বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দৈন্যতার কারণ কি?

হিন্দু ধর্মটাকে আসলে টিকিয়ে রেখেছিল অশিক্ষিত ব্রাহ্মণ ও তথাকথিত “ছোট জাতের” হিন্দুরা। শিক্ষিত ব্রাহ্মণ হিন্দুরা তো হিন্দু ধর্ম বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল। কেশবচন্দ্র দেবেন্দ্রনাথ বামুন ছিলেন। “ব্রাহ্ম সমাজ” বামুনদের হাতেই তৈরী। সেকালের ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিল শিক্ষিত ব্রাহ্মণ হিন্দুরা। শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ইংরেজ আমলে খ্রিস্টান হয়েও হিন্দু ধর্ম থেকে বেরিয়ে যেত। আর নাস্তিকদের তো অভাব ছিলো না।

 

ভারতবর্ষে যদি শিক্ষিত হিন্দুদের সংখ্যা বেশি হত তাহলে হিন্দু ধর্ম এতদিনে টিকত না। ধর্মকর্মের ঝোঁক অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে বেশি থাকে। হিন্দুদের “ছোট জাতের” মধ্যেই সাংঘাতিক জাত্যাভিমান এখনো দেখা যায়। বলছি না পৈতে পরা বামুনরা সব যুক্তিবাদী হয়ে গেছে। তবে সংখ্যায় বিপুল কথিত শুদ্রদের মধ্যে এখনো যত নিয়ম পালন আর হিন্দুত্বের ধোঁয়া বেশি দেখা যায়। অথচ হিন্দুত্ববাদী নেতারা দলিত ছোট জাতের হিন্দুদের উপর তাদের দমনপীড়ন দিয়ে তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। এরা যদি একযোগে ধর্মত্যাগী হয় তো হিন্দুত্ববাদীদের কলা বেচে খেতে হবে। এদের “দলিত ছোটজাত” করে রাখলে চরম মূল্য দিতে হবে একদিন…।

 

বাংলাদেশের কথা বলি। “ব্রাহ্মণ্যবাদী” বলে একটা কথা আছে এটার কারণেই নাকি মুসলিম লীগের জন্ম আর দেশভাগ। তিতুমীরের জেহাদী বাঁশের কেল্লা নাকি ইংরেজ আর ব্রাক্ষণ্যবাদীদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েত বিপ্লব ছিলো। দেশভাগের সময়ও এই বিবেচনায় তফসিলি বলতে হিন্দুদের কথিত ছোট জাতের মানুষজন ভারতে না গিয়ে পাকিস্তানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদের নেতা যোগেন মন্ডল পরিস্কার বলেছিলেন, বামুনদের শাসনে না থেকে মুসলমানদের অধীনে থাকা হবে আমাদের জন্য মঙ্গলজনক। সেই তফসিলিদের মরতে হয়েছিল ১৯৫০ সালে পথেঘাটে। আর যোগের মন্ডল প্রাণ হাতে ভারত পালিয়ে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু হওয়াটা একটা অন্যায় …। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা সফল হলে ঠিক একই অবস্থা হত। হিন্দু কৃষকরা তফসিলিদের মত ভিটেহারা হত। আসল সত্য বললে পরিবেশটা আর শান্ত থাকবে না। দেশভাগের আগে  যতদিন বামুনরা ছিলো সংস্কৃতি শিক্ষার বিকাশে হয়েছিল। ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছেন, ইংরেজ আমলে ধনী জমিদার হিন্দুরা নিজেদের বাবা মার নামে স্কুল খুলেছিলেন বলেই বাঙালী মুসলমানদের প্রথম শিক্ষিত জেনারেশন তৈরি হতে পেরেছিল। পুরোনো যত স্কুল কলেজ সংস্কৃতি কেন্দ্র সবই তাদের করা। পুজা ফুজার উপলক্ষে সংস্কৃতি অনুষ্ঠান ছিলো সংস্কৃতি বিকাশের বিশেষ উপলক্ষ। সাহিত্যের শারদীয় পুজা সংখ্যা একটা উদাহরণ হতে পারে।  এখনো বাংলাদেশে দুর্গা পুজা করা হয়। তবে সেটা মদ খাওয়ার জন্য। কারণ দেশভাগের সময় বামুনরা সব চলে গেছে। বলছি না পুজায় বামুনরা মদ খায় না। কথাটা সরলীকৃত করবেন না। আমার কথাগুলি মিলিয়ে নিবেন ঠান্ডা মাথায়।

 

অপরদিকে মুসলমান শিক্ষিত হোক আর আর্ট কালচার করুক, সে আসলে মুসলমানই। যে কারণে তাদের মধ্যে কেশবচন্দ্র দেবেন্দ্রনাথের মত কেউ জন্মায়নি। মুসলিমদের কিন্তু হিন্দুদের মত বড় জাত ও ছোট জাত ছিলো। “আশরাফ মুসলমান” হচ্ছে বড় জাতের মুসলমান। “আতরাফ” হচ্ছে ছোট জাতের মুসলমান। বামুনদের মত কিন্তু আশরাফরা সংস্কার করেনি। আশরাফ মুসলমানরা শিক্ষিত ধনী ছিলো। তারাই “মুসলিম লীগ” বানিয়েছে। আর বামুনরা হয়েছে বামপন্থী। না হয় স্বদেশী আন্দোলন করেছে। আশরাফ মুসলমানরা করেছে “খিলাফত আন্দোলন”। মুসলমান তাই আশরাফ হোক আর আতরাফ,  মৌলবাদী হোক বা উদার, সে আসলে আরবী উপনিবেশ চালায় কখনো সচেতনে কখনো অবচেতনে। এই কারণে বাংলাদেশের অবকাঠামো আর অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও চেহারায় দেশটা অশিক্ষিত সংস্কৃতিহীন…।

 

এই লেখা দিয়ে আমি আসলে কি বুঝালাম? হিন্দুরা চলে যাওয়ায় আমাদের খুব ক্ষতি হয়েছে?  কারেক্ট! যদি আপনি ছায়ানট উদিচির মত সংগঠকদের দিকে দেখেন দেখবেন এগুলো কাদের মাথা থেকে এসেছিল। বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা সাংস্কৃতিক দৈন্যতা। দেশভাগের পর থেকে এই অপুষ্টির সূচনা। এখানে রোজার পুরো একমাস সাংস্কৃতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। “বাঙালী সংস্কৃতি মৌলবাদীরা”ও তখন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের চর্চা শুরু করে। দেশভাগ না হলে ঐ যাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী বলেন তাদের একটা শক্তিশালী সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থান থাকত যে কারণে একটা সাংস্কৃতিক জাগরণ ধরে রাখতে পারত তাতে চরমোনাই হেফাজত কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত…। আমি কি মিথ্যে কিছু বললাম?

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix