নোয়াম চমেস্কি ও পাচ্যের বাস্তবতা

নোয়াম চমেস্কিকে আরবরা স্রেফ “কাফের” ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। এই মনে করার মধ্যে প্রচন্ড রকমের ঘৃণা আছে। কিন্তু চমেস্কি মনে করেন আরবরা ধর্মনিরেপক্ষ জাতীয়তাবাদী ছিলো ইজরাইলই তাদের নষ্ট করেছে। ইজরাইলের বিরোধীতা করতে গেলে আরবদের তুলসি পাতা দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করা লাগে না। আরবরা কবে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারারিজমকে গ্রহণ করেছিলো ইতিহাসে তার সামান্যতম ইঙ্গিত কি পাওয়া যায়? বাগদাদের খলিফাদের মধ্যে যারা উদার সাহিত্য শিক্ষা সংস্কৃতি অনুরাগী ছিলেন তাদের ধরে ধরে কি চমেস্কি ধর্মনিরপেক্ষ বলছেন? এ কারণেই ইসলামী জঙ্গিবাদকে চমেস্কিরা মাঝে মাঝে ফিডম ফাইটার বলে ফেলেন, যখন সেটা আর বলা সম্ভব হয় না তখন জঙ্গি হওয়ার পেছনে নিজের দেশ আমেরিকা না হয় ইজরাইলের হাত আবিস্কার করে ফেলেন। চমেস্কিকে ইতিহাস শেখানোর ধৃষ্ঠতা এই সময়কালের মধ্যে কারোর নেই। তিনি কি দেখাতে পারবেন, পূর্ববঙ্গ থেকে বিতারিত হিন্দু বাঙালীরা জঙ্গিবাদ বা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদে জড়িয়েছিলো? উল্টো আমরা দেখি তারা বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলো। মুসলিম লীগ ও মুসলমানদের থেকে বিতারিত হয়েও তারা চরম সেক্যুলার রাজনীতিতে আস্থা রেখেছিলো। চমেস্কি কাশ্মিরের ইতিহাস ভালো করেই জানেন। কাশ্মিরে সমস্যা হলেই তিনি প্রতিবাদ করেন। তিনি কি দেখাতে পারবেন কাশ্মিরী হিন্দুরা এক রাতের মধ্যে নিজ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন মুসলমানদের কাছ থেকে, তবু তারা জঙ্গিবাদী হলো না কেন? তাহলে ইজরাইল কি করে আরবদের ধর্মীয় জঙ্গিবাদী করে তুলল?

 

এই যুদ্ধে তাই লিবারাল, সেক্যুলারদের পরাজয় সুনিশ্চিত। তাদের একচোখা বিশ্লেষণ একদিকের মানুষকে ক্ষুব্ধ করবে আরেক দিকের ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদ দায়মুক্তি পেয়ে বাড়বাড়ন্ত হবে। বাংলাদেশ সম্পর্কে চমেস্কি ধারণা যে বেশি নেই সেটা না বুঝার কিছু নেই। কারণ চমেস্কি গোটা বিশ্ব নিয়ে ভাবেন। এত সময় কোথায় বাংলাদেশ নিয়ে? তাছাড়া বাংলাদেশের আহমদ ছফা, প্রফেসর রাজ্জাক, সলিমুল্লাহ খান, হুমায়ূন আহমেদের বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেও যদি তাকে পড়ানো হয় তিনি কি বুঝবেন বাংলাদেশের পাহাড়ে আসলে একটা ইজরাইলী কায়দায় জমি দখল করা হচ্ছে? তিনি কি জানতে পারবেন কি করে এখানে সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রীয় মদতে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তোলা হয় ফলশ্রুতিতে তাদের নিরবে দেশত্যাগের কথা ভাবতে হয়। না, চমেস্কি বাংলাদেশের কোন বই পড়েই এ সম্পর্কে কিছু জানতে পারবেন না। তিনি ভারতের কাশ্মির নিয়ে জানতে কাশ্মির পর্যন্ত আসেন না। কাশ্মির নিয়ে, ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে সেখানকার সেক্যুলার লেখকরা, বামপন্থি লেখকরা দুই হাতে লেখেন। এসব লেখাকে কেউ “দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র” বলে না, দেশকে “বিদেশীদের কাছে হেয় করা” বলে না। বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের উত্থানকে স্বীকার করাকে প্রগতিশীলরা মনে করেন এটি বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র নয়, বাংলাদেশ হচ্ছে উদার ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দেশ. “গুটি কয়েক দুর্বৃতের” কারণে বাংলাদেশকে জঙ্গি সাম্প্রদায়িকতার দেশ বলাটা ভারতের বিজেপি র’ এজেন্টদের ষড়যন্ত্র! তাহলে কি করে চমেস্কি বাংলাদেশের আসল চেহারাটা জানবেন? এ জন্যই তিনি বিশ্বে ইহুদী জায় নবাদ, হিন্দুত্ববাদ, সাম্রজ্যবাদ, সা দা চাম ড়াবাদ ইত্যাদি ফ্যাসিস্ট শক্তির কথা জানলেও ইস লামী ফ্যাসিস্ট শক্তির কথা জানেন না, মানেনও না। কারণ তিনি মুস লিম প্রধান দেশের কোন বুদ্ধিজীবীর লেখাতে, বক্তব্যে এসবের ছিটে মাত্র পান না!

 

চমেস্কিকে নিয়ে যখন লিখছি, তখন একজন একটি লিংক দিলেন, ‘সাদা এপ্রোন’ নামের একটা পেইজ থেকে পাহাড়ীদের রীতিমত সন্ত্রাসী বিচ্ছিন্নতাবাদী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে বাঙালী মুসলমানদের দেখানো হয়েছে ‘উপজাতিদের হাতে জিন্মি’! এরকম হাজার খানেক পেইজ আছে বাংলাদেশের পাহাড়ে বসবাসরত জনগোষ্ঠিদের বিরুদ্ধে। এইসব ভার্চুয়াল বিরোধীতাকে আমলে না নিলেও বাস্তবে সেখানে কি ঘটছে সেসব জাতীয় দৈনিকে কখনো কখনো ছোট করে হলেও উঠে আসে। পাহাড়ী দরিদ্র শিশুদের থাকা খাওয়া ও লেখাপড়ার কথা বলে ঢাকায় এসে মাদ্রাসায় ভর্তি করে মুসলমান বানানোর কার্যক্রম বড়সড় আকারে চলছে। এরকম একটি শিশু পাচার এক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন ধরে ফেলেছিলো। পর্যট্রন কেন্দ্রে মস জিদ বানিয়ে মাইক লাগিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে আজান দেয়া। হুমামূন আহমেদের ছেলে সেরকম মসজিদ ও আজানের প্রয়োজনীয়তা উপর বিজ্ঞাপনও তৈরি করেছিলেন। নতুন একটা প্রজন্ম কি ধরণের জাতীয়তাবাদী মনোভাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে এই ঘটনা থেকে টের পাওয়া যায়। আরো আছে, এই সেদিন পাহাড়ের বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছে তাদের জমিতে মাদ্রাসা নয় স্কুল দরকার। কিন্তু মাদ্রাসা তৈরি করে পাহাড়ে মুস লিম সংস্কৃতি আদাব আকিদাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশে যেখানেই অমুসলিম সংস্কৃতি ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানেই কেন মাদ্রাসা মসজিদ করতে লাগবে? কাশি গয়া মথুরাতে ঔরাঙ্গজেব মসজিদ বানিয়েছিলেন। কেন? কাশিতে তীর্থ করতে আসবে মুস লমানরা? সীতাকুন্ডে বেশ কয়েক বছর ধরে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে হুজুররা সফর করছেন এবং ফিরে এসে ফেইসবুকে পোস্ট দিচ্ছে ঐ পাহাড়ের উপর একটা মসজিদ খুব দরকার, কারণ সফরকারীদের নামাজের সময় হয়ে গেলে নামাজ পড়তে অসুবিধা হয়। কি যুক্তি দেখুন! সফরে থাকলে নামাজ যেখানে কাজা করা যায়, এমন কি নামাজ পড়তে যেখানে মসজিদের দরকার নেই, ইস লামে এরকম বিধান থাকার পরও হিন্দুদের একটি তীর্থক্ষেত্রে মসজিদ বানানোর একটা দীর্ঘকালীন চেষ্টা চলছে। একদিন দেখবেন সেটা তারা করেও ফেলেছে। পায়ে পা দিয়ে বিবাদের আরবী ইস লামিক সংস্কৃতির কথা চমেস্কির বুঝতে আরেক জন্ম লাগবে। তাই চমেস্কি এতবড় পন্ডিত হয়েও আমাদের মত কম জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছে তাদের ভ্রান্তি বিভ্রম স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে।

 

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix