বিদ্যাসাগরের দুইশোতম জন্মবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ভাবনা

বিদ্যাসাগর একবার ‘ঈশ্বরের’ প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মাস্টার মহেন্দ্রনাথ গুপ্তকে বললেন, “ঈশ্বরকে ডাকবার আর কি দরকার? দেখ চেঙ্গিস খাঁ যখন লুটপাট আরম্ভ করলেন তখন অনেক লোককে বন্দি করলেন ক্রমে ক্রমে প্রায় এক লক্ষ বন্দি জমে গেল। তখন সেনাপতিরা এসে বললেন মহাশয় এদের খাওয়াবে কে? সঙ্গে এদের রাখলে আমাদের বিপদ। কি করা যায়? ছেড়ে দিলেও বিপদ। তখন চেঙ্গিস খাঁ বললেন, তাহলে কি করা যায়; ওদের সব বধ কর। তাই কচাকচ করে কাটাবার হুকুম হয়ে গেল। এই হত্যাকান্ড ঈশ্বর দেখলেন, কই একটু নিবারণ তো করলেন না। তা তিনি থাকেন থাকুন, আমার দরকার বোধ হচ্ছে না। আমার তো কোনও উপকার হল না”। (সূত্র শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত, ষষ্ঠ সংস্করণ)

মাস্টার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ওরফে শ্রীম হচ্ছেন রামকৃষ্ণকথামৃত বইয়ের লেখক ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের একজন অন্ধভক্ত। ভক্তের কাছে বিদ্যাসাগরের ঈশ্বর সম্পর্কে এই রকম বক্তব্য শুনে রামকৃষ্ণ ঈশ্বরের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, “ঈশ্বরের কার্য কি বুঝা যায়, তিনি কি উদ্দেশ্যে কি করেন? তিনি সৃষ্টি, পালন সংহার, সবই করেছেন আমরা কি বুঝতে পারি? আমি বলি, মা, আমার বোঝাবারও দরকার নেই, তোমার পাদপদ্মে ভক্তি দিও। মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য এই ভক্তিলাভ। আর মা সব জানেন। বাগানে আম খেতে এসেছি, কত গাছ, কত ডাল, কত কোটি পাতা –এসব বসে বসে হিসেব করবার আমার কি দরকার। আমি খাই, গাছ-পাতার হিসেবে আমার দরকার নেই”। (সূত্র শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত, ষষ্ঠ সংস্করণ)

কি হাস্যকর যুক্তি! আজো এই যুক্তিই জারি আছে। এভাবেই ভক্তরা তাদের ঈশ্বরের পক্ষে নিজের বিবেককে ঠাকাচ্ছে। মসজিদের ভেতর আরবী পড়তে গিয়ে শিশুটি যখন ধর্ষণের শিকার হয় তখন আল্লাহ কেন শিশুটিকে বাঁচায় না? তারপরও আল্লাহ যদি থেকেই থাকে তাতে মানুষের কি আসে যায়? কোন কাজে তো লাগছে না…। বিদ্যাসাগর এভাবেই তার সময়কে চাবুক মেরেছিলেন। তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে, দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে বলতেন, এসব শাস্ত্র ফাস্ত্র ধর্ম শিক্ষা করে কোন ফয়দা হবে না, বেশি করে আধুনিক দর্শন পড়তে হবে। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে শিক্ষিত হতে হবে…। দুর্ভিক্ষের সময় বিদ্যাসাগর একবার মন্তব্য করেছিলেন, এত মানুষ না খেয়ে মরছে, কই ঈশ্বর এসে এখন মানুষকে খাওয়ায় না?

কথামৃতের লেখক শ্রীমের মাধ্যমে জানতে পারি বিদ্যাসাগরের বসার ঘরে রাখা পাত্রে গরীব অসহায় মানুষ তাদের অভাব অনটনের কথা কাগজে লিখে যেতেন। কথামৃতে শ্রীম সেসব কাগজের কিছু টুকরোর কথা জানাচ্ছেন, “টেবিলের উপর যে পত্রগুলি রহিয়াছে – তাহাতে কি লেখা রহিয়াছে? কোন বিধবা হয়ত লিখিয়াছে আমার অপগোন্ড শিশু অনাথ, দেখিবার কেহ নাই, আপনাকে দেখিতে হবে। কেহ লিখিয়াছেন আপনি খরমাতায় চলিয়া গিয়াছেন তাই আমরা মাসোহার ঠিক মত পাই নাই, বড় কষ্ট হইয়াছে। কোন গরীব লিখিয়াছে, আপনার স্কুলে ফ্রী ভর্তি হইয়াছি, কিন্তু আমার বই কিনিবার পয়সা নাই। কেহ লিখিয়াছেন আমার পরিবারবর্গ খেতে পারছেন না – আমাকে একটা চাকরি করিয়া দিতে হবে।

বিদ্যাসাগর অকাতরে দান করতেন। নীতিবান সৎ আদর্শবাদী কাকে বলে এরকম দ্বিতীয় নজির বোধহয় আর পৃথিবীতে নেই। বিদ্যাসাগরের নিজ গ্রামে বিধবা বিবাহের একটা আয়োজন হয়েছিলো। বিদ্যাসাগর নিজে সেখানে উপস্থিত হয়ে বিয়ে দিবেন কথা ছিলো। কিন্তু বিয়েটা আর সম্ভব হয়নি। বিদ্যাসাগর রাগে ক্ষোভে নিজ গ্রামে মৃত্যু অবধি আর যাননি। আদর্শচ্যুত পুত্রকে ত্যাজ্য করেছিলেন। নিজের প্রিয় শিক্ষক দ্বিতীয় বিবাহ করায় তার মুখ আর দর্শন করেননি। বহু লোক প্রতারণা করে তার কাছ থেকে অর্থ আদায় করত শুধু এই একটি বিষয়ে তাঁর কোন চৈতন্য হত না, মানুষের উপর তিনি বিশ্বাস হারাতেন না।

বিদ্যাসাগরের জন্মের দুইশো বছর হলো আজ। ১৯৯১ সালে বিদ্যাসাগরের মৃত্যু শতবার্ষিকীতে হায়াৎ মামুদ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘কি দুঃখ, কি লজ্জা যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যু শতবার্ষিকীর দিনটি প্রায় অলক্ষ্যে এসে চলে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গসাহিত্যের অধ্যাপক কেন্দ্রিক একটি সারস্বত গোষ্ঠীর ঘরোয়া আলোচনাসভা এবং একটি দৈনিক ‘সংবাদ’-এর মেয়েদের পাতায় ও ড. আনিসুজ্জমানের একটি রচনাতে ছাড়া তাঁকে আর কেউ আর কোথাও স্মরণ করেছেন বলে আমার জানা নেই ।”

দুইশোতম জন্মবার্ষিকীতেও বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য একাডেমি সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। বিদ্যাসাগরকে অস্বীকার করার একটা চেষ্টা তো অবশ্যই আছে। কারণ ‘বাঙালী মুসলমান’ এই জাতি সত্ত্বা বা কাঁঠালের আমসত্ত্ব তৈরির আবুল ফজল টু আহমদ ছফা যে ফ্যাক্টরি করছিলেন সেখানে আজ জোয়ারে বান ডেকেছে। বাংলা ভাষা এখন হিন্দুদের থেকে আলাদা করে মুসলমানী হয়ে উঠতে হবে। সেদিন ভিডিও দেখলাম সলিমুল্লাহ খান বলছে, নজরুল ইসলামের আগে কেউ সাহস করে কবিতায় বাঙালী মুসলমানের নামাজ রোজা শব্দগুলি ব্যবহার করতে পারেনি…। নামাজ রোজা শব্দগুলি পার্সি। এই শব্দগুলি যথাক্রমে প্রার্থনা ও উপোস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থ্যাৎ আরবীতে সালাত ও সওম শব্দগুলো পারস্যবাসী নিজেদের আগে থেকে ব্যবহার করা নামাজ ও রোজায় রূপান্তর করেছে। সলিমুল্লাহ খান সেই শব্দগুলোকে নিজেদের শব্দ বলে বাংলায় ব্যবহার চালু করে বাঙালী মুসলমানের নিজস্বতার সাক্ষর বুঝাচ্ছেন। এমন একটা জাতি পারস্যরা যারা মুসলমান হলেও তাদের নিজেদের ভাষাতেও সালাত সওমকে অনুবাদ করে নিয়েছে। তারা না হয় গর্ব করতে পারে নিজেদের নিজস্বতা নিয়ে। বাঙালী মুসলমান পানি নামাজ রোজা নানী চাচা শব্দগুলোকে নিজেদের আত্মপরিচয় বলেন কি করে? আরবীতে নিজেদের নামকরণই কি করে নিজেদের নিজস্বতা হয়? ‘আলহামুদুল্লাহ’ কি করে ‘কেমন আছেন’ এর জবাব হয়?

আশির দশকে ‘বিদ্যাসাগর সোসাইটি অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন চালু হয় বাংলাদেশে। উদ্দেশ্য বিদ্যাসাগরের রচনা ও তার অবদান বিষয়ে চর্চা ও প্রকাশ। এই সংগঠনটিকে খুব দ্রুত ‘ভারতের স্পাই’ হিসেবে চিহিৃত করা হয়! পশ্চিমবঙ্গের কবি মলয় রায়চৌধুরী মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক মিজানুর রহমানের রেফারেন্সে জানাচ্ছেন বিদ্যাসাগর সোসাইটি সদস্যদের ফোনে হুমকি ধামকি দিয়ে ভয় ভীতি দেখিয়ে নিবৃত করা হয়। (সূত্র: মলয় রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ, ঈশ্বরচন্দ্রের পাকিস্তানিফিকেশন, প্রকাশকাল এপ্রিল ২৯, ২০১৮) ।

বিদ্যাসাগর নিয়ে ‘বাঙালী মুসলমানদের’ অভিযোগ, বিদ্যাসাগর মুসলমানদের জন্য কিছু করেননি কিছু লিখেননি। মলয় রায়চৌধুরী বলেন ‘আমি মুসলমান পাড়ায় বসবাস করে, মুসলমান প্রতিবেশির বাড়িতে অহরহ যাওয়া-আসার মাধ্যমে যে জীবনধারা সম্পূর্ণ জানতে পারিনি, তা কেমন করেই বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জানবেন, যিনি মুসলমানদের সমাজে বসবাস করেননি, কেবল বীরসিংহ গ্রামের মুসলমান চাষিদের দেখে থাকবেন। পাঁচ বছর বয়সে তিনি পাঠশালায় ভর্তি হন, এবং আমি নিশ্চিত যে তাঁর কোনো মুসলমান সহপাঠী ছিল না। তাঁর সময়ে কলকাতায় যে বৈভবশালী মুসলমানরা থাকতেন তাঁরা প্রায় সকলেই উর্দুভাষী’ (মলয় রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ, ঈশ্বরচন্দ্রের পাকিস্তানিফিকেশন, প্রকাশকাল এপ্রিল ২৯, ২০১৮) ।

এরকম যুক্তি তো বেগম রোকেয়া প্রসঙ্গে বলা চলে কেন তিনি কেবল মুসলিম নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছিলেন? তখনো তো পূর্ববঙ্গের হিন্দু নারীরা কঠিন শাস্ত্রীয় শাসনে নির্যাতিত হচ্ছিল। ছফা নিজে হিন্দু সমাজ নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন? কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে কেন হুমায়ূন আহমদ হিন্দু সমাজ নিয়ে উপন্যাস লিখেনি? তাহলে কেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে এরকম প্রশ্ন উঠে?

বিদ্যাসাগরকে অস্বীকার করে বাঙালী মুসলমান কেবলই নিজের বাপ দাদাকেই অস্বীকার করেছে। বিদ্যাসাগর ভাবিকালের মহানায়ক হবেন। প্রগতি আর রেঁনেসার জন্য বিদ্যাসাগরের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া বাঙালীর মুক্তি নেই। সে হিন্দুই হোক আর মুসলমান…।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix