মুক্তিযুদ্ধের কন্ঠযোদ্ধা এম আর আখতার মুকুল: একটি পর্যালোচনা

চরমপত্র খ্যাত এম আর আখতার মুকুল ঠিক কি কারণে খাজা নাজিমউদ্দন, খান এ সবুর কিংবা জুলফিকার আলী ভূট্টকে অপছন্দ করবেন? এমনকি যুদ্ধাপরাধ বাদ দিলে গোলাম আযম যে মুসলিম জাতীয়তাবাদ দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসকে দেখতেন মুকুল তার লেখা “কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী” ও “গয়রহ” বই দুটিতে সেই চশমা দিয়েই দেখেছেন। তিনি “কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী” বইয়ের শুরুই করেছেন এভাবে-

“আমি বুঝতে চাই, কোন মন মানসিকতার দরূণ বাস্তবতাকে স্বীকার করতে না পেরে সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় আর্যদের উত্তরসূরী বর্ণ হিন্দুরা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ এলাকার বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিলো এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘শরাফত’ ও ‘খানদানী’ মুসলমানিত্বের দাবীদার অবাঙালী মুসলমানরা এদেশ থেকে বিড়াড়িত হয়েছিলো।“ (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, এম আর আখতার মুকুল, পৃষ্ঠা-১৮)।

দেশভাগের সময় দেশত্যাগী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তার বিদ্বেষ কি প্রকট দেখুন। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে উল্লেখ করেছেন “আর্যদের উত্তরসূরী বর্ণ হিন্দুরা”। ১৯৮৫ সালে লিখিত এই বই বের হবার আগে মাত্র ১৪ বছর আগে মুকুল কথিত আর্যদের উত্তরসূরী বর্ণ হিন্দুরাই তাদের খাওয়া পরার জন্য পথে পথে পয়সা তুলেছেন। পুরো মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, বিশেষত পূর্ববঙ্গ ফেরত হিন্দুরাই ছিলো আবেগে অন্ধ। মুকুলের মত প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের আশ্রয়ে থাকা ঢাকার কবি সাংবাদিক লেখক বুদ্ধিজীবীদের সকলেই ছিলো তীব্রভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদী। এই জাতীয়তাবাদ কোন দোষের নয়। শুধু হিন্দু জাতীয়তাবাদ অত্যন্ত খারাপ জিনিস। আসছি সে বিষয়ে। তার আগে মুকুলের চেতনার জায়গাটা ধরা দরকার আগে। তিনি লিখেছেন-

“আমার মনে অনেক প্রশ্ন ও কৌতুহল। ইতিহাসের কোন পেক্ষাপটে বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠি যুগের পর যুগ, এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দী বহিরাগত আর্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো এবং আর্য ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি বর্জন করেছিলো? আবার ইতিহাসের কোন প্রেক্ষিতে স্থানীয় এই বিশাল জনগোষ্ঠি খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী থেকে শুরু করে কয়েকশ বছর ধরে এদেশে আগমনকারী পীর ফকির দরবেশ এবং আউলিয়াদের প্রচারিত উদারপন্থি (রক্ষণশীল শরীয়তপন্থী নয়) ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলো?” (কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, এম আর আখতার মুকুল, পৃষ্ঠা-১৮)।

আর্যরা যে বহিরাগত সেটা নিয়ে তো কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু বহিরাগত মুসলিমদের প্রতি মুকুলের কোন ক্ষোভ নেই কেন? ব্রেকেটে “রক্ষণশীল শরীয়তপন্থী নয়” বললেও বইয়ের পাতায় পাতায় এই শরীয়তপন্থী তিতুমীর শরীয়তুল্লাহর ওহাবী কট্টর ইসলাম প্রচারের পক্ষে তিনি বলে গেছেন! তুরস্কের খলিফাকে নিজেদের খলিফা বলে যে খিলাফত আন্দোলন তাকে সমর্থন ও সমীহ নির্দোষ মনে করা মুকুল কিন্তু বালাজির “শিবাজি উত্সবকে” “হিন্দুত্ববাদের” দোষ দেখছেন! এরকম শত শত স্ববিরোধীতা করে তিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদের চেতনায় “বাঙালী জাতীয়তাবাদ” দাবী করেছেন। বলেছেন বাঙালী জাতীয়তাবাদ এখন শিশুকালে আছে। আস্তে আস্তে এটি বিকশিত হবে। সেটি যে ভালো করেই হচ্ছে সেটি ২০২১ সালে খুব ভালো করেই বুঝতে পারা যাচ্ছে।

হিন্দুদের প্রতি তার রোষ বেরিয়ে এসেছে তার “গয়রহ” বইয়ে সবচেয়ে বেশি। ইসলামী রাজনীতিওয়ালারা আওয়ামী লীগকে হিন্দু ভারত প্রেমি দাবী করে সব সময় তাদেরকে অমুসলিম চেতনার একটা প্রচার চালালেও “গয়রহ” বইয়ের লেখা আমি সমস্ত ইসলামিক অনলাইন লাইব্রেরি, ব্লগ, ওয়েবসাইটে পেয়েছি। শিবিরের অনলাইন লাইব্রেরিতেও তার বই দুটি সমাদৃত। “গয়রহ” বইতে তিনি হিন্দুদের মধ্যে ভালো খুঁজে পেতে ঠগ বাছতে গা উজার বলেছেন। তিনি লিখেছেন-

“পন্ডিতরা বলেছে বাংলার রেনেসাঁ, আসলে সেটাই ইংরেজের দালালী’ চ্যাপ্টারে লিখেছেন, ‘সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা যেভাবে সিপাহীদের (যাদের প্রায় সকলেই ছিল মুসলমান) কোনোরূপ বিচার ছাড়াই গণহারে ফাঁসি আর কামানের তোপের মুখে বেঁধে শহীদ করেছিল, তা ইতিহাসে বিরল। শুধু তাই-ই নয়, এসব ফাঁসি আর হত্যাকা-ের পর তৎকালীন ইংরেজ সরকার বিদ্রোহের সমর্থকদের খুঁজে বের করে শহীদ করতে উত্তর ও পূর্ব ভারতীয় এলাকার সমস্ত শহরে মার্শাল আইন জারি করে। কিন্তু একটি মাত্র শহরে এর ব্যতিক্রম হয়েছিল, আর তা হচ্ছে বাংলার তথাকথিত রেনেসাঁর প্রাণকেন্দ্র কলকাতা। সিপাহী বিপ্লবের সময় কলকাতার তথাকথিত বিত্তশালী, মধ্যশ্রেণী ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা (যাদের সকলেই ছিল হিন্দু) ইংরেজদের সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছিলো বলেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। একাত্তরে আমাদের দেশে যারা রাজাকার হয়েছিল, তারা ছিল মোট জনগোষ্ঠীর অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। কিন্তু হিন্দুদের ক্ষেত্রে দেখুন, তারা গোটা জাতি মিলেই ব্রিটিশদের রাজাকারগিরি করেছিল। যে কারণে গোটা কলকাতা শহরকেই মার্শাল আইনের আওতার বাইরে রাখতে দ্বিধা করেনি ব্রিটিশরা। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, তাদের মধ্যে ভালো খুঁজতে গেলে ‘ঠগ বাছতে গা উজাড়’ হওয়া ছাড়া কিছুই হবে না’।

“গয়রহ”বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে মুকুল লিখেছেন “বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী মহলের নাসিকা-কুঞ্চনকে স্রেফ অগ্রাহ্য না করলে আমার পক্ষে ‘আমি বিজয় দেখেছি’র পর ‘কোলকাতা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী’ এবং ‘আব্বা হুজুরের দেশে’র পর ‘গয়রহ’র মতো বিতর্কমূলক অথচ বস্তুনিষ্ঠ বই লেখা সম্ভব হতো না। ঘটনা পরম্পরায় আমি কোনো গোষ্ঠীভুক্ত নই এবং এজন্য আমি বাংলাদেশের বাঙালি হিসেবে গর্ব অনুভব করি। কেননা এরই ফলশ্রুতিতে আমার পক্ষে সত্যাশ্রয়ী ও বাস্তবধর্মী রচনা সম্ভব হচ্ছে।”

  • মুকুল কি রকম দ্বিজাতিতত্ত্ব বুকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে কোলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিলো সেটার বিবরণ তারই লেখা আরেক বই “আমি বিজয় দেখেছি”-তে পাওয়া যায়। সেখানে ৬৪-৬৫ সালে পাকিস্তান সরকারের এনিমি প্রোপার্টি করে হিন্দুদের খেদানো মিশনে দেশত্যাগকারীদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে খোদ কোলকাতার শ্যামবাজার থিয়েটার হলে এক হলভর্তি মানুষের সামনে বক্তব্যে বলেন, “আপনারা যারা মনে করছেন বাংলাদেশে স্বাধীন হলে যারা ৪৭, ৫০, ৫৮, ৬৪, ৬৫ সালে সীমানা অতিক্রম করেছেন তারা বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আপনাদের এককালের জন্মভূমিতে ফিরতে পারবেন- এমন অলীক স্বপ্ন দেখলে শুধু মানসিক যন্ত্রণাই বৃদ্ধি পাবে আপনাদের…(আমি বিজয় দেখেছি, এমআর আখতার মুকুল, পৃষ্ঠা-৫৪)।

একই বইতে পাকিস্তানে যে তারা ভালো ছিলেন সেকথাও উল্লেখ করেছেন। “আমরা করাচি লাহোর গিয়ে তাদের চাকচিক্ক দেখে নিজেদের বঞ্চিত ভেবেছিলাম তাই এই যুদ্ধটা আমাদের কাছে ন্যায্য বা অবিধারিত মনে হয়। কিন্তু এখানে আসার পর (কোলকাতায়) আপনাদের মধ্যবিত্ত জীবন দেখে মনে হচ্ছে পাকিস্তানে আমরা খারাপ ছিলাম না…(আমি বিজয় দেখেছি, এমআর আখতার মুকুল, পৃষ্ঠা-৫৩)

এম আর আখতারের বইয়ের রিভিউ করার উদ্দেশ্য আমার নয়। সেটা করতে গেলে লাল কালিতে তার উল্লেখিত দুটি বইয়ের কোন লাইনই বাকী থাকবে না। বাঙালী বলতে তিনি ধর্মে ইসলাম ভাষায় বাংলা বলা পূর্ববঙ্গে জনগোষ্ঠিদের ধরেছেন যারা আর্যদের গ্রহণ করেনি কারণ তারা বর্বর কিন্তু ইসলাম ছিলো সুমহান তাই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। শুরুতে তাই যে প্রশ্ন করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টিকারীদের মধ্যে আসলে ভ্রাতৃঘাতি যে গৃহবিবাদ সেটাই “স্বাধীনতার পক্ষ” ও “স্বাধীনতা বিপক্ষ” নামে পরিচিত। “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ” এবং “মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ” এই দুটি গ্রুপই যে দ্বিজাতিতত্ত্বের দুটি শাখা এ বিষয়ে এখন আর তেমন কোন সন্দেহ নেই। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” বলতে তাই কি বুঝায় সেটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

তবে এইসব ইতিহাসের বিশ্লেষণ যে উত্স থেকে তার সবগুলিই ভারতীয় বামপন্থি লেখকদের বই থেকে। মুকুল তার বইতে কোট করে নিয়েছেন সেগুলো থেকে দুহাতে। ভারতীয় হিন্দু বামপন্থীরা খেলাফত ওহাবী আন্দোলনকে মুক্তহস্তে সমর্থন করেছেন আবার হিন্দুত্ববাদের বিপক্ষে কথা বলেছেন। কবি নজরুল ইসলামের মত সেকালের প্রগতিশীরা যখন খিলাফতের অবসানকারী কামাল আতার্তুককে সমর্থন করছেন প্রগতিশীল সেক্যুলার বলে, ওহাবী খিলাফত আন্দোলনকারী রক্ষণশীল মুসলিমরা যখন নজরুলদের মত তরুণদের বিরুদ্ধে ক্ষেপছেন, সেই প্রেক্ষাপটে কি করে বামপন্থিরা ভারতবর্ষের ওহাবীদের সমর্থন করে? মুকুল তার মুসলিম জাতীয়তবাদকে মজবুত করতে পেরেছে বামপন্থীদের ইতিহাস পড়ে। এমন কি উপমহাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্দোষ স্বাভাবিক মুসলিম একটি জাতিসত্ত্ব হিসেবে মুসলিমদের মনে শক্তিশালী করেছে বামপন্থীদের বইগুলো। মুকুলকে তাই বেশি দোষ দেয়া যায় না।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix