রকমারির বেস্ট সেলার ও আমাদের ভবিষ্যত

রকমারী ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা সোহাগ প্রাকটিসিং মুসলিম। তার টুপি দাড়ি সমেত ছবি সম্বলিত একটি ইন্টারভিউ যেটা টেন মিনিট স্কুলের আয়মান সাদিক নিয়েছিলেন, যেখানে সোহাগ তার জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বলেছিলেন, যত বেশি সংখ্যক মানুষকে নিয়ে জান্নাতে যাওয়া! এরকম একজন মানুষ অনলাইনে বই বিক্রি করবে যুক্তি অবিশ্বাস তর্কপ্রবণ একটি জেনারেশন বানানোর লক্ষ্যে- এরকম মনে করাই হচ্ছে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা!

আমি কিন্তু সোহাগের প্রতি বিদ্বেষ প্রসন করছি না। সে তার আদর্শের জায়গা থেকেই বই বিক্রি ও প্রচার করবেন এটাই স্বাভাবিক। আমার রাগ হচ্ছে আমাদের সুশীল টাইপ মানসিকতার উপর। একজন ধার্মিককে কি করে প্রগতিশীল আধুনিক মনে করেন আপনি? আমি ক্রিকেটার মঈন আলীর তালেবানী বোরখা পরিহিত স্ত্রীকে দেখিয়ে বলেছিলাম, এই মঈন আলীকে উদার আধুনিক ভালো মানুষ হিসেবে দেখার কোন সুযোগ নেই। তখন বহু নাস্তিকই সেটাকে ‘মুসলিম বিদ্বেষ’ বলেছিলেন।

একটা জেনারেশন এদেশে ভর করেছে যারা আগামী ২৫ বছর (এক প্রজন্ম ধরে) এদেশের সামাজিক চিত্র তৈরি করে দিবে। সংস্কৃতি অঙ্গনে কবরীদের বিদায় নেয়ার পর যারা থাকছে তারা সকলেই আয়মান সাদিক না হয় সোহাগের মত মানুষ। মানে যে জেনারেশনের কথা বললাম। মডারেট মুসলিম প্রজন্ম ও প্রক্টিসিং মুসলিম প্রজন্ম হাতে হাত ধরে চললেও কখনো কখনো তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ঘটে যায়। যেমন আয়মান সাদিককে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিলো মাসিক, সম্মতি থাকলে প্রাপ্ত বয়স্ক যে কেউ সেক্স করেত পারবে- এই বিষয় নিয়ে অন্য একজন তার টেন মিনিট স্কুলে একটি ভিডিও প্রচারের পর। সেই হত্যা হুমকির পর আয়মান সাদিক হাতজোর করে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন। আয়মান সাদিকরা হুজুর লেবাস নেয় না। কিন্তু তাদের প্যান্টের পকেটে একটা নামাজের টুপি থাকে। টাকনুর উপর প্যান্ট না পরলেও নামাজের আগে সেটা টাকনুর উপর গুটিয়ে নেয়। আলহামদুরিল্লাহ বলে কথার জবাব দেয়। মুসলমান হিসেবে গর্ব করে। ইসলামকে সবচেয়ে আধুনিক ও অগ্রসর একটি ধর্ম হিসেবে তুলে ধরে। এদের মধ্যেই কেউ কেউ হুজুর স্টাইলের পাঞ্জাবী পায়জামা টুপি দাড়ি ধরে ফেলে। সোহাগ আর আয়মান সাদিক- দুজনকে দেখে প্রজন্মের দুই ধারাকে বুঝতে পারবেন।

এ বছর সংস্কৃতি অঙ্গনের ষাট সত্তর বছর বয়েসী শিল্পী লেখকরা মারা গেলেন। তাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বলতে গেলে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে প্রগতিশীলতার যুগের অবসান ঘটল। সরওয়ার ফারুকী জামাতী মানসিকতা আগেই প্রকাশিত হয়েছে। তার ভাই-বেরাদার গ্রুপও একই মানসিকতাকে ধারণ করে। বলতে গেলে তাই সিনেমা নাটক পাড়ায় এখন প্যান ইসলামিস্টরাই ড্রাইভিং সিটে। এখন রোজা উপলক্ষ্যেও নাটক রিলিজ হয়! এটাই প্যান ইসলামিজমের নিয়ম। ইসলামে কার্যত নিষিদ্ধ এমন জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোকেও মুসলিম জাতি সংস্কৃতি ও প্রতিনিধিত্বকে মুখ্য করে উপস্থাপন করা। যেমন হলিউডে ‘মুসলিম অভিনেতা’। সিনেমা নাটক শরীয়তের চোখে নিষিদ্ধ। সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ। কিন্তু এখানে মুসলিম পরিচয়ে প্রতিনিধিত্বকে তুলে ধরে মুসলিম জাতীয়তাবাদ সরব করতে হবে। বাংলাদেশের নাটকে একজন পর্দানশীন মুসলিম মেয়ে ইসলামী চেতনায় একটা বখাটে যুবককে কি করে ভালোবাসা দিয়ে পথে ফিরিয়ে এনেছে সেই গল্প দেখানো হয়। সম্প্রতি মেহজাবিন ও আফরান নিশোর ‘মহব্বত’ নামের একটি নাটক প্রচারিত হয় যেখানে ঠিক এই গল্প দেখানো হয়েছে। এটিই প্রথম নয়। ইউটিউবে রিলিজ হয়েছে এরকম অসংখ্য নাটক যেখানে ‘এ গ্রেডের’ অভিনেতা ও নির্মাতারা সেসব প্রজেক্টে কাজ করেছেন। এই যে শিল্প সংস্কৃতি জগতের মেরুকরণ তার জন্য কিন্তু কম বেশি প্রয়াত কবরীদের দোষ কম নয়। তারা তাদের রিলে দৌড়ের কাঠিটি কেন পরবর্তীদের হাতে তুলে দিতে পারলেন না? রকমারীর বেস্ট সেলার লিস্ট নিয়ে আপনারা যদি কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন তাহলে বলব আমজনতার বিষয়ে আপনাদের ধারণাই নেই। এর জন্য হুমায়ূন আহমেদের মত বেস্ট সেলার লেখকই দায়ী। কারণ উনার লেখা পড়লে কেউ মিজানুর রহমান আজহারীর ফ্যান হতে পারবে না সেরকম কোন মশলা হুমায়ূনের লেখায় ছিলো না। হুমায়ূনের লেখার ফ্যান ছিলো পাঁড় জামাতী লোকজনও। দেশে আয়মান সাদিক কিংবা সোহাগদের মত প্রজন্ম তৈরি না হতে হুমায়ূন আহমেদ কিছু লিখেননি। যে কারণে ফারুকীরা বলতে পেরেছে এদেশের প্রগতিশীলরা দুর্গা পুজায় প্রোগ্রাম রাখতে পারে কিন্তু শবে বরাতে নিশ্চুপ থাকে!

প্রগতিশীলতা আধুনিকার সংজ্ঞাই বদলে দেয়া হয়েছে। একজন ‘হুজুর’ লোককে গোঁড়া বললে এখন আপনি উল্টো গোঁড়া হিসেবে আক্রান্ত হবেন! কারণ ফুরফুরার আব্বাস সিদ্দিকী ভাইজানই হচ্ছেন এখন আধুনিক প্রগতিশীল সেক্যুলারের আইকন! তাকে মৌলবাদী বললে আপনাকে নরকের কিট বানিয়ে দিবে খোদ পশ্চিমবঙ্গের অমুসলিম প্রগতিশীল শ্রেণীই। আব্বাস সিদ্দিকীর ফ্যান বাংলাদেশের নাটক সিনেমার লোকজন। গল্পকার উপন্যাসিকদের ফেইসবুক ঘুরলে দেখা যাচ্ছে সাঈদীর পক্ষে মিছিল করা এই আব্বাস সিদ্দিকীর ভাষণ তারা শেয়ার দিচ্ছে! বলছে তারা তো ভাইজানের মধ্যে কোন উগ্রতা দেখছেন না! একদম গড়ের মাঠের মুসলিম লীগের মিটিংয়ের মত! সেদিন সেখানে ‘মুসলমান’ হিসেবে যারা উপস্থিত ছিলেন তারাই পরে প্রগতিশীল হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন। আয়মান সাদিক ও সোহাগও কিন্তু মৌলবাদীদের হুমকি পেয়েছিলো। আহমদ ছফাও নাকি গ্রামে যেতে পারতেন না ধর্মটর্ম পালন করেন না বলে। কিন্তু কোন ‘দাড়িঅলা হুজুরকে’ অনলাইন বই বিক্রেতা হিসেবে দেখলে কি তিনি অখুশি হতেন? মনে তো হয় না!

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix