প্রগতিশীলতার ‘বাড়াবাড়ি’

সুষুপ্ত পাঠক: প্রগতিশীলতাকে উগ্রতা ‘বাড়াবাড়ি’ বলে চালিয়ে তাকে মৌলবাদী ডেকে আনার জন্য দায়ী করার চেষ্টা বেশ লক্ষণীয়। আফগানিস্থানের পশ্চিমা প্রগতিশীলতার প্রভাব, বিশ্ববিদ্যালয় পড়া নারী, তাদের পোশাক, দর্শনকে গোড়া ইসলামিক তালেবানদের উত্থানের জন্য দায়ী করলে তো বঙ্গের নারী শিক্ষা ও নারীদের ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসা রোকেয়াকেও দায়ী করতে হবে! বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ আইন পাশ করার আগে বলেছিলেন, ‘আমি ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র ব্রাহ্মণ সমাজের মাথার ওপর পা রেখে বলছি বিধবা বিবাহ হবেই।’ আজ কি কেউ বলছে বিদ্যাসাগরের এইসব ‘উগ্রতা’ হিন্দুত্ববাদ ডেকে এনেছে? ইতিহাস তো তাঁকে ঊনবিংশ শতাব্দীর রেঁনেসার জনক বলছে।

মানুষের উগ্র কট্টর ধর্মবাদী হয়ে উঠার জন্য কিংবা ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের জন্য সেক্যুলারিজম, প্রগতিশীলতার চর্চাকে দায়ী করে আসলে গোপন কোন স্বার্থ দেখা হয় কিনা সেটি গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্থানের নারীদের বর্তমান সপ্তম শতাব্দীর আদলে জীবনযাপনে আসার পিছনে নজিবুল্লার পশ্চিমা প্রভাবিত প্রগতিশীলতাকে দায়ী করা কি সহজ হত যদি আফগান দেশটি সম্পূর্ণ বোদ্ধদের হত? এই দেশটি ছিলো বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের। তর্কের খাতিরে মনে করি সেরকমই আছে এবং নজিবুল্লার পতনের পর বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী গোঁড়া মতবাদ ক্ষমতা দখল করল। তখন কি আফগান নারীদের আজকের মত হাল হত? কিংবা ইরানীরা শিয়া মুসলিম না হয়ে সূর্য উপাসনাকারী পার্সি ধর্মালম্বীই থাকত, তাহলে রেজা শাহর পতনের পর কি কোন মোল্লা খমেনির জন্ম হত? তুরস্ক যদি খ্রিস্টানদের দেশ হত তাহলে কামাল আতার্তুকের পর আজকের তুরস্কের উত্থান ঘটত?

সমস্যাটা এখানেই। ফেইসবুকে আফগানিস্থানের মাত্র চল্লিশ বছর আগে নারীদের স্বাধীন জীবনযাপন, ইরানের সর্ট স্কাট পরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের ছবি শেয়ার হতে থাকলে বর্তমান ইসলামিক শাসনে থাকা দেশ দুটির এই হালের নেপথ্যে ইসলাম ধর্ম ভিলেন হিসেবে দেখা দেয়। তখন তত্ত্ব খাড়া করা হয়, নজিবুল্লার বা রেজা শাহের আমলে পশ্চিমা কলোনিয়াল প্রগতিশীলতা, সেক্যুলারিজম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার ফলেই ইসলামিক মোল্লাদের উত্থান ঘটেছে! কি আজব যুক্তি! মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক বন্ধ করতে হেফাজতের হুমকি ধামকিকে কি তাহলে বলতে হবে মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকের মত পশ্চিমা জিনিস নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই মৌলবাদীরা রাস্তায় নেমেছিলো! দোষ মাতৃদুগ্ধের! ৩২ বছর আগে ভারতে মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক চালু হয়েছিলো। ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান, হিন্দুদের নানা রকম কুসংস্কার আজো বিদ্যমাণ। আমি নিশ্চিত হিন্দু ধর্মের কোথাও এরকম দুধ পানের শাস্ত্রীয় বাঁধা থাকলে মৌলবাদীদের থেকে বাঁধা আসত। সেই বাঁধা টিকত কিনা সেটা ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশে যে বিরোধীতা এসেছে সেটা ইসলামের কথিত দুধভাই বোনের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাবার শংকা থেকে। তাই হুজুররা এটা করতে দিবেন না। তাতে শিশুরা মায়ের দুধের অভাবে মরে গেলে মরে যাবে তবু তাদের ইসলাম রক্ষা করতে হবে। আমি এভাবেই দেখি বিষয়টা। বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধের বিরোধীতা এসেছে ইসলামিক মৌলবাদ থেকে। এখানে বৌদ্ধ মৌলবাদ কিংবা খ্রিস্টান মৌলবাদ থাকলে এমনটা হত না। ইরান আফগানিস্থানেও মধ্যযুগীয় অবস্থায় যেত না। গিয়েছে ইসলামী মৌলবাদের কারণে।

আপনি আমাকে দেখান আরব বিশ্ব ছাড়া নারীদের মধ্যযুগীয় পোশাক জীবনযাপন আর কোথায় আছে? আফগানিস্থান, ইরানের ইসলামী শাসন আসার পর যে পরিবর্তন সেরকম পরিবর্তন আর কোথায় ঘটেছে? ভারতে বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আইন পাশ হওয়ার পর আধুনিক ভারত হিন্দু শাস্ত্রকে অগ্রাহ্য করে ডিভোর্স পিতৃ সম্পত্তিতে অধিকার আইন পাশ হওয়ার পথ খুলে গিয়েছিলো। অর্থ্যাৎ বিদ্যাসাগরের ‘বাড়াবাড়ি’ হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে অধিকার, ডিভোর্স দেয়ার অধিকার এনেছিলো। ইরান আফগানিস্থানের ‘বাড়াবাড়ি’ তাহলে ভিন্ন ফল এনে দিলো কেন?
কি ভাবছেন, আমি শুধুমাত্র ইসলামী মৌলবাদীকে ভয়ানক দেখাচ্ছি আর বাকীদের নরম কোমল হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছি? আজ্ঞে না! আমি শুধু বলতে চাইছি আফগান ইরানের পরিণতি জন্য এককভাবে ইসলাম দায়ী। হাঁটু অব্দি স্কার্ট পরার কারণে তালেবানরা সাধারণ মুসলমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সমস্যায় পড়ে মুসলিম নারীরা। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? যদি বৌদ্ধ মৌলবাদীরা আফগানে ক্ষমতায় আসত তাহলে কি আফগান নারীদের এইরকম জীবনযাপন করতে হত? জামাত ইসলামী কিংবা অন্য কোন ইসলামী দলের পক্ষে নারী নেতৃত্বে চালু করা সম্ভব নয়। বিজেপিতে সুষমা স্বরাজ নেতৃত্ব দেয়ায় বিশেষ প্রগতিশীল হয়ে উঠে না। তেমনি ইসলামী রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব না থাকাটা অবশ্যই দুই দেশের এরকম দুটি পার্টির ক্ষমতায়নের চিত্র ভিন্ন হতে বাধ্য। আমি বলতে চাইছি আফগান নারীরা যে কষ্টটা পাচ্ছে সেটা তারা পেত না বৌদ্ধ হলে যদি সেখানে বৌদ্ধ মৌলবাদীরা ক্ষমতায় থাকতও! একদম সোজাসাপটা কথা। যুক্তিসহকারে আমাকে ভুল প্রমাণ করুন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix