পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বাঙালী মুসলমানের ‘হিন্দু’ বিষয়ক ভাবনা

আজ একজনের লেখা পড়ে আবার কথাটা মনে এলো, বাঙালী মুসলমানের মনে গভীর দু:খ ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানীরা তাদেরকে ‘হিন্দু’ মনে করে চরম অপমান করেছিলো! আমি এ পর্যন্ত যত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লোক পেয়েছি উনারাও ক্ষুব্ধ যে পাকিস্তানীরা মিথ্যা ব্লেম দিয়েছিলো যে বাঙালীরা ‘অর্ধেক হিন্দু’। তারা কেউ নামাজ পড়ে না ইত্যাদি। অথচ ঢাকায় বাইতুল মোকাররমের মত মসিজদে এত মানুষ নামাজ পড়ে যে লোক সংকুলান না হয়ে রাস্তায় চলে আসে। ডক্টর কামাল হোসেন বলেছিলেন, সৌদির একজন প্রতিনিধি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সফরে এসে বাইতুল মুকাররমে শুক্রবার এত মানুষ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলো। তারা মনে করত শেখ মুজিবের বাংলাদেশে কেউ নামাজ পড়ে না। পাকিস্তানীরাও খোদ এখানে এসে এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে। তেমনি একটি বিখ্যাত ঘটনা যেটা বড় বড় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লোকজন সময় পেলেই প্রচার করেন। পাকিস্তানী সেনা সদস্য যিনি মুক্তিযুদ্ধে ঢাকায় আত্মসমর্পন করেছিলেন তিনি বাঙালীদের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন কারণ এরা ‘হাফ হিন্দু’ হবার কারণেই ‘ভারতের গুপ্তচর’ অরজিনাল হিন্দুদের সঙ্গে নৈকট্য লাভ করে পাকিস্তান ভেঙ্গে ফেলেছিলো। সেই সেনা সদস্য ল্যাফটেন্যান্ট জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিন দেশ স্বাধীনের পর ঢাকায় একটি সম্মেলনে এসে দেখলেন শবে বরাতের রাতে টেলিভিশনে হুজুরদের প্রোগাম হচ্ছে এবং ওয়াক্তে ওয়াক্তে টিভিতে আজান প্রচার হচ্ছে। সে বিস্ময়ে একথা একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি ক্ষুব্ধভাবে জবাব দিয়েছিলো, ‘আপনি এখনও বুঝতে পারছেন না যে আমরা মুসলমান, হিন্দু ভেবে আমাদের বাপ-দাদাকে আপনারা হত্যা করেছেন…’

 

কে এই জবাবটা দিয়েছিলো জানি না। সে কিন্তু পাকিস্তানী বর্বরতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে জানারেলকে। বলেছে ‘হিন্দু ভেবে’ আমাদের বাপ-দাদাকে হত্যা করা হয়েছিলো…। আসলেই? অরজিনাল হিন্দু হত্যাগুলো তাহলে সঠিক ছিলো?

 

ডক্টর মুহাম্মদ শহিদুল্লাহকেও আবুল ফজল ও কায়কোবাদ ‘হিন্দু’ বলে দোষী করেছিলেন! কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে ‘হিন্দু লেখকদের’ লেখা তিনি বেশি রেখেছিলেন। ‘হিন্দু’ অভিযোগে শহিদুল্লাহ তখন জবাব দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধভাবে, ‘সমালোচকের জানা উচিত কাহারও ওপর কুফরী ফতোয়া দিলে সে যদি প্রকৃত কাফির না হয়, তবে ফতোয়াদাতাই কাফির হইবেন, ইহাই ওলামা সমাজের অভিমত। আমি পাকিস্তানের মতবাদকে ইসলামী মতবাদেরই আদত বলিয়া মনে করি। কাজেই কোনও মুসলমান পাকিস্তানের মতবাদের বিরোধী হইবে ইহা ধারণাই করিতে পারি না’ (একটি পুরনো বিতর্ক সংগ্রহ, সংকলন ও পূর্বলেখ, ভূঁইয়া ইকবাল, কালি ও কলম, সেপ্টম্বর, ২০১৩)।

 

আরেকটা বিখ্যাত ঘটনা মাওলানা ভাষানী বাঙালীদের ‘হিন্দু’ বলায় ক্ষুব্ধ হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমাদের কি লুঙ্গি উচিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে আমরা মুসলমান?

 

এই ঘটনাগুলির মধ্যে তীব্রভাবে মুসলিম প্রমাণ করার চাইতেও হিন্দু হবার হীনতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জেদই যেন বেশি!

 

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যদি শুধু হিন্দুদের বেছে বেছে হত্যা করত তাহলে মনে হয় বাঙালী মুসলমানদের কোন অভিযোগ থাকত না! ঢাকায় এত মসজিদ, এখানে ইজতেমা হয়, এখানে একসঙ্গে দুপুরে যখন আজান হয় তখন কার বাপের সাধ্য কানে হাত না দিয়ে পারে- এরকম একটা ইসলাম প্রাণ বাঙালীদের পশ্চিমারা ‘হিন্দু’ বলাতেই যেন তাদের বেশি দু:খ! অথচ তাদের আত্মপরিচয়ই তো ‘হিন্দু’! ‘হিন্দু’ তার সংস্কৃতি। ‘হিন্দু’ তার পোশাক। ‘হিন্দু’ তার খাবার। ‘হিন্দু’ তার স্বভাব। ‘হিন্দু’ তার লোকাচার। শহিদুল্লার মত পন্ডিত ব্যক্তি যেভাবে ‘হিন্দু’ পরিচয়কে মোকাবেলা করলেন সেটা রীতিমত অশিক্ষিত ধার্মিকের মত। পাঞ্জাবী পাঠানীরা আমাদের ‘হিন্দু’ বললে শিক্ষিত জ্ঞানী সংস্কৃতিবাণ সাহিত্যিক কবিদের উত্তর তো হবে সে আলবাত ‘হিন্দু’! সাধারণ মানুষকে তো তারাই শেখাবেন। কিন্তু তারা নিজেরাই যদি বিশুদ্ধ ‘মুসলমান’ হবার চেষ্টা করেন তাহলে সাধারণ মুসলমানরা নিজেদের ‘মুসলিম জাতি’ এইরকম বায়ুবীয় পরিচয়ই ধারণ করবে। সেটাই তো হয়েছে। আমাকে মাঝে মাঝেই শুনতে হয়েছে, পাকিস্তানীরা তো হিন্দুগো মারছি। যিনি বলছেন তিনি পাকিস্তানীদের দোষকে লঘু করতে বলছিলো। এরা আমজনতা। কথাটা যে প্রোপাগন্ডা ঠিক আছে। কিন্তু তাদের তো কথাটা খুব পছন্দ হয়েছে! এটাই গুরুত্বপূর্ণ। কেন তাদের পছন্দ হলো হিন্দুদের শুধু মারতে এসেছিলো শুনে?

 

এটা মোটেও মিথ্যে নয় যে পাকিস্তানীরা ১৯৭১ সালে এদেশে হিন্দুদের কঠিন শাস্তি দিতে এসেছিলো কারণ তারাই পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য দায়ী। পাকিস্তানীদের কাছে এই ‘হিন্দু’ হচ্ছে যারা মূর্তি পুজা করে। তারাই বাঙালী মুসলমানকে ‘হাফ হিন্দু’ বানিয়ে রেখেছে। শর্ষীনার পীর একাত্তরে হিন্দু নারীদের ‘মালে গনিমত’ ঘোষণা করলেও পাকিস্তানী জেনারেলরা ‘হাফ হিন্দুদেরও’ মালে গনিমত শরীয়ত সম্মত মনে করেছিলো কারণ তারা এটা মন থেকে বিশ্বাস করত যে এরা ‘হাফ হিন্দু’। তাহলে কি দাঁড়াল? পাকিস্তানীরা যাদের ‘হাফ মুসলিম’ অথবা ‘হাফ হিন্দু’ মনে করত তারা নিজেদের সবচেয়ে বড় মুসলমান প্রমাণের একটা চর্চা ছিলো। নিজেদেরকে তারা ‘হিন্দু’ পরিচয়ে ক্ষুব্ধ হত। এখানকার জনগোষ্ঠির তুমুল মুসলমানিত্বের বর্ণনা করে মুক্তিযুদ্ধের গবেষকরাও বলতে চান পাকিস্তানীরা তবু কতভাবে আমাদের ‘অপমানিত’ করতে চাইত। সব মিলিয়ে কী বিচিত্র রকমের সাম্প্রদায়িক জাতি চেতনা!

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix