শাহ আবদুল করিমকে ঈদের নামাজ থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ও অন্যান্য

ধল গ্রামে ঈদের নামাজ হবে ঈদগা মাঠে। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের ধল গ্রাম। ২৮ বছর বয়েসের যুবক শাহ আবদুল করিম বাড়ির সকলের সঙ্গে গেলেন ঈদগা মাঠে নামা পড়তে। নামাজ শুরুর আগে আচানক ইমাম সাহেব, গ্রামের মোড়ল, পরেজগার লোকজন করিমকে নিয়ে সালিশ বসালো। করিমের অপরাধ সে গান গায়! গান ইসলামে হারাম। তাকে গান ছেড়ে নামাজ পড়তে হবে দুটো একসঙ্গে চলবে না। শাহ আবদুল করিম কবিতা আকারে ছন্দপয়ারে নিজের আত্মস্মৃতিতে সেদিনের ঘটনা লিখেছেন এভাবে-

 

“ঈদ এসেছে ঈদের দিন বাড়িতে ছিলাম।
জামাতে যাইতে সবার সঙ্গ নিলাম।।
গ্রামের দুই-এক মুরব্বি মোল্লাগণ হতে
ধর্মীয় আক্রমণ এল ঈদের জামাতে
জামাত আরম্ভের পূর্বে মুরব্বি একজন
ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাস করলেন তখন
জানতে চাইলেন গান গাওয়া পারে কি পারে না
ইমাম বললেন গান গাওয়া আল্লা-নবির মানা
মুরব্বি বললেন, তবে জিজ্ঞাস করো তারে
গান সে ছাড়বে কিনা বলুক সত্য করে
ইমাম বললেন, ‘কিতা জি বাঁচতে এখনো পারো
তওবা করে বেশরা বেদাতি কাম ছাড়ো
সবার কাছে প্রথম বলো আমি এসব করব না
আমি বললাম সত্যি বলি গান আমি ছাড়ব না
মুরব্বি বললেন দেখো কী করা যায় তারে
সবার সামনে এই কথা বলতে কি সে পারে?
যাই করুক এখন বলা উচিত ছিল তার
এই সমস্ত কর্ম আমি করিব না আর
আমি বললাম এসেছি আজ জামাত পড়িতে
ইচ্ছা নয় মিথ্যা কোনো কথা বলিতে।
ছাড়তে পারব না আমি নিজে যখন জানি
উপদেশ দিলে বলেন কী করে তা মানি।
পরে করিব যাহা এখন বলি করব না।
সভাতে এই মিথ্যা কথা বলতে পারব না।
এই সময় অন্য এক মুরব্বি বললেন
আপনারা এখন কোন পথে চললেন
এই আলাপ ঘরে বসে পারি করিতে
এখন এসেছি ঈদের নামাজ পড়িতে।।“

 

ঘটনা সেদিনের মত মিটলেও করিমের পিছনে ইসলাম প্রিয় তৌহদী জনতা ছাড়েনি। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হলো যে পরিজনদের নিরাপত্তার কথা ভেবে যুবক করিম একদিন নিরবে গ্রাম ছেড়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। তাঁর প্রিয় কালনি নদীর স্রোত আর বিরাণ হাওয়ের উদাসী হাওয়া পিছনে রেখে গোটা দেশ ঘুরে ঘুরে গান গাইতে লাগলেন করিম। (পড়তে পারেন, ‘শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান, সুমনকুমার দাশ, প্রথমা প্রকাশনী)।

 

ইসলামে গান হারাম তাই করিম নিজ গ্রামে থাকতে পারেননি। আপনাদের গর্ব তাহলে এত কিসে? আপনারা তালেবানদের চেয়ে উদার মহান কিসে? তালেবানদের হামলায় ছিন্নভিন্ন তবলা খোল হারমনিয়ামের ছবি আমরা শেয়ার দিচ্ছি ঠিক আছে। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি উপমহাদেশের বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানে এরকম তালেবানী ঘটনার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস? আমরা কি ভেবে দেখেছি আল্লা নবীর প্রশংসা করে গাওয়া কথিত গানগুলো কেন বাদ্য বাজনা ছাড়া গাওয়া হয়? কেন রোজার মাসে বিটিভিতে নারী হোস্টদের মাথায় ঘোমটা দিতে হত? আমরা কি ভুলে গেছি ব্রাহ্মণবাড়ীয়াতে দুই দুইবার ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সংগীতালয় মাদ্রাসার ছাত্ররা আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলো? সর্বশেষ গত বছর আগুন দেয়ার পর সেই ঘটনায় একজনকেও পুলিশ ধরেনি। শচীনদেব বর্মণদের দেশভাগের মাধ্যমে ওপারস্থ করে যেদিন মুসলিম লীগের তরুণ তুর্কীরা সফল হয়েছিলো পরে যারা মুক্তিযুদ্ধের নায়ক হয়েছিলো তারাই ছিলো শচীনদেব বর্মণের ‘বাংলাদেশের ঢোল’ ফুটো করে দেয়ার প্রথম কারিগর! করিম তো তার যৌবনে তৌহদী জনতার রোষে গানের জন্য হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে সাধন করে কাটিয়েছেন, এমন দিন আসবে যেদিন সেরকম একটি গ্রামও আর অবশিষ্ঠ থাকবে না। তবু কিসের গর্ব করেন আপনারা? আপনাদের লজ্জ্বা করে না?

 

-সুষুপ্ত পাঠক

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix