বরবাদ মজহারের একদিন

বরবাদ মজহার মোবাইলে ভিডিও দেখছিল। আফগানিস্থানের কৌতুক অভিনেতা ফজলকে আটক করে তালেবান মুজাহিদদের দুজন গাড়িতে উঠে বসেছে। কথায় কথায় ফজলকে থাপ্পর মরছিলো মুজাহিদটি। বরবাদ দেখে মিটিমিটি হাসছিলো। এমন সময় একজন ফোন করল তাকে। বরবাদ বিরক্ত হয়ে ফোনটা ধরে বলল, হ্যালা…

 

ওপাশ থেকে একজন বলল, বরবাদ ভাই, আপনি একইসঙ্গে লালন ও তালেবানের সমর্থক, বাহ্, ভালোই!

 

বরবাদ মজহার আফগানিস্থান থেকে মার্কিন বাহিনী চলে যাবার পর তালেবানের উত্থানে তার উচ্ছ্বাস, শীত্কার আর লুঙ্গি ড্যান্স ফেইসবুক পোস্টগুলোতে গোপন থাকেনি। সত্যি কথা বলতে গেলে, বরবাদ অবাক হয়ে দেখেছে, যাদেরকে সে সেক্যুলার বলে শত্রু জ্ঞান করত, নাস্তিক বাম বলে পরিত্যাগ করেছিলো, তাদেরকেও তালেবানের উত্থানে শীত্কার করে উঠতে দেখে খুশি হয়ে উঠেছে। বরবাদ বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিজম বলে। শাহবাগে সেই ফ্যাসিস্টদের উত্থান দেখে সে চিত্কার করে বলেছিলো, ফ্যাসিজমের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে…। সেই বাঙালী জাতীয়তাবাদীরাও “আমেরিকার পরাজয়ে খুশি হয়েছি” মুখোশ পরে তালেবানের উত্থানে আনন্দ করছে। আহমদ ছফাকে বরবাদ পছন্দ করে না। ছফার “বাঙালী মুসলমান” জাতীয়তাবাদ বরবাদের “ইচলামী আমিরাতের” সঙ্গে যায় না। কিন্তু তারাও আজ খুশি। মদিনার ঘরে ঘরে আজ ঈদ! এমন সময় এইরকম খোঁচা শুনতে কেমন লাগে?

 

বরবাদ কঠিনভাবে বলল, তালেবান নয়, বলো আফগানিস্থানের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং তারা হচ্ছে আফগানদের ইচলামী আমিরাতের সন্মানিত নেতৃবৃন্দ। ১৯৯৬ সালে যে আমিরাত আফগান মুল্লুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো যা মার্কিন দখলদারদের হাতে অন্যায়ভাবে পতন হয়েছিলো আজ তার পনুরুত্থান, এই বিজয় মক্কা বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে! প্রলেতারিয়েতদের ইচলামি আমিরাতের বিরুদ্ধে যারা কুত্সা রটায় তারা পুঁজিবাদের নর্দামায় জন্ম নেয়া নিকৃষ্ট কীট!

 

-কিন্তু বরবাদ ভাই, আপনি না সুফিবাদী কমিউনিস্ট? আপনি কি করে তালেবানদের শাসনকে সমর্থন করেন? আফগান নারীদের ওরা ফের ঘরেবন্দি করে ফেলল, নাটক সিনেমা খেলাধূলা নিষিদ্ধ করল। পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করল। গলা কাটছে যারা অনৈচলামিক কাজের সাথে যুক্ত। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে মুজাহিদদের খেদমতে। ওরা আফগানিস্থানে জিজিয়া কর বসাবে, গণিমতের মাল আদায় করবে… এসবকেই তো আপনি সমর্থন করলেন তাহলে?

 

-এখানেই তোমাদের ইলমের অভাব! তোমরা ইচলামকে শিখেছো জেনেছো ইউরোপীয়ানরা যেভাবে জানিয়েছে সেসব পড়ে…

 

-বরবাদ ভাই, আমার ইবনে কাথিরের সব খন্ড পড়া আছে। বুখারী আমি জীবনে বহুবার তন্ন তন্ন করে বহু জিনিস খুঁজেছি কাজেই আপনি বলতে পারেন না আমি পশ্চিমাদের ইচলাম থেকে কথা বলছি।

 

-আবার ভুল করলা! এখানেই লালন সামনে এসে দাঁড়ায়। ঐ যে বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথায় এক পড়শি বসত করে, আমি একদিনও না তারে দেখলাম… তোমাদের দশা সেই রকম। রুহের মধ্যে ইলম নিতে পারো নাই। যদি নিতা তাইলে বুঝতা, মার্কস যা বলছে আমার নোবিচি সেকথা কুরাইশদের মাঝে প্রচার করেছিলো ১৪০০ বছর আগে। মক্কার বিজয় হচ্ছে প্রলেতারিয়দের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট! সেসব না দেখে নারীদের বোরখা পরাইল ক্যান- এইসব নিয়া মাথা ঘামাও! এগুলি আফগানদের সংস্কৃতি।

 

-এইসব কি আবল তালব বলেন বরবাদ ভাই! পোলাপানদের ডেকে ডেকে পাঠচক্র করে এইসব বুঝান? খোল করতাল হারমনিয়াম নিয়া লালন চর্চার সঙ্গে তালেবান আদর্শ… বরবাদ ভাই, আপনি কি ঠান্ডা মাথায় একটা জেনারেশনকে, বাউল দর্শনকে তালেবানী রং দিতে চাইছেন?

 

-আমি এখন রাখব, সরি, তোমার সঙ্গে আর কথা বলার মানে হয় না…।

 

-বরবাদ ভাই, খালি আপনে না, আপনার মত আর যারা যারা আছে, ঐ ছলিমুল্লা আবদুল্লা মিয়াখা বাহাউল্লা… সবার আগে তালেবান আপনাদের অনৈচলামিক জীবনের কারণে কচুকাটা করবে। কথাটা স্মরণ রাইখেন…।

 

দশ বছর পর…

 

বরবাদের পাঠচক্রে বরবাদ একা একা পায়চারী করছে। এমন সময় স্বজোড়ে লাত্থি দিয়ে দরজাটা খুলে চার পাঁচজন কালো পোশাকের কাবলি পায়জামা পাঞ্জবী পরা লোক ঢুকে পড়ল। সকলের হাতে একে ফর্টি সেভেন। বুকের উপর ক্রশ করে বুলেটের মালা। এরা তালেবান মুজাহিদ। ঢাকার পতন ঘটেছে। কাল রাত থেকেই বরবাদ খবর পাচ্ছে নাটক সিনেমায় অভিনয় করে এমন যাদেরকেই পাচ্ছে বাড়ি থেকে মুজাহিদরা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। মুজাহিদরা এসে পড়ায় বরবাদ খুশিই হলো। এদের একটু বুঝাতে হবে। গতকাল যে মেয়েটাকে রাস্তায় প্রকাশ্যে ওরা ফাঁসি দিয়েছে সে মেয়েটা শুধু বাজনা ছাড়া খালি গলায় গজল গাইত। তার বহু ইচলামি গান আছে। মেয়েটা নিজে ফেইসবুক লাইভে এসে বলত ইচলামিক শাসন যারা যারা চান শুধু তারাই আমার এখানে কমেন্ট করুন… সেই মেয়েটিকে ওরা মনে হয় ভুল করেই মেরে ফেলেছে…

 

-ভুল করি নাই। জেনেশুনেই তাকে মারা হয়েছে। মেয়েমানুষ হয়ে গান গেয়ে নিজের গলা শোনানোর হুকুম সে কোথায় পেয়েছে? এগুলি কোন দেশের ইচলাম?

 

বরবাদ মজহার ঢোগ গিলল। তার মনে পড়ল ঢাকার সিনেমার একটা ভিলেন খুব ইচলাম প্রচার করত, তাকেও ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছে ওরা। খেলোয়াড়দের মধ্যে যারা মাঠে সিজদা দিত তাদেরকেও ওরা ছাড়েনি। ওরা বলছে খেলাই যেখানে হারাম সেখানে মাঠে সিজদা দিয়ে ইচলামকে বিকৃত করার শাস্তি দেয়া হয়েছে।

 

বরবাদ মজহার এবার খুব ঘাবড়ে গেলো। ওরা তাহলে তার কাছে কি চায়? গলা খুকখুক করে বলল, দেখো বাবারা, আমি সুফি তড়িকার লোক, লেখাপড়া করি, লেখালেখি করি, কারো সাতেপাঁচে থাকি না। আমি আগাগোড়া তোমাদের পক্ষে ছিলাম। আফগানিস্থানে তোমাদের বড় ভাইরা যখন জিতল তখন খুশিতে আমার লুঙ্গি খুলে গিয়েছিলো… দু:খিত আসলে বলতে চাইছিলাম তখন খুব খুশি হয়েছিলাম। তারপর এই দশ বছরে আমাদের এখানে তোমাদের উত্থানের জন্য রাতদিন লেখালেখি করেছি। বামপন্থি হত যেসব ছেলেমেয়েরা তাদের মাথা চিবিয়ে খেয়েছি। কমিউনিজমের সঙ্গে সুফিবাদী ইচলাম মিশিয়ে এমন এক মিক্সচার বানিয়েছিলাম, যেটা খেয়ে কোলকাতার হিন্দু ঘরের বহু ছেলেমেয়ে পর্যন্ত খিলাফত আমিরাতের জন্য মুখিয়ে আছে। ওরা এখন বলে ফাক হিন্দুনিজম, কিন্তু আল্লাহ আকবর ছাড়া জলও স্পর্শ করে না। আমি কিন্তু ইচলামের খেদমতেই ছিলাম…।

 

-চুপ বুইড়া খাটাশ! তুই বিয়া ছাড়া ঘর সংসার করতি শুনছি?… ঘরের মধ্যে এইসব হারমনিয়াম তবলা বাঁশি দিয়া কি করছ?

 

-লালন… মানে ঐ ভাববাদ আর কী, আসলে বাংলাদেশের পক্ষে গ্রামীণ সমাজ জীবনকে বাদ দিয়ে তো ইচলামি বিপ্লব সম্ভব না, এই জন্য লালনকে অবলম্বণ করে…

 

-এখন এই হারমনিয়ামটা তো পিছন দিয়া ভরমু শালা কাফের!

 

আরেকজন মুজাহিদ দ্বিমত করে বলল, শায়েখ, আমার মনে হয় হারমনিয়ামের চাইতে বাঁশিটা ঢুকতে সময় কম লাগবে। আমাদের হাতে সময় কম…।

 

-তুমি ঠিক বলেছো ওসমান। ওর পিছন দিয়ে বাঁশিটা ভরো। আর শোন, নিচে জিপের মধ্যে হাত-পা বাঁধা যে ভট্টাচার্যটা আছে, ওকে নিয়ে এসো। ওর কাছে একটা গিরিবাজ কবুতর আছে। ঐ শালাকে দেখতাম গিরিবাজ কবুতর মানুষের পুটকির মধ্যে ঢুকিয়ে হাততালি দিতে চাইত। কারণ গিরিবাজ কবুতর হাততালি শুনে ডিগবাজী খায়। জিনিসটা আমি এই দুইটার পুটকির মধ্যে গিরিবাজ কবুতর ঢুকিয়ে হাততালি দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে চাই।

 

-জ্বি, শায়েখ, অনেক ধন্যবাদ। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে শায়েখ, এইমাত্র খবর পেলাম একজনকে আটক করা হয়েছে যে নিজেকে আহমদ ছফার মাজারের খাদেম পরিচয় দিচ্ছে। সে দাবী করছে মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে কথা বলে সে প্রচুর ভিডিও টকশো ও কলাম লিখেছে। এখন তাকে আটক করে নাকি অন্যায় করা হয়েছে।

 

-দেখো মুজাদিহ, কোন রকম মাজার কবরকে আস্ত রাখবে না। সব ভেঙ্গে সমান করে দিবে! এইসব মাজারের থাদেমরাই বড় শিরকি। এদের কল্লা নামিয়ে দাও!

 

-জ্বি শায়েখ। তাহলে এই বুইড়া খবিশটাকে কি করব?

 

-গিরিবাজ কবুতর আনো। আগে পরীক্ষা করে দেখি…

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix