বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত: সমকালীন ও ঐতিহাসিক বিবেচনা

আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আশংকা করছি বাংলাদেশে একদিন একটি হিন্দুও অবশিষ্ঠ থাকবে না। এই না থাকার পেছনে দায়ী লোকগুলো কারা জানেন? না, মামুনুল হকরা নয়। যারা এই পোস্ট পড়ার পর আমাকে ‘হিন্দুমহাসভা’ ট্যাগ দিবে, ‘বিজেপি আরএসএসের এজেন্ট’ বলবে দায়ী সেই সব পোগতিশীল ভদ্রলোকরা! সুনামগঞ্জের শাল্লার হিন্দু গ্রামে হামলায় আওয়ামী লীগের নেতারা জড়িত ছিলো এটি প্রকাশিত হয়েছে। হিন্দুরা হামলা আঁচ করতে পেরে পুরো গ্রাম খালি করে আত্মগোপনে ছিলো। বলতে গেলে বিনা বাঁধায় গণিমতের মাল লুট করা গেছে। হিন্দুরা এদেশে আওয়ামী লীগকে ‘রাম’ ও বিএনপিকে ‘রাবণ’ মনে করে ভোট দেয়। কিন্তু রাম রাবণ উভয়ের হাতেই লাঞ্ছিত লুন্ঠিত হয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গে পালায়।

পশ্চিমবঙ্গের এমন কিছু মুসলিম মহল্লা আছে যেখানে হিন্দুরা গিয়ে মার খেয়ে ফিরে আসবে! মানে সেখানে কেউ ‘নাসিরনগর’ কিংবা ‘শাল্লার’ মত হামলা চালাতে গেলে উল্টো পিটিয়ে তাদের বৃন্দাবন দেখিয়ে দেয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু ওয়াজ আমি শুনেছি যেখানে হিন্দু ধর্ম নিয়ে কুরুচি জঘন্ন মন্তব্য করে বক্তব্য রাখা হচ্ছে। ভারতে ‘গজওয়াতুল হিন্দ’ হবে যেখানে মুসলমানরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে- এরকম ওয়াজ মাইকে পশ্চিমবঙ্গে করা যায়। আমার কথা বিশ্বাস না করলে ইউটিউবে সার্চ করে দেখতে পারেন। সুনামগঞ্জের শাল্লার একটি গ্রামে হিন্দুদের উপর লাঠি সোডা নিয়ে হামলা চালিয়ে যে হিন্দু পরিবারগুলোর উপর হামলা হয়েছে এই পরিবারগুলো বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে নিশ্চিত করেই ভাববে। যাদের অবস্থা ভালো তারা সব বেচেবুচে ভারতে চলে যাবে। এখানেই ঐতিহাসিক ভুল ত্রুটির একটি হিসেব সামনে চলে আসে। মনে করেন শরত বসুর অখন্ড বাংলা টিকে যেত তাহলে মামুনুল হকদের দাবড়ানি খেয়ে এইসব মানুষগুলি কোথায় যেত?

পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার কওমি মাদ্রাসাগুলোও তো তখন হেফাজত ইসলামের নেতৃত্বেই থাকত। ফুরফুরা শরীফের আব্বাস ভাইজানের তখন কি ঠেকা সেক্যুলার পার্টি খোলার? যারা সাঈদীর মুক্তি চায়, রাজাকার আল বদরদের বিচারের বিরোধীতা করে, ফ্রান্স প্রেসিডেন্টের ছবিতে জুতা মারে তারা পশ্চিম বাংলায় হিন্দুদের জন্য নিরাপদ এমনটি ভাবার মত বাস্তবতা সেই অখন্ড বাংলায় থাকত কি? তাহলে ‘পূর্ববঙ্গ’ থেকে কিংবা ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে দাবড়ানি খেয়ে পালানো বাঙালী হিন্দু হত বিহারীদের মত দেশহীন? ভারতের অবাঙ্গালী রাজ্যে তারা আশ্রয় নিতে বাধ্য হত।

দেখুন, তসলিমা নাসরিন তার ইউরোপের সিটিজেনশীপ থাকার পরও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকতে চেয়েছে কারণ তিনি বাংলা দেশে বাংলা ভাষার আবহে থাকতে চেয়েছেন। সেই তসলিমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে আব্বাস ভাইজানদের দাপটের কারণেই। কোলকাতার বেকার হোস্টেলের বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙ্গতে যারা হোস্টেল ঘেরাও করতে পারে, তারা অখন্ড বৃহত বাংলায় কি করতে পারত না ভাবুন? এমনিতে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থিদের ইসলামী মৌলবাদ তোষণ, অপরদিকে হিন্দুদের জাতিভেদ, পক্ষান্তরে মুসলিমদের ধর্মীয়ভাবে একটি ‘উম্মাহ’ আবেগ ও চেতনার বিপরীতে হিন্দুরা কিছুতে জিহাদী তেজের সঙ্গে পারত না। ভাষানী, আহমদ ছফারা হিন্দুরা পিটানি খেয়ে পশ্চিমবঙ্গে পালালে কি চোখের পানি ফেলত? ফেললেই বা কি ছাতার মাথা হত? আমরাও তো আহা উঁহু করছি। তাতে হিন্দুদের আস্থার জায়গায় কি কোন ভিত্তি গড়ে উঠবে? বাংলাদেশে যারা পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরাকে বাংলাদেশের পাওনা বলে হুংকার দেন তারা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আমল- কোন আমলেই শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিলের গ্যারান্টি দিয়েছিলো? তারা কি যোগেন মন্ডলের ভারতে পালানো রুখতে পেরেছিলো, না ইচ্ছে হয়েছিলো তাদের? তারা কি আদমজিতে তফসিলি হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ম্যাসাকার রুখতে পেরেছিলো? বেচারা যোগেন মন্ডল পাকিস্তানের মন্ত্রী ছিলেন, তিনি হামলা স্থান পরিদর্শন করে বলেছিলেন, ‘আমার পক্ষে এটা বলা অন্যায্য নয় যে পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ‘নিজভূমে পরবাসী’ করা হয়েছে, আর এটাই এখন হিন্দুদের কাছে পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র। হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করাটাই এদের একমাত্র অপরাধ।…সুদীর্ঘ ও উদ্বেগময় সংগ্রামের পর শেষ পর্যন্ত আমাকে একথাই বলতে হচ্ছে যে পাকিস্তান আর হিন্দুদের বাসযোগ্য নয়। তাঁদের ভবিষ্যতে প্রাণনাশ ও ধর্মান্তরকরণের কালো ছায়া ঘনিয়ে আসছে। অধিকাংশ উচ্চবর্ণের হিন্দু ও রাজনৈতিক সচেতন তফসিলি জাতির লোকেরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে গেছে। যে সমস্ত হিন্দুরা এই অভিশপ্ত দেশে অর্থাৎ পাকিস্তানে থেকে যাবে, আমার দৃঢ বিশ্বাস ধীরে ধীরে এবং সুপরিকল্পিত ভাবে তাদের মুসলমানে পরিণত করা হবে বা নিশ্চিহ্ন করা হবে’ (মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, জগদীশ মণ্ডল, ১ম খন্ড)।

অথচ ভদ্রলোক পাকিস্তানে তার সম্প্রদায়কে যো্গ দেয়ার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘হিন্দুদের আওতায় থাকিয়া ঘৃণিত জীবন যাপন করার চেয়ে মুসলমান অথবা অন্য কোন জাতির আওতায় স্বাধীন ও সম্মানের সহিত বাস করিতে তফসিলি জাতি বেশী পছন্দ করে’।

‘শ্যামপ্রসাদ বাঙালী হিন্দুদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন’, কিংবা ‘পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরা না পেলে আমার বাংলাদেশ পূর্ণ হবে না’ -দুপারের এই দুটি রাজনৈতিক বক্তব্য আমার লেখা দিয়ে প্রতিষ্ঠা বা তর্ক করতে আসবেন না প্লিজ। আমি মর্মাহত সুনামগঞ্জের শাল্লার ঘটনায়। দেশভাগের জন্য জয়া চ্যাটার্জি হিন্দু নেতাদের দায়ী করেছিলেন, সেটা নিয়ে ছফা সলিমুল্লাহদের নাচ থামতেই চায় না। কিন্তু এতগুলো বছরে এদেশ থেকে নিরবে নিভৃতিতে হিন্দুদের দেশত্যাগের বিষয়ে তারা কেউ কিছু করতে পারেননি। তারা কি বলতে পারেন ঐতিহাসিক কোন ঘটনাপঞ্জি না ঘটলে এদেশে হিন্দুরা মুসলমানদের মতই সমান নাগরিক সু্‌বিধা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারত?

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix