মদিনার বণু নাযির ইহুদীদের ভাগ্য

ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস হতে পারে কিন্তু কোন ব্যক্তি বা পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী বলা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে হতে পারে না। এর জন্য চাই প্রমাণ। ঐতিহাসিক দলিল। ইসলাম ধর্মের নবী হযরত মুহাম্মদকে ইহুদীরা হত্যা করতে চেয়েছিল এরকম দাবী ইসলাম ধর্ম করে থাকে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এর অভিযোগে গোটা ইহুদী সম্প্রদায়কে হত্যা করার মত নৃশংস ঘটনাও ইসলামে আছে। মুসলমানরা দাবী করেন, ইহুদীরা যদি তাদের নবীকে খুন করার গোপন ষড়যন্ত্র করে থাকে- তাহলে কি মুসলমানরা চেয়ে চেয়ে দেখবে নাকি? নিরাপত্তার খাতিরেও তাদের নির্মূল করতে হবে। খুবই যৌক্তিক কথা। ইসলাম ধর্ম মহাত্মা গান্ধির অহিংস আন্দোলন নয়। এক গালে চড় খেয়ে আরেক গাল পেতে দেয়ার ধর্ম নয়। ইসলাম ইটের বদলে পাটকেল মারে। আমরা এখন শুধু দেখবো পাটকেলটা সঠিকভাবে মারা হয়েছিল কিনা, অর্থ্যাৎ কেউ কি সত্যিই ইট ছুড়ে মেরেছিল?

মদিনার বনু নাযির ইহুদীদের খুন করার মানসে মুসলমানরা তাদের অবরোধ করে রাখে দূর্গের মধ্যে। অভিযোগ ভয়াবহ। ইসলাম ধর্মের নবীকে তারা পাথর চাপা দিয়ে হত্যা করতে গোপন ষড়যন্ত্র করেছিল! মদিনায় মুহাম্মদ কুরাইশদের আক্রমণ ঠেকাতে সেখানে ইহুদীসহ নানা গোত্রের সঙ্গে নানারকম চুক্তি করেছিল। বলে রাখা ভাল মদিনায় মুহাম্মদের ইমেজ একসময় খুবই ভাল ছিল। তার আপত গেরুয়া দর্শনের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী চেহারা তখনো মদিনাবাসীর জানা ছিল না। সেই শান্তি চুক্তিতে মদিনার বনু আমির গোত্রের দুইজন ইহুদীর নিরাপত্তার ভার নিয়েছিলেন মুহাম্মদ। ঘটনাচক্রে সেই দুইজন লোককে আমর ইবন উমাইয়া (বনু নাযির গোত্র) হত্যা করে। যদিও ইহুদী কবি সিমাক লিখেন, আমর কোন বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, ওয়াদাখেলাপও করেনি। বনু আমির ও বনু নাযির এই দুই গোত্রের মধ্যে শান্তি ও মৈত্রী সম্পর্ক ছিল। বিষয়টা তাই সন্দেহজনক যে আমর কি সত্যিই বনু আমির গোত্রের দুইজনকে হত্যা করেছিল? যেহেতু প্রমাণ নেই। সন্দেহটা ঘনিভূত হয় তখন যখন এই হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বনু নাযিরদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয় নিঃস্ব অবস্থায় একটি প্রমাণহীন অভিযোগে। রক্তপণ আদায় করতে ইসলামের নবী তার তিনজন সাহাবীকে নিয়ে (আবু বকর, ওমর, আলী) বনু নাযির ইহুদীদের গ্রামে আসলেন কথা বলতে। একটা বাড়ির সামনে গিয়ে কাউকে ডাকলেন। কোন একসময় নবীজি কাউকে কিছু না বলেই সেই স্থান ত্যাগ করে মদিনায় ফিরে আসেন! ওমর, আলী, আবু বকররা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে মদিনায় ফিরে আসেন। তারা নবীকে দেখে জানতে চান কি ব্যাপার? নবী তাদেরকে বলেন ওহির মাধ্যমে তাকে জানানো হয়েছিল ওখানে তাকে উপর থেকে বড় পাথরের চাই ফেলে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তোমরা সবাই বনু নাযির ইহুদীদের উপর আক্রমণ করার জন্য তৈরি হও…।

আলী, ওমর, আবু বকররা অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেও কোন ষড়যন্ত্রকে টের পেলেন না। তাদের মাথাতেও কোন পাথর এসে পড়ল না। দুনিয়ার কোন মানুষ জানতে পারলো না ইহুদীদের ষড়যন্ত্রকে। শুধু মহাম্মদের কাছে ওহির মাধ্যমে কানে কানে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন তাদেরকে হত্যা করার জন্য ইহুদীরা পাথর ছুড়ে মারতে চেয়েছে…। এরকম বায়ুবীয় অভিযোগের ভিত্তিতেই সেদিন বনু নাযির ইহুদীদের উপর সত্যিকারের কেয়ামত নেমে এসেছিল। ইহুদীদের খেজুর বাগানকে আগুন নিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলেন মুহাম্মদ। ইহুদীরা চিৎকার করে বলে, হে মুহাম্মদ, আপনি না গাছ ধ্বংস করাকে নিষেধ করেন, এখন আপনিই এসব শুরু করেছেন! এই ঘটনার পর আয়াত নাযিল হয় কুরআনে। আল্লাহ সুরা হাশরে বলেন, তিনি বনু নাযিরদের উচিত শিক্ষা দিযেছেন, তার রসূলকে কোন যুদ্ধ ছাড়াই দান করেছেন প্রভূত সম্পত্তি! আর খেজুর গাছ কাটা কোন নাশকতা নয়, এ হচ্ছে প্রতিশোধমূলক কাজ!…

হায়রে নৈতিকতা! সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর কেন এত গাছ কেটে সাফ করেছিল সেটা বুঝতে নিশ্চয় এখন বেগ পেতে হবে না। কারণ ওসব করা তাদের কাছে কোন অপরাধ মনে হয়নি, বরং মনে হয়েছিল তারা প্রতিশোধ নিচ্ছে…। জামাত শিবির কোন ইসলাম বিরোধী দল নয়। দুনিয়ার কোন ইসলামী জিহাদী দলই ইসলাম বিরোধী নয়। আমাদের সাদা চোখে, স্বাভাবিক নৈতিক অবস্থান থেকে ইসলামী দলগুলোর কৃতকর্মকে নাশকতা, অপরাধ, বর্বর বলে মনে হয় বলেই আমরা বলি এরা ইসলাম ধর্মের কেউ না! বনু নাযির গোত্রের সকলকেই হয়ত হত্যা করা হতো বনু কুরাইজাদের মত। কিন্তু মধ্যস্থকারীদের কারণে সেটি না হয়ে ফয়সালা হয় বনু নাযিররা তাদের দেশ ত্যাগ করে চলে যাবে দূর বিদেশে। তাদের সম্পত্তির যতটুকু সম্ভব উটের উপর নেয়া যাবে তার বেশি সঙ্গে নেয়া যাবে না। বাকীটার মালিক হবে ইসলামের নবী স্বয়ং। বনু নাযিররা চিরকালের জন্য মদিনা ছেড়ে ইসলাম কথিত “রক্তপাতহীন” ফয়সালার মাধ্যমে দেশান্তরিত হয়। তাদের অপরাধ ছিল তারা নবীকে হত্যা করতে চেয়েছিল। এই হত্যার অভিযোগটি দুনিয়ার কোন মুসলমানই প্রমাণ করতে পারবে না কুরআনের সুরা ছাড়া। একজন বিশ্বাসী মুসলমান হিসেবে তাই আপনাকে “অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে ইহুদীরা নবীজিকে হত্যা করতে চেয়েছিল”!

(সূত্র: নবী জীবনী, সিরাতুন নবী- ৩য় খন্ড, লেখক: ইবনে হিশাম)

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix