মুনির কমিশন রিপোর্ট হতে পারত মুসলিমদের আত্মশুদ্ধির দলিল

১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও লাহোরে আহমদিয়া (কাদেয়ানি) সম্প্রদায়কে অমুসলিম ও নাস্তিক আখ্যা দিয়ে হাজার হাজার সাধারণ মুসলমান ও মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা এক ভয়াবহ নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় আহমদিয়াদের উপর। এই সাম্প্রদায়িক আক্রমনে এক হাজার মানুষের প্রাণ চলে যায়। এই ঘটনা তদন্ত করতে পাকিস্তান সরকার বিচারপতি মোহাম্মদ মুনির ও বিচারপতি কাইয়ানিককে নিয়ে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। ইতিহাসে এটি ‘মুনির কমিশনের রিপোর্ট’ নামে পরিচিত। এই কমিশন প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার আলেম ওলামাদের কাছ থেকে ধর্মীয় বিধান জানতে চেয়ে তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। পাকিস্তানে অমুসলিম নাগরিকদের অবস্থান কেমন হবে তা জানতে তাদের মতামত চাওয়া হয়। মাওলানা আবুল হাসনাত, সৈয়দ মোহাম্মদ আহমদ কাদরী, মাওলানা আহমদ আলী, তোফায়েল মাহমুদ, মাওলানা আবদুল হামিদ প্রমুখ কমিশনের ডাকে সাড়া দিয়ে সাক্ষাৎকার দেন। তাদের কাছে মুনির কমিশন প্রশ্ন করেছিলো, যদি পাকিস্তানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয় সেখানে কি কাফের (অমুসলিম) নাগরিকদের আইন প্রণয়ণের অধিকার থাকবে? তারা আইনের রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে? তারা কি পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে? (If we were to have an Islamic State in Pakistan, what will be the position of the kuffar? Will they have a hand in the making of the law, the right to administer the law, and the right to hold public offices? )

 

উত্তরে সমস্ত আমেলগণ মত দিয়েছেন, ইসলামী রাষ্ট্রে কোন কাফের (অমুসলিম নাগরিকদের) আইন প্রয়োগ বা প্রণয়ন করার কোন অধিকার থাকবে না। তারা হলো মুসলিমদের জিন্মি। তারা নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে না। (Their position will be that of zimmies. They will have no voice in the making of laws, no right to administer the law, and no right to hold public offices. …In that case such communities cannot have any rights of citizenship. )

 

এই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে মুনির কমিশন ওলামাদের মতামত তুলে ধরে রিপোর্ট করে যে, ইসলামী রুলসে পাকিস্তানের অমুসলিমরা এদেশের নাগরিক নয় এবং তাদের কোন অধিকার নেই আইন বা ক্ষমতায়। তারা পাকিস্তানের মুসলমানদের সমতুল্য হতে পারে না…। (According to the leading ulama, the position of non-Muslims in the Islamic State of Pakistan will be that of zimmies, and they will not be full citizens of Pakistan, because they will not have the same rights as Muslims. They will have no voice in the making of the law, no right to administer the law, and no right to hold public offices. A full statement of this position will be found in the evidence of Maulana. Abul Hasanat ,Sayyad Muhammad Ahmad Qadri, Maulana Ahmad Ali, Mian Tufail Muhammad, and Maulana Abdul Haamid Badayuni.)

মুনির কমিশনের রিপোর্ট পড়ুন এখান থেকে- http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00islamlinks/txt_munirreport_1954/0707nonmuslims.html

 

মুনির কমিশন ওলামাদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলো, তাহলে কি ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা সেখানে হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করতে পারে কিংবা আইন হিসেবে মনুর বিধান কার্যকর করতে পারে? ওলামারা জবাব দিয়েছিলেন সেটা তারা করতে পারে এবং এতে তাদের কোন অবজেকশন নেই। মনে হতে পারে তারা আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম সংস্কৃতি পছন্দ করার অধিকারকে অগ্রাধিকার মনে করেন। আসলে তা নয়। মুনির কমিশন প্রশ্ন করেছিলো, চার কোটি ভারতীয় মুসলমানরা কি তাদের রাজ্যের বিশ্বস্ত নাগরিক হতে পারবে? (Will it be possible for the four crore of Indian Muslims to befaithful citizens of their State?) উত্তরে ওলামারা বলেছিলেন, না! ওলামারা দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছিলেন, It is not possible that a Musalman should be a faithful citizen of a non-Muslim Government.  এটা কিছুতে সম্ভব নয় যে, মুসলমান অমুসলিম সরকারের বিশ্বস্ত নাগরিক হতে পারবে।

 

মুনির কমিশন এরপর প্রশ্ন করেন, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ লাগলে ভারতের মুসলিমদের কার পক্ষ নেয়া উচিত বলে মনে করেন? (What will be the duty of Muslims in India, in case of war between India and Pakistan? )। ওলামাদের উত্তর ছিলো, ভারতীয় মুসলমানদের উচিত হবে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ফাইট না করা (Their duty is obvious, namely, to side with us and not to fight against us on behalf of India.)।

 

কেমন করে মুসলমানদের সারা পৃথিবীতে সন্দেহভাজন আর অবিশ্বস্ত হতে তালিম দেয়া হয় একবার ভেবে দেখুন। ভারতের মুসলমানদের নিজ দেশে পরবাসী করে গড়ে তোলার, প্রতিবেশী অমুসলমান নাগরিকদের কাছে অবিশ্বস্ত আর দেশপ্রেমহীন করে গড়ে তোলার মিশন থেকে যে ক’জন মুসলমানকে উৎপাদন করা সম্ভব হয় তাদের জন্য গোটা মুসলিম কমিউনিটিকে ভোগ করতে হয় অসন্মান অপদস্ত। ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন ইসলামী সংস্থা, মসজিদ, কমিউনিটি থেকে নতুন প্রজন্মের মুসলিম ছেলেমেয়েদের একইভাবে তাদের বসবাসকৃত রাষ্ট্রের সরকারকে ‘কাফের শাসক’ বলে তুলে ধরে এভাবেই তাদের দায়িত্ব কর্তব্য কি হবে তার বয়ান চলে। কাস্মির থেকে সিরিয়া, আরাকান থেকে আফগানিস্থান, ফিলিস্তিন- মুসলমানদের কাছে এভাবেই বিশ্বকে ভাগ করা হয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই সারা পৃথিবীতে ইসলাম ক্ষমতা দখল করে নেয়, তাহলে কেমন হতে পারে অমুসলিমদের পরিণতি ভাবতেই বিবমিষা লাগে। ইবনে কাথিরের তাফসির থেকে জেনে নিন ইসলাম অমুসলিমদের করজোরে অপদস্ত হয়ে কেমন করে মুসলমনাদের জিজিয়া কর দিবে তার রগরগে বর্ণনা- http://www.qtafsir.com/index.php?option=com_content&task=view&id=2566&Itemid=64

পুরো তাফসির ডাউনলোড করে নিতে পারেন এখান থেকে-http://www.quraneralo.com/tafsir/

 

মুনির কমিশন ওলামাদের কাছে প্রশ্ন করেছিলো, ভারতের মুসলমানদের কি প্রকাশ্যে তাদের ধর্ম প্রচারের অধিকার থাকা উচিত (Is it a part of the duty of Muslims in India publicly to preach their religion?)। ওলামাদের জবাব ছিলো, এরকম অধিকার তাদের থাকা উচিত (They should have that right. )। চিন্তা করুন একবার, মুসলমানদের অধিনে অমুসলমাদের কোন নাগরিক অধিকার থাকবে না, তারা স্রেফ জিন্মি আর অমুসলিম দেশে তাদের সব রকম সমান অধিকার দিতে হবে! যদি না দেয়, যদি অমুসলিম দেশে (যেমন ভারত) মুসলমানদের এরকম বৈষম্য হতে দেখা যায় তখন কি করতে হবে? জবাব দিয়েছিলেন ওলামাবৃন্দ্র, এরকম হলে তারা মার্চ করতে করতে ভারত মুখে ছুটবেন ভারত আক্রমন করতে (If India makes any such law, believer in the Expansionist movement as I am, I will march on India and conquer her.)!

মুনির রিপোর্টের এই অংশটি পড়ুন এখান থেকে- http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00islamlinks/txt_munirreport_1954/1111reaction.html

 

তো অমুসলমান-কাফের কারা সেটা তো স্পষ্ট। তাদের কিভাবে সাইজ করতে হবে তাও জানলাম। কিন্তু মুসলমান কে? কে জিন্মি করবে, জিজিয়া নিবে, গণিমত লুন্টন করবে-তা আগে নির্ধারিত করতে হবে। মুনির কমিশন এই প্রশ্ন রেখেছিলো মুসলমানের সংজ্ঞা কি হবে? তাজ্জাব ব্যাপার, ওলামাদের মত অনুযায়ী মুসলমানের সংজ্ঞা একেক জনের কাছে একেক রকম! এবং একজনের সংজ্ঞা মেনে নিলে বাকীদের অমুসলমান বলে গোণ্য করতে হবে। মুনির কমিশন মন্তব্য করেছিলো, এই ওলামাদের কারোর সংজ্ঞা অনুসারে মুসলমানের সংজ্ঞা মেনে নিলে বাকী ওলামাদেরই অমুসলমান আখ্যা দিতে হয়! আহমদিয়াদের অমুসলিম সংজ্ঞা দিয়ে তাদের হত্যা, শিয়াদের অমুসলিম আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যার এই যে খেলা তার মূলে আজ পর্যন্ত মুসলমানের কোন সংজ্ঞা কেউ দিতে পারেনি। আজ পর্যন্ত আলেমরা একমত হতে পারেনি ‘সহি মুসলমান’ আসলে কে?

 

জানি এখনই এসে কেউ কেউ দাবী করবেন, এসব কাঠমোল্লাদের কথায় ইসলাম প্রমাণিত হয়ে যায় না। ইসলাম বলতে একমাত্র কুরআনকে বুঝায়। কুরআনের আয়াত ছাড়া আমরা আর কারোর কথাকে বিশ্বাস করি না… ইত্যাদি। তাদের জন্য কুরআনের এই আয়াতটি দিয়ে লেখা শেষ করছি। এই আয়াতটি মুসলমানদের অমুসলিমদের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী এক শত্রুতা আর হানাহানি সূচনা করা হয়েছে। কুরআন ঘোষণা করে, ‘তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে (সূরা আত তাওবা ৯: ২৯)।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix