ভারতীয় ফটো সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকিকে তালেবানরা হত্যা করল কেন?

এখন জানা যাচ্ছে ভারতীয় ফটো সাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকিকে তালেবানরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তিনি যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে যাননি। দানিশের প্রতি তালেবানদের এই নিষ্ঠুরতা, দানিশ একজন মুস লিম হওয়ার পরও তালেবানরা কেন তাকে রেহাই দেয়নি, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া মানে হচ্ছে উপমহাদেশে তালেবান, আল কায়দাসহ ছোট বড় যত জঙ্গি দল আছে তাদের রাজনীতি সন্ত্রাসকে বাইনোকুলারের উল্টো দিক দিয়ে তাকিয়ে বিশ্লেষণ করা।

 

দানিশ সিদ্দিকি তালেবানদের হাত থেকে বাঁচতে একটা মসজিদে গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সেখান থেকে তালেবানরা তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে মাথা থেঁতলে দেয় এবং গুলিতে পুরো শরীর ঝাঁঝরা করে ফেলে। দানিশের উপর এই ক্ষোভের কারণ দানিশ একজন “ভারতীয়” ছিলেন। দানিশ ভারতীয় হলেও ধর্মে সে মুস লমান ছিলেন। তবু তার উপর এতখানি ক্ষুব্ধ কেন ছিলো তালেবান? দানিশের উপর ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষুব্ধ ছিলো। তার মৃত্যুতে তাই হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক দু:ক্ষিত হতে দেখা যায়নি। তালেবানরা দানিশের কাজ সম্পর্কে অবগত ছিলো। ভারতে নাগরিক আইনের সময় তার ফটোগুলো মিডিয়ার মাধ্যমে সকলেই দেখেছে। নাগরিক আইনের সময় ভারতীয় মুস লিমদের এক ধরণের মুস লিম জাতীয়তাবাদের ফানুস উড়াতে দেখা গেছে। জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহ সেরকমই ছিলো। সব মিলিয়ে দানিশের উপর তালেবানদের অতিমাত্রায় ক্ষুব্ধতার কারণ হতে পারে না। এর উত্তর পেতে হলে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের একটি ঐতিহাসিক সর্বসম্মত ফতোয়ার কথা জানতে হবে যেখানে উপমহাদেশের বুজর্গো আলেমরা একমত হয়েছিলেন যে, ভারতীয় মুস লমানদের অবশ্যই নিজ দেশের প্রতি অবিশ্বাসী হতে হবে এবং ভারতে যখন ইস লামের সেনারা হামলা চালাবে তখন তাদের উচিত হবে মুজাহিদদের পক্ষ নেয়া। লাহোরে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে কাদিয়ানীদের উপর নৃশংস হত্যাকান্ড চলানোর পর সরকার থেকে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় তাকেই বিখ্যাত ‘মুনির কমিশন’ বলা হয়। সেই কমিশন কাদিয়ানীরা মুস লিম কিনা সে ব্যাখ্যা আলেমদের কাছে জানতে চেয়ে তাদের কমিশনে ডেকে পাঠান। তখন মুস লিমদের সংজ্ঞা ও মুস লিম কারা ও কি তাদের করণীয় এরকম প্রশ্নে আলেমরা ফতোয়া দেন। তখন প্রশ্ন করা হয়েছিলো, ভারতে বসবাস করা মুস লিমদের কি ভারতের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা উচিত? আলেমদের সম্মলিত ফতোয়া ছিলো, “ It is not possible that a Musalman should be a faithful citizen of a non-Muslim Government”। মানে এটা কোনভাবেই সম্ভব নয় একজন মুস লমান অমুস লিম সরকারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে! আরেকটি প্রশ্ন ছিলো, যদি পাকিস্তান ভারত আক্রমন করে তাহলে ভারতীয় মুস লিমদের কি করা উচিত হবে? আলেমদের ফতোয়া ছিলো, “Their duty is obvious, namely, to side with us and not to fight against us on behalf of India.”। মানে তাদের উচিত হবে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া! তালেবানরা এই ফতোয়া যে জানে বলাই বাহুল্য। ভারতীয় উপমহাদেশের মুস লমানরা মূলত দেওবন্ধ ফতোয়ার উপর নির্ভর করে। এইসব ফতোয়া শরীয়ার ভিত্তিতে করা হয়েছিলো। সেই আলোকে দানিশের বড় অপরাধ ছিলো তালেবানদের চোখে দানিশ কেন ভারত রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলো। দানিশের উচিত ছিলো লস্কর, জইশ ই মুহা ম্মদের পক্ষ নেয়া। দানিশ “ভারতীয়” ছিলো এবং নিজে সেই পরিচয়টা দিতো। তাই ফতোয়া অনুযায়ী দানিশ ছিলো অপরাধী। তালেবানরা তাই তাকে হত্যা করেছিলো। যেসব মুস লমান তালেবানদের বিজয়ে খুশি হচ্ছে প্রকাশ্যে বা গোপনে তারা জানে না তালেবান কতখানি গোঁড়া। গোঁড়া বলেই নিষ্ঠুর। মুস লিম হলেও তারা ছেড়ে দিবে না। বুকে হেঁটে কেন হিযরত করে তালেবানে যোগ দেয়নি সে কারণেই কুকুরের মত গুলি করে মারবে মডারেট মুমিনদের। জামিয়ার শিক্ষিত মুস লিমদের যারা নাগরিত্ব আইনের আন্দোলনে মুখোর ছিলো, যারা মনে করে তাদের একমাত্র শত্রু কেবল হিন্দুত্ববাদীরা, তালেবান বা আল কায়দা ভারতীয় মুস লমানদের জন্য ভয়ের কারণ নয় তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। তালেবান প্রথমবার আফগানিস্থানে বিজয় লাভ করার পর হাত পা বেঁধে বেত মরেছিলো তাদের যারা টেলিভিশন দেখে, গান শোনে, পশ্চিমা পোশাক পরে, একইসঙ্গে নিজেকে মুস লিম জাতি বলে, অমুস লিমদের থেকে নিজেকে পৃথক মনে করে, তাদের প্রতি সাম্প্রদায়িকতা বজায় রাখে, আফগানিস্থানকে মুস লমানদের দেশ ভেবে গর্বিত হয় এমন মুস লমানদেরই প্রথম হাত পা বেঁধে পাছায় বেত মরা হয়। দানিশ সিদ্দিকি কি মনে মনে একটু হলেও ভাবিনি তালেবান তার পরিচয় পেলে অন্তত জানে মারবে না? সেকথা জানা আমাদের আর উপায় নেই। উপায় যেটা আছে সেটা হচ্ছে, ভারতে হিন্দুত্ববাদ নিশ্চিয় একটি মৌলবাদী বিপদ তাতে কোন সন্দেহ নেই, একইসঙ্গে ভারতীয় লিবারাল ও সেক্যুলারদের চিন্তার পরিবর্তন আনতে হবে, ইস লামী জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক যে বিপদ আছে ভারত তার বাইরে নয়। ইস লামী মৌলবাদীও ভারতের একটি বিপদের নাম। আমি ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে যখনই আলোচনা করতে গেছি তারা হা-হা করে উঠেছে এই বলে যে, ভারতে ইস লামী মৌলবাদ কখনোই আতংক নয়। এটা বাংলাদেশ পাকিস্তানের সমস্যা হলে হতে পারে… ইত্যাদি।

 

ভারতীয় মুস লমানদের গভীরভাবে ভাবতে হবে, ভারত আফগানিস্থান পাকিস্তানের মত হলে সেখানে তারা বসবাস করতে পারবে না। কাজেই সেক্যুলারিজমের শত্রু যারাই তারাই তাদের শত্রু। সেটা তালেবান হোক আর আরএসএস যে-ই হোক।

 

আগ্রহীরা মুনির কমিশন এখান থেকে পড়তে পারেন http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00islamlinks/txt_munirreport_1954/0707nonmuslims.html

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix