রবীন্দ্রনাথ ‘লেখা চোর’ “অত্যাচারি জমিদার’ কুত্সার জবাবে

রবীন্দ্রনাথকে গান চোর, লেখা চোর বলে আমার দেশ পত্রিকার কুখ্যাত মাহমুদুর রহমান পোস্ট দিয়েছেন কাদের লেখা টুকে জানেন? ডক্টর আহমদ শরীফ, নিরোদ সি চৌধুরী ও ফরহাদ মজহারের লেখা থেকে। আর গুগল যদি করে থাকে তাহলে মুক্তমনা ব্লগে অভিজিত্ রায় ও ফরিদ আহমেদের লেখা খুবই নিন্মমানে তথ্য প্রমাণহীন একটা লেখা থেকেও টুকে নিতে পারে। মানে দেখুন, ফরহাদ মজহার বাদে বাকীদের মাহমুদুর রহমানের বিপরীত মেরুর লোকজন। কিন্তু রবীন্দ্র বিদ্বেষে তারা একই নৌকার মাঝি! বিদ্বেষ কেন বললাম? কারণ ডক্টর আহমদ শরীফও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জীবনে যত বাজে কথা লিখেছিলেন তার সবগুলোরই কোন প্রমাণ ছিলো না। তিনি তার কমিউনিস্ট বিশ্বাস থেকে রবীন্দ্রনাথকে অপছন্দ করতেন। আহমদ শরীফ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাংলা একাডেমির ‘উত্তরারাধীকার’ পত্রিকায়  তাঁকে অত্যাচারী জমিদার বলে যে দাবী করেছিলেন তার প্রমাণ হাজির করতে হায়ত মামুদ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হুমাযুন আজাদ চাপ দিলে তিনি কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। আর নিরোদ সি চৌধুরীকে সমস্ত রবীন্দ্র গবেষকরাই ভিত্তিহীন বলে বাতিল করেছেন। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার ছিলো অভিজিত ও ফরিদ আহমেদের যৌথভাবে লিখিত রবীন্দ্রনাথের উপর ভাসা ভাসা জ্ঞান, অন্যের রচনা থেকে কোট করে রবীন্দ্রনাথকে ‘চোর’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা।

 

ফরিদ আহমেদের মুসলিম প্রীতি, নাস্তিকদের লেখাকেই তাদের উপর হত্যাযজ্ঞের জন্য দা্য়ী করার মধ্য দিয়ে তার মানসিকতা ধরা পড়েছিলো। বলাই বাহুল্য রবীন্দ্র সাহিত্যের যে বিশাল জগত এদের কেউ সেটা পড়েননি। এটা বেশ দীর্ঘ জীবন ধরে রবীন্দ্র গবেষণার বিষয়। সেরকম কোন চেষ্টা অভিজিত কিংবা ফরিদ মিয়ার ছিলো না। এমনকি আহমদ শরীফ বা ফরহাদ মজহার তাদের কারুরই ছিলো না। রবীন্দ্রনাথকে একটা ফেইসুক পোস্ট কিংবা ব্লগ পোস্টে কুপোকাত করতে হলে তাঁর সমস্ত লেখা, তাঁর সমস্ত চিঠি, তাঁর সময়কালের সংবাদপত্র, ভাষণ ইত্যাদি তন্ন তন্ন করে পড়তে হবে। সেসব পান্ডিত্য ও পরিশ্রম মাহমুদুর রহমান যাদের লেখা থেকে টুকে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাদের কারোর ছিলো না। ছিলো না এত দৃঢ়ভাবে বলে ফেললাম কারণ রবীন্দ্রনাথের উপর এ পর্যন্ত লেখা চুরি, ‘অত্যাচারিত জমিদার’ এরকম অভিযোগের উপর কোন প্রমাণ কোন পন্ডিতই প্রমাণ করতে পারেননি।

 

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মুক্তমনার সেই লেখায় বিপ্লব পাল ও কুলদা রায় তথ্য প্রমাণ দিয়ে অভিজিত ও ফরিদকে চেপে ধরলে তারা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা হয়েছিলো। এর কারণ ছিলো, অভিজিত বিজ্ঞান নিয়ে লিখতে তার যে পড়াশোনা অধ্যাবসা সেরকম চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ছিলো না। আবু সাঈদ আইয়ুব কিংবা শঙ্খ ঘোষের মত রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞদের লেখা বইও পড়া দরকার ছিলো। ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ আবু সাঈদ আইয়ুবের এই বইয়ের নামও যে জীবনে শুনেনি সেও এখন অন্যকে ‘রবীন্দ্র মৌলবাদী’ বলে ট্রল করছে! রবীন্দ্র মৌলবাদীরা কেমন হয় তাদের অভিজ্ঞতা আছে কি? রবীন্দ্র অনুরাগীদেরই মৌলবাদ বলছেন তো? তাহলে আবু সাঈদ আইয়ুবকে নিয়েই শুরু করুন। তাকে কি রবীন্দ্র মৌলবাদী বলব? ঠিক কারা রবীন্দ্র মৌলবাদী? এই মৌলবাদীদের বিপরীতে যারা রবীন্দ্র সমালোচনার নামে রবীন্দ্রনাথকে গান চোর বলছে সেইসব ‘লিবারালদের’ মিথ্যার পিছনে পাছা দিয়ে পাহাড় ঠেলাটা কি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বিরাট উদারত?

 

রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে তাকে নিয়ে বাংলাদেশে কুত্সা হবে না সেটা ঘটলে বুঝতে হবে বাঙালী মুসলমানের ডিএনএ বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেরকম কিছু কুত্সার সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে লেখাটা শেষ করি। প্রথম অভিযোগ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গগন হরকার সুর রবীন্দ্রনাখ চুরি করে নিজের নামে চালিয়েছেন। গগন হরকার বলতে যে বাংলাদেশের অঁজ পাড়াগায়ের একজন বাউল আছেন একথা তো কোলকাতার শিক্ষিত সমাজ রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই জেনেছেন! আমার সোনার বাংলা গানে তিনি যে বাউল সংগীতের সুর ব্যবহার করেছেন সেটা রবীন্দ্রনাথ সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি কি লালন ফকিরকে শিক্ষিত সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এই রবীন্দ্রনাথ। তিনি বাউল অনুরাগী ছিলেন। হাসন রাজার উল্লেখ করে তিনি বিভিন্ন ভাষনে তার গান কোট করিয়ে শুনিয়েছেন। বাউল সংগীতের প্রতি তার প্রবল অনুরাগ চিরকালই ছিলো। তার ‘ফুলে ফুলে ঢুলে ঢুলে’ গানটি যে আইরিশ ফোক গানের সুর থেকে করা সেটা রবীন্দ্রনাথের কল্যাণে তখনই মানুষ জানত। তার ছাত্ররা যারা গান শিখত সকলেই জানত। ভারতীয় বিভিন্ন সংগীতকে ভেঙ্গে নিজের মত করে বাংলাভাষীদের উচ্চতর সংগীত শোনার ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। কখনোই বলেননি সেগুলো তারই করা সুর। রবীন্দ্রনাথের উপর লেখা হাজার হাজার বইগুলোতে এসব বিস্তারিতভাবে লেথা আছে। অথচ এখনকার ‘রবীন্দ্র গবেষকরা’ এগুলোকে চুরি বলছেন! সংগীতে, কবিতায়, নাটকে প্রভাবিত হয়ে নতুন সৃষ্টি করা একটি রেওয়াজ। শেক্সপিয়রের সমস্ত নাটক বিভিন্ন প্রচলিত গল্প থেকে। জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি লিখেছিলেন মার্কিন কবি এডগার অ্যালেন পো লিখিত ‘টু হেলেন’ কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ কবিতাটি ইংরেজ কবি ইয়েটস লিখিত ‘দা কার্লিউ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা। এগুলো কি কেউ চুরি বলে? কেউ খোঁজ করে জীবনানন্দ বিদেশী কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত স্বীকার করে গিয়েছিলেন কিনা? বরং মানুষ দেখে জীবনানন্দ দাশ সেই কবিদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তার কবিতায়। তাহলে রবীন্দ্রনাথকে ‘চোর’ ‘রাহাজানি চালানো’ বলা হয় কেন?

 

কারণ তিনি রবীন্দ্রনাথ। বাংলা ভাষা আর তিনি এক হয়ে উঠেছেন। তাকে বাদ দিতে না পারলে কোনদিনই ‘বাঙালী মুসলমান’ নামের কাঁঠালের আমসত্ত্ব তৈরি হবে না। তাকে বাদ দিয়ে বাঙালী মুসলমান শেকড়হীন মুসলমান ছাড়া আর কিছু নয়। আবার বামপন্থিদের গোর্কি লেলিন মাও ইত্যাদিকে সরিয়ে রবীন্দ্রনাথকে স্থান করে দিতে গেলে ‘কমিউনিস্ট কওম’ তৈরি হবে কিনা সেটা নিয়ে বামপন্থিরা দ্বিধান্বিত ছিলো সব সময়। তাই তার ভারতবর্ষে যতবার বিপ্লব জানান দিতে গেছে ততবার বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথের মূর্তি তাদের ভাঙ্গতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে ‘অত্যাচারি জমিদার’ বিদ্যাসাগরকে ‘ইংরেজ প্রেমিক’ তকমা দিতে চেয়েছে। রবীন্ত্রনাথের কুষ্টিয়া, শিলাইদহ, শাহজাদপুরে মুসলমান প্রজাই ছিলো ৯০ ভাগ। সেই প্রজাদের জন্য তিনি কৃষি ব্যাংক তৈরি করলেন। নোবেল প্রাইজের টাকা উড়ালেন জনকল্যানে। কৃষিকাজে বিপ্লব করতে ছেলেকে ইংলেন্ড পাঠালেন কৃষির উপর পড়তে। কেন? পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজাদের উপকার করতেই তো? অথচ তিনি পুরস্কার পেলেন ‘অত্যাচারী জমিদার’ হিসেবে!

 

আগ্রহী পাঠকদের জীবনানন্দের ইংরেজি কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা বিখ্যাত দুটি কবিতা তুলে দিলাম। অনুপ্রাণিত হয়ে জীবনানন্দ যা সৃষ্টি করলেন তা ছাপিয়ে গেলো অগ্রজ দুই বিদেশী কবিকে।

 

The Curlew

O CURLEW, cry no more in the air,
Or only to the water in the West;
Because your crying brings to my mind
passion-dimmed eyes and long heavy hair
That was shaken out over my breast:
There is enough evil in the crying of wind.

বাংলায়:

হে চাতক

হে চাতক, তুমি আর কেঁদো না বাতাসে,
অথবা শুধু পশ্চিম সাগরের জলের বিস্তারে;
কারণ তোমার কান্না আমার হৃদয়ে নিয়ে আসে
ভাবাবেগে ¤øান তার চোখ আর দীর্ঘ কেশভারে
ঘেরা মুখ, যার ছোঁয়া পেয়েছিলো আমার এ বুক।
বাতাসের কান্নাতেই এমনিতে যথেষ্ট অসুখ।

(বাংলা অনুবাদ: জ্যোতির্ময় নন্দি)

জীবনানন্দ দাশের ‘হায় চিল’ কবিতাটি:

হায় চিল

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো ? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

 

TO HELEN

Helen, thy beauty is to me
Like those Nicéan barks of yore,
That gently, o’er a perfumed sea,
The weary, way-worn wanderer bore
To his own native shore.

On desperate seas long wont to roam,
Thy hyacinth hair, thy classic face,
Thy Naiad airs have brought me home
To the glory that was Greece,
And the grandeur that was Rome.

Lo! in yon brilliant window-niche
How statue-like I see thee stand,
The agate lamp within thy hand!
Ah, Psyche, from the regions which
Are Holy-Land!

বাংলা অনুবাদে–

হেলেনকে

হেলেন, আমার চোখে সৌন্দর্য তোমার
সেই কবেকার নিসীয়* বল্কলের মতো,
ক্লান্ত, পথশ্রান্ত পরিব্রাজক ধীরে ধীরে সুরভিত
সাগরের পথে নিয়ে আসে যারে স্বদেশে তাহার।

কতদিন আহা ঘুরছি উত্তাল সাগরে সাগরে
তোমার শ্যওলা চুল, তোমার ধ্রæপদী মুখ,
জলপরী রূপ ডেকে আনে গ্রিসের গৌরবে,
রোমের মহিমায় আমাকে নিজ ঘরে।

ওই তো দূরে আলোকোজ্জ্বল জানলার ধারে
মর্মরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি
রতœদীপ হাতে যেন দেবী কোনো স্বর্গভূমি
হতে নেমে এলে এই পৃথিবীর পারে।

(বাংলা অনুবাদ: জ্যোতির্ময় নন্দি)

 

বনলতা সেন

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে– সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix