সময়ের কাছে আমার প্রতিবাদ

এই হচ্ছে রাশিয়ার সম্রাট জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পরিবার। এই ছবির সবচেয়ে ছোট শিশুটি জারের কন্যাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিলো বলভেশিকরা ওরফে কমিউনিস্টরা। এই হত্যার পক্ষেও ঢাউস ঢাউস বই লিখে হত্যাকে জাস্টিফাই করা হয়েছে। কারণ আমাদের আছে মহান সব আদর্শ! যে আদর্শের জন্য আমরা মানবজাতিকেই নির্মূল করে ফেলতে পারি। কিন্তু আমাদের আবার ‘মানবতা’ বোধও আছে! এই যেমন প্রতিটি কমিউনিস্ট বিরোধীদের কাছে জারের পুরো পরিবারকে হত্যা একটা মর্মান্তিক ঘটনা! তাদের কাছে এটা হত্যা। আনা ফ্রাঙ্কের মত কিশোরী যাকে ইহুদী হওয়ার কারণে পুরো পরিবারসহ মরতে হয়েছিলো নাজি সৈন্যদের হাতে সেই হত্যা আবার বহু ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কাছে কোন আবেগই আনতে পারে না। ইহুদী হলোকাস্টের জন্য তারা হিটলারকে ধন্যবাদ জানায়। আদর্শের জন্য, দার্শনিক বিশ্বাসের জন্য যুদ্ধ, হত্যাকে গ্রহণযোগ্য করে নেয় মানুষই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিহারীদের হাতে হত্যা লুটপাট ধর্ষণ যেমন ইতিহাসের সত্য তেমনি বিহারীদের উপর বাঙালীদের হত্যা ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে প্রায় অস্বীকার করা হয়। এমনকি এইসব ঘটনাকে উচিত জবাব বলার মত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের মধ্যেও অভাব নেই। মতাদর্শের জন্য হত্যা যুদ্ধকে যারা সমর্থন জানায় তাদের ঘরে কি শিশু নেই? তারা কি জানে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ভিকটিম শিশু আর নারীরা।

 

এত কথা বললাম সনাতন আর্য সমাজের সৈনিকদের হত্যা যুদ্ধকে সমর্থন করা নিয়ে। কৌরব বংশের হাজার হাজার নারীকে বিধবা আর শিশুদের পিতৃহীন করে ফেলা যুদ্ধকে তারা ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ বলছেন! অর্জুন যখন যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে চলে আসতে চেয়েছিলেন পিতামহ ভীষ্ম, জেঠু ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনসহ আত্মীয় স্বজনদের সমানে দেখে যাদেরকে হত্যা করেই তাকে যুদ্ধ জিততে হবে তখন কথিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কি বলেছিলেন? অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি কী নিয়ে এসেছিলে ? যে হারাবার ভয় পাচ্ছ ? যুদ্ধে বা প্রেমে কোনও নীতি নেই’। এই হচ্ছে আদর্শ! পৃথিবীর পারমানবিক বোমাগুলো একটা একটা করে ফুটবে এইসব মহান আদর্শ আর ‘ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধের’ কারণে। শত্রুকে মরতে দেখলে আমাদের তত্ত্ব তৈরি হতে থাকে। এখন ফুঁসে আসবে সনাতন সৈনিকরা। আসবে তেড়ে কমিউনিস্টরা। মুসলমানরা চাইবে কল্লা। বনু কুরাইজা ইহুদীদের উপর মুহাম্মদের গণহত্যা চালানোর পক্ষে তাদের যুক্তি ছিলো ইহুদীরা মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করেছিলো, তাদের নবীকে হত্যার জন্য ইহুদী সর্দার ষড়যন্ত্র করেছিলো। তাই বনু কুরাইজা ইহুদী হত্যাকে তারা সঠিক বিচার বলে মনে করে। অথচ শুধুমাত্র নির্মাঙ্গে চুল দেখে কিশোর বয়েসী বাচ্চাগুলোকে সেদিন মেরে গর্তে পুঁতে ফেলা হয়েছিলো! এই নির্মম হত্যার পক্ষে শত শত তাফসির, হাদিস বিদ্যমান। একজন ধার্মিক মুসলমান পাবেন না যিনি মনে করেন সেদিন বনু কুরাইজাদের প্রতি তাদের নবী অবিচার করেছিলো। সনাতন আর্য সৈনিকরাও তাই। কমিউনিস্টরাও তাই। বাঙালী জাতীয়তাবাদীরাও তাই। পৃথিবীর সকল জাতীয়তাবাদী, ধর্মবাদী, আর্দশবাদীরা তাদের হয়ে যুদ্ধ হত্যাকে সমর্থন করে যাবেই। মানবিকতাবাদ কবলই নিজ আদর্শের জন্য। মানুষ আজ মতভেদে বিভক্ত। আদর্শে, দর্শনে বিচ্ছিন্ন। তাদের সকলের কাছে আমার লেখা ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো লাগে যতক্ষণ তাদের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে যায়। তাই কাউকে বদলাতে নয়, সময়ের গায়ে আমার প্রতিবাদটুকু রেখে যাওয়াই আমার লেখার উদ্দেশ্য। বলে রেখে যাই, আমি সমস্ত হত্যাকে ঘৃণা করেছি, মতবাদ দিয়ে সমর্থন করিনি।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix