রামকৃষ্ণের বর্ণবাদ বিদ্যাসাগরের নোনা জলে ভেসে গিয়েছিলো

বিদ্যাসাগরের সময় রামকৃষ্ণের মত ধর্মগুরু সমাজে যে ক্ষতি করেছিলেন সেকথা বলতেই হিন্দু ভক্তরা নাখোশ হয়েছেন। তারা বলছেন রামকৃষ্ণ হিন্দু ধর্মের সংস্কার করে উদার করেছিলেন। জাতপাত তুলে দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের মত শিষ্যকে তৈরি করেছিলেন যিনি ভারতকে আলোকিত করেছিলেন ইত্যাদি। স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে আমার মত কি সেটি আমি এই লেখায় ইচ্ছে করে উল্লেখ করব না এই কারণে যে, এই লেখায় রামকৃষ্ণের বর্ণবাদী আচরণকে তখন আড়াল করতে বিবেকানন্দকে নিয়ে তর্ক জুড়ে দিবে। সংক্ষেপে বলতে হলে বিবেকানন্দর মত প্রতিভার অপচয় ঘটেছিলো ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে। ভারতের কোন লাভ হয়নি। এবার সোজাসুজি রামকৃষ্ণ প্রসঙ্গে চলে আসি।

 

রামকৃষ্ণ ছিলেন হিন্দু অন্যান্য ধর্মগুরুদের মতই কঠোর মাত্রার বর্ণবাদী। তার জাতপাত নিয়ে কট্টরতার কথা জানা যায় বিবেকানন্দের শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতার লেখায়। তিনি লিখেছেন, “তথাপি শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কামারপুকুরের ব্রাহ্মণযুবকরূপে দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আগমন করেন, তখন তিনি এত আচারনিষ্ঠ ছিলেন যে, এক নিম্নশ্রেণীর নারীকর্তৃক মন্দির নির্মাণ এবং ঐ উদ্দেশ্যে সম্পত্তি দান তাঁহার অত্যন্ত বিসদৃশ বোধ হইয়াছিল। তিনি ছিলেন প্রধান পুরোহিতের কনিষ্ঠভ্রাতা এবং সেজন্য প্রতিষ্ঠাদিবসে ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁহাকে পূজানুষ্ঠান কার্যে সহয়তা করিতে হয়। কিন্তু কিছুতেই তিনি প্রসাদ গ্রহনে সম্মত হন নাই। শোনা যায়, সব শেষ হইয়া গেলে, এবং সমাগত লোকজন চলিয়া গেলে গভীর রাতে তিনি বাজার হইতে একমুঠা ছোলাভাজা কিনিয়া আনেন এবং উহা খাইয়া সারাদিন উপবাসের পর ক্ষুধা নিবৃত্ত করেন।” (পৃষ্ঠা ১৭০, স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি, ভগিনী নিবেদিতা, উদ্বোধন কার্যালয়)।

 

এই কথিত নিম্নশ্রেণীর নারীটি হচ্ছেন রানী রাসমনি। শূদ্র হওয়ায় তার প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বর কালিবাড়ির প্রসাদ তিনি মুখে দেননি। এমনকি মন্দিরের মালিকানাও শুদ্র হলে ‘মা’ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হবেন না বলে ব্রাহ্মণদের নামে লিখে পড়ে দিতে হয়েছিলো। রামকৃষ্ণ বালক বয়েসে এক কামার স্ত্রীর হাতে অন্ন খেয়েছিলেন দেখিয়ে তাকে ভক্তরা তাকে জাতপাতহীন মহাপুরুষ সাজাতে চাইলে কি হবে, পরিণত বয়সে গদাধর থেকে রামকৃষ্ণ হয়ে তিনি কি বলেছিলেন, “কৈবর্তের অন্ন খেতে পারি না দাদা। আমার এখনকার অবস্থা, বামুনের দেওয়া ভোগ না হলে খেতে পারি না!” (পৃষ্ঠা ৩২, পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম খণ্ড, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সিগনেট প্রেস)।

 

রাসমনি প্রতিষ্ঠিত কালি মন্দিরে রামকৃষ্ণ যোগ দিলেও সেখানে প্রসাদ গ্রহণ করতেন না। স্বামী সারদানন্দ লিখেছেন, “ঠাকুর কিন্তু ঐ আনন্দোৎসবে সম্পূর্ণহৃদয়ে যোগদান করিলেও আহারের বিষয়ে নিজ নিষ্ঠা রক্ষাপূর্বক সন্ধ্যাগমে নিকটবর্তী বাজার হইতে এক পয়সার মুড়ি-মুড়কি কিনিয়া খাইয়া পদব্রজে ঝামাপুকুরের চতুষ্পাঠীতে আসিয়া সে রাত্রি বিশ্রাম করিয়াছিলেন।” [পৃষ্ঠা ৮৪, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ দ্বিতীয় খণ্ড, স্বামী সারদানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়]

 

শুদ্র রাসমনির মন্দিরের প্রসাদ তিনি  খাবেন না! “ভোজ্য পদার্থ অপরিমিত পরিমাণে প্রস্তুত হইয়াছিল। কিন্তু পরমহংসদেব তাহা কিছুই স্পর্শ করেন নাই। তিনি সমস্ত দিবস অনাহারে থাকিয়া রাত্রিকালে নিকটস্থ এক মুদির দোকান হইতে এক পয়সার মুৃড়কি ক্রয় করিয়া ভক্ষণ করিয়াছিলেন। তিনি কি জন্য যে মন্দিরের সামগ্রী স্পর্শ করেন নাই, আমরা তাহার কোনো কারন প্রদর্শন করিতে পারিলাম না।” [পৃষ্ঠা ৫, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জীবনবৃত্তান্ত, রামচন্দ্র দত্ত, উদ্বোধন কার্যালয়]

 

বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে আসি। সেকালে বিদ্যাসাগর এইসব বাবাজীদের অত্যন্ত বিরক্তির চোখে দেখতেন। কেননা তিনি যুব সমাজকে পাশ্চত্য দর্শন পাঠ করতে বলতেন। বেদ বেদান্ত এসব পড়ে সময় নষ্ট না করে আধুনিক পশ্চিমা বিজ্ঞান দর্শন পাঠের জন্য তিনি পরামর্শ দিতেন। নিজে যখন জাতীয় শিক্ষাক্রমে সরকারের কাছে নিজের মতামত জমা দিলেন সেখানে তার এই মনোভাব দলিল আকারে প্রমাণিত হয়েছিলো। তো, রামকৃষ্ণের খুব আগ্রহ ছিলো বিদ্যাসাগর তার শিষ্য হোক। শিক্ষিত জ্ঞানী কেউ তার শিষ্য হলে তিনি খুব আহ্লাদিত হতেন। সে লক্ষ্যে রামকৃষ্ণ একবার বিদ্যাসাগরের বাড়ি গিয়েছিলেন মোটিভেট করতে। অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর হয়নি রামকৃষ্ণের জন্য। রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে উদ্দশ্য করে আহ্লাদিত হয়ে বলেছিলেন, খাল বিল পেরিয়ে সাগর দেখতে এলুম। বিদ্যাসাগর নিরসভাবে উত্তর করেছিলেন, মনে হয় না বিশেষ সুবিধের হবে, সাগর থেকে খানিকটা নোনা জল নিয়ে যান…’।

 

রামকৃষ্ণ তবু অনেকদিন বিদ্যসাগারকে শিষ্য করতে চেষ্টা করেছিলেন। সফল তো হননি বলাই বাহুল্য। রামকৃষ্ণের শিষ্য শ্রীমকে বিদ্যাসাগর একবার বলেছিলেন, “ঈশ্বরকে ডাকবার আর কি দরকার? দেখ চেঙ্গিস খাঁ যখন লুটপাট আরম্ভ করলেন তখন অনেক লোককে বন্দি করলেন ক্রমে ক্রমে প্রায় এক লক্ষ বন্দি জমে গেল। তখন সেনাপতিরা এসে বললেন মহাশয় এদের খাওয়াবে কে? সঙ্গে এদের রাখলে আমাদের বিপদ। কি করা যায়? ছেড়ে দিলেও বিপদ। তখন চেঙ্গিস খাঁ বললেন, তাহলে কি করা যায়; ওদের সব বধ কর। তাই কচাকচ করে কাটাবার হুকুম হয়ে গেল। এই হত্যাকান্ড ঈশ্বর দেখলেন, কই একটু নিবারণ তো করলেন না। তা তিনি থাকেন থাকুন, আমার দরকার বোধ হচ্ছে না। আমার তো কোনও উপকার হল না”। (সূত্র শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত, ষষ্ঠ সংস্করণ)

 

মাস্টার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ওরফে শ্রীম হচ্ছেন রামকৃষ্ণকথামৃত বইয়ের লেখক ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের একজন অন্ধভক্ত। ভক্তের কাছে বিদ্যাসাগরের ঈশ্বর সম্পর্কে এই রকম বক্তব্য শুনে রামকৃষ্ণ ঈশ্বরের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, “ঈশ্বরের কার্য কি বুঝা যায়, তিনি কি উদ্দেশ্যে কি করেন? তিনি সৃষ্টি, পালন সংহার, সবই করেছেন আমরা কি বুঝতে পারি? আমি বলি, মা, আমার বোঝাবারও দরকার নেই, তোমার পাদপদ্মে ভক্তি দিও। মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য এই ভক্তিলাভ। আর মা সব জানেন। বাগানে আম খেতে এসেছি, কত গাছ, কত ডাল, কত কোটি পাতা –এসব বসে বসে হিসেব করবার আমার কি দরকার। আমি খাই, গাছ-পাতার হিসেবে আমার দরকার নেই”। (সূত্র শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত, ষষ্ঠ সংস্করণ)।

 

এই হচ্ছে ইতিহাস। বিদ্যাসাগরের কাজকে এভাবেই পিছিয়ে দিতে সেকালে রামকৃষ্ণ ধর্ম নিয়ে মেতে ছিলেন। কাজেই এই দুজন মানুষকে সমানভাবে এই চেয়ারে বসানোর চেষ্টা একটি হীন অপচেষ্টা। ধর্মান্ধ একজন ধর্মগুরু কখনোই প্রগতির পক্ষে হয় না। রামকৃষ্ণ মিশনও তাই ভারতবর্ষের জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেনি। নিশ্চয় হিন্দুদের এইসব ধর্মগুরু ‘জিহাদ’ করতে বলেননি। কিন্তু মানুষে মানুষে ঠিকই বিভেদ করে রেখেছিলেন এবং ভাববাদ দিয়ে সমাজে কুসংস্কারকে বেঁচে থাকতে চেষ্টা করেছিলেন। আমি কখনোই ইসলামের সঙ্গে অন্য ধর্মকে এক করে দেখি না। ইসলাম হচ্ছে স্রেফ সন্ত্রাসী একটা ধর্ম। কিন্তু হিন্দু ধর্ম কুসংস্কারগ্রস্থ একটি ধর্ম। এখানে সন্ত্রাস নেই সত্য। কিন্তু কমিউনিটিতে মানুষের জীবন ঠিকই হাঁপিয়ে তোলে…।

 

-সুষুপ্ত পাঠক

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix