন জঙ্গিবাদের বিরোধীতা করতে গিয়ে আরো বড় সমস্যা তৈরি করেন তখন কিছু বলতেই হয়।

সঠিক ইসলাম ফরিদউদ্দিন মাসউদ মাওলানা জানে নাকি আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ জানে সেই বিতর্কে কোন ফল আসবে না। সুফি ইসলাম উদার, ওহাবী আহলে হাদিসরা উগ্র- এইসব তেলতেলে কথাতেও জঙ্গি দলে নাম লেখানো কেউ ঠেকাতে পারবে না। ইসলাম যতদিন টিকে থাকবে ততদিন ইসলামের সঙ্গে হাদিস কুরআন সিরাত গ্রন্থগুলোও টিকে থাকবে। এসব না পড়েও একজন মানুষ গান বাজনা নাটক সিনেমার জগতে থেকেও প্রবলভাবে ‘মুসলমান’ হতে পারেন আমরা সেটা জানি। এই লোকদের কাছে যদি একজন বড় মাপের সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব বলেন ইজরাইল হচ্ছে ইসলামের বড় শত্রু, এবং আইএস অর্থ ইজরাইল স্টেট- তাহলে আমি যে মানুষজনদের কথা বললাম, যারা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না বা পালন করে না কিন্তু মুসলমান- সেইসব ছেলেমেয়েরা আলাদা একটা কেমিস্ট্রি পেয়ে যায়। ক্লোজআপ ওয়ানে গান করা ছেলে আইএসে যোগ দেয়ার কথা আমরা জানি। সংগীতের জগতে থাকা একটা ছেলে যদি নূরের ভাষণ শুনে ইহুদীদের বা ইজরাইলকে মুসলমান ও ইসলামের বদনামের জন্য দায়ী বলে বিশ্বাস করে শ্রদ্ধাভাজন একজনের কথায়, তাহলে সেই ছেলে যদি আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ বা জাকির নায়েক শুনে অতিদ্রুত ১৮০ ডিগ্রী মুভ করবে। যেহেতু তারা ধর্ম পালন করে না কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসী, কুরআন হাদিস পড়েনি কিন্তু ইসলামে বিশ্বাসী কাজেই তাদের জন্য জিহাদের দলে নাম লেখানোটা সহজ ও স্বাভাবিক।

আমাদের প্রিয় বাকের ভাই বলেছেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম, এখানে উগ্রতার কোনো স্থান নেই’। অথচ এই কথাটা ইসলামের কোথাও নেই! ইসলাম অর্থ হচ্ছে ‘আত্মসমর্পন’। ইসলাম নিয়ে যাচাই বাছাই একমত দ্বিমত নয়, আপনাকে আগে ইসলামের কাছে আত্মসমর্পন করতে হবে। তারপর ইসলাম যা বলবে সেটাই আপনি বিনা বাক্যে মেনে নিবেন। ইসলামে উগ্রতা আছে এবং আপনি ইসলামে আত্মসমর্পন করে সেই উগ্রতাকে নতমুখে মেনে নিবেন। সহি হাদিসে বলা আছে নবীকে ত্রাসের মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার অনুমতি দিয়েছে আল্লাহ।
নূর এবং পিয়াল দুজনই খোঁজ নিয়ে দেখুন এই হাদিস উপমহাদেশ শুধু নয় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচু ক্লাশের ছাত্ররা মুখস্ত করে মুফতি সাইখুল হাদিস হবার যোগ্যতা অর্জন করেন। এগুলো সঠিক ইসলাম বলে যদি আপনারা মনে না করেন কোন সমস্যা নাই। কিন্তু কথা হচ্ছে আপনারা কি হাদিস চর্চাকে বন্ধ করতে পারবেন? কোন আলেমকে জিজ্ঞেস করে দেখুন ইসলাম অর্থ শান্তি এরকম কোন তথ্য ইসলামের কোথাও আছে কিনা।

আমাদের প্রিয় অভিনেতা নূর তারপর বলেছেন আরো চমকপ্রদ কথা। উনি বলেছেন, “রসুল (স.) এর সামনে উগ্রতা প্রকাশ পেলে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন। ইসলামকে শান্তির উৎসে পরিণত করতে চেয়েছিলেন তিনি। উগ্র কর্ম তো দূরের কথা, শুধু উগ্র কথা বলার কারণে যুদ্ধজয়ী এক সৈনের হাত থেকে পতাকা নিয়ে নিয়েছিলেন রসূল (স.)। এই প্রসঙ্গে রসূল হযরত মুহাম্মদ (স.) এর মক্কা বিজয়-পরবর্তী একটি ঘটনা উল্লেখ করে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এমপি বলেন, ‘যুদ্ধের পর যখন তিনি বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফিরছেন, তখন তার একজন সাহাবা যার হাতে পতাকা ছিল, তিনি খুব উত্তেজিত ছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। সেই সাহাবা উত্তেজিত কন্ঠে বললেন যে, রসূলুল্লাহ (স.) এখন আমরা সব খতম করে ফেলবো। এই কথার জবাবে রসূল (স.) বলেছিলেন- আমরা এখন খতম করতে যাচ্ছি না, আমরা মহব্বতের জন্য যাচ্ছি, ভালোবাসার জন্য যাচ্ছি। এবং ওই সাহাবার হাত থেকে কিন্তু পতাকা নিয়ে নেওয়া হয়েছিল, উগ্র উক্তির জন্য শাস্তি হিসেবে।”

না, এই তথ্য মিথ্যা নয়। এইসব তথ্য সেই হাদিসগুলো থেকেই নেয়া হয়েছে যে হাদিসের কথা আমি উপরে উল্লেখ করেছি সহি হিসেবে, সহি বুখারী। কিন্তু তথ্যকে এখানে কায়েমি স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ মক্কার বনু হাশিম কুরাইশ গোত্রের প্রতি নবী যতখানি উদার ও ক্ষমাশীল ছিলেন ততখানিই ইহুদীদের প্রতি অসহিষ্ণু ও কঠরতা প্রদর্শন করেছিলেন। বদর যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। এই যুদ্ধ অনেকটা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মতই ছিলো। মানে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সবাই একই বংশ ও একই পরিবারের লোকজন। নবীর চাচা, ভাতিজা, জ্ঞাতি গোষ্টিরাই ছিলো এই যুদ্ধে। বদর যুদ্ধে আটক হওয়া কুরাইশ বনু হাশিমের লোকজন সবাই নবীর আত্মীয়। তাদের প্রতি মদিনার আনসারদের কোন দরদ ছিলো না। কিন্তু মক্বার লোকজনের জন্য সেটা কঠিন কারণ সবাই নিজেদের গ্রাম গোষ্ঠির লোকজন। নবীর চাচাকে আটক করা হয়েছে। সেই চাচার জন্য নবী সারারাত ঘুমাতে পারেননি। তাকে হত্যা করা হোক এটা তিনি চান না। শেষে তাদের সকলকে মুক্তিপণ দিয়ে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কারণ নবী সেরকম কিছুই চাইছিলেন। কিন্তু সেই একই নবী কেন বনু কুরাইজা ইহুদীদের কেন মুক্তিপণ দিয়ে ছেড়েদিলেন। যে নবী বদর যুদ্ধের পর আক্রমনাক্ত আনসারদের বলেছিলেন, হে আনসাররা, তোমরা কি নবীর চাচাকে হত্যা করতে চাও? সেই নবী কেন ইহুদীদের ছেড়ে দিতে বলা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ‘মুনাফিক’ বলেছেন। বনু কুরাইজা গোত্রের সকল নাবালকদের যাদের নিন্মাঙ্গে চুল গজিয়েছে তাদেরকে সাবালক ধরে হত্যা করে গর্তে পুঁতে ফেলার নির্দেশ তিনি কেন দিলেন কারণ তারা ইহুদী এবং নবীর কোন স্বজন নয় বলে? মক্কার বিজয়ের সময়ও একই ঘটনা। নিজ বংশ ও গোত্রকে তিনি শর্ত দিলেন ইসলাম গ্রহণ করলেই মুক্তি মিলবে। তবু মক্কা বিজয় বিনারক্তপাতে ঘটেনি। খালিদ বিন ওয়ালিদ চারপাশে রক্তে বন্যা বইয়ে দেন। নবী ঘোষণা করেন ঐ ব্যক্তিরা ক্ষমা ঘোষণার বাইরে থাকবে যারা আল্লার নবীকে নিয়ে বঙ্গ সংগীত গেয়েছিলো। ইসলামের এই সকল তথ্য হাদিস ও সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায় যা ইসলাম ধর্মের মূল অনুসঙ্গ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা হাটহাজারীর ছাত্ররা এগুলো পড়েই মুফতি হয় এবং তাদের সেই সার্টিফিকেটকে বাকের ভাইয়ের সরকারই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমান করে দিয়েছে!

আসাদুজ্জামান নূর আরো বলেন, “আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি এই ছেলেদের আমি পেতাম, আমি জিজ্ঞেস করতাম যে- তোমাদের মধ্যে তো আইএস নামে একটা কথা চালু হয়েছে। এদের ঘাঁটি সিরিয়ার একটা অংশে। সেখান থেকে এরা হাজার মাইল দূরে গিয়ে জার্মানি, আমেরিকা, ব্রিটেন, বেলজিয়ামে বোমা ফাটায়, ফ্রান্সে গিয়ে ট্রাক তুলে দেয়। এমনি কিছুদিন আগে পাকিস্তানের একটা হাসপাতালেও বোমা ফাটিয়েছে, সেখানে অনেক অসুস্থ মানুষ ছিলেন। তা তোমার বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ মাইল দূরে হলো ইসরাইল। ইসরাইলকে তো আমরা বলি ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু। মাত্র ৫০ মাইল দূরে গিয়ে ইসরাইলে বোমা ফাটাও না কেনো? আইএস মানে কিন্তু আমি ইসলামিক স্টেট বলি না। আইএস মানে আমি বলি ইসরাইল স্টেট। এরা সারা বিশ্বে ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এই কাজগুলো করছে।”

প্রিয় বাকের ভাই, লজিক্যাল ফ্যালাসি একেই বলে! ধরেন এবার যদি আমি বলি, আইএস, তালেবান, আল কায়দা, বোকো হারামদের মত জঙ্গিদের উপর যখন অভিযান চলে তখন মুসলমানরা খুশি হয় না কেন? আজ পর্যন্ত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, দেওবন্ধ কোন মহলই এইসব জঙ্গিদের ইসলাম বিরোধী বলল না। সারা বিশ্বের মানুষ যতখানি ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দেখে তারা কখনই তালেবানদের বিরুদ্ধে সেটা দেখতে পায় না। ওসামা বিন লাদেনের ছবি বিক্রি হয় মুসলমানদের দেশে। তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকার আপোষ চুক্তি করলে উল্লাসে ফেটে পড়ে মুসলমানরা। কেন? আপনার যুক্তিতে ফেলে এগুলো ধরলে জবাব তো একই হয় তাই না? আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের জসিমউদ্দিন রাহমানির বই নেটেই ফ্রি পাওয়া যায়। সেই বইতে এই মুফতি কুরআন হাদিস থেকে দেখিয়েছে কাফেরদের খুন করে মরে ধরে হত্যা করে আল্লার আইন ও শাসন কায়েম করতে হবে সেটা আল্লারই কথা! আইএসকে যদি আপনি বিশাল একটা কিছু ভেবে বসেন আর তারা কেন ইজরাইলে হামলা চালাতে পারে না জাতীয় খোড়া যুক্তি দেখান তাহলে বলি, ফিলিস্তিনি বাচ্চারা ঘুড়িতে আগুন ধরিয়ে ইজরাইলের ফসলের ক্ষেত জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিলেও ইজরাইল সেটা আটকাতে পেরেশান হয়ে যায়। ফিলিস্তিন কেন্দ্রিক যতগুলো জিহাদী গ্রুপ আছে তারা সকলেই ইয়াসির আরাফাতের পিএলও পঙ্গু করেই সেখানকার ক্ষমতার চাবি হাতে নিয়েছে। সেখানকার ‘ইসলামী দল’ বর্তমানে একক জিহাদী শক্তি। তারা সেখানে আল কায়দা, তালেবান, আইএসকে জায়গা ছেড়ে দিবে? হেফাজত ইসলাম কি চরমোনাই পীরকে ছেড়ে দিবে জায়গা? বোকো হারাম কি আফ্রিকায় আইএসকে কাজ করতে দিবে? কাশ্মিরে তালেবানরা কেন বোমা ফুটায় না? কেন সেখানে স্থানীয় লস্কক, জইশ-ই মুহাম্মদের মত জঙ্গি দলগুলো কার্যক্রম চালায়?

প্রিয় নূর ভাই, আপনার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে একটা জিনিস বলতে চাই, আইএসের সঙ্গে অন্যান্য জিহাদী দলগুলো একটা বড় পার্থক্য আছে। অন্য জিহাদী দলগুলো স্থানীয় অঞ্চলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ছে। যেমন আফগানিস্তানে তালেবান, আফ্রিকায় বোকো হারাম, কাশ্মিরের লস্কর, জইশ-ই মুহাম্মদ ইত্যাদি। কিন্তু আইএস মনে করে ইমাম মাহাদি আসার টাইম এসে গেছে। এখন খোরাসন থেকে বেরিয়ে আসার টাইম এসে গেছে। ইমাম মাহদি আসার আগে তার বায়াত নিতে হিযরত করে সারাবিশ্বের মুসলমান জেরুজালেমের কাছাকাছি চলে আসবে। ইমাম মাহদি চলে আসলে জেরুজালেম দখল করে সেখানে ইসলামের পতাকা উড়ানো হবে। এই বিশ্বাস ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস বা ভবিষ্যত বাণিকে বেইস করেই আইএসের জন্ম। সিরিয়াতে খিলাফত গঠন করে বাগদাদি সবাইকে স্বপ্ন দেখিয়েছে মাহদির আসার টাইম এসে গেছে। আসছে…। তারপর তারা জেরুজালেমের দিকে রওনা হবে। হাদিস সীরাত থেকে এগুলো পাঠ করলে, মাহদির ঘোড়ার সিনা পর্যন্ত রক্তের স্রোত বয়ে যাবে, ভারতের কাফেরদের গলায় লোহার বেরি পরিয়ে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া- এইসব পড়ে পড়ে যারা ‘আলেম’ হয় তাদেরকে কি দিয়ে বুঝাবেন নূর ভাই? মাঝখান থেকে আপনাদের মত সংস্কৃতিমনা লোকজন থেকে ‘ইহুদীদের ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ শুনে তেলে বেগুন পড়ার মত হবে না?

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix