নৈরাজ্যবাদ, সমাজতন্ত্র: সম্ভব অসম্ভব

নোয়াম চমেস্কি বলেছেন, যদি বলশেভিক বিপ্লবকে কেউ সমাজতন্ত্র বলেন তাহলে চমেস্কি তার নিজের নাম সমাজতন্ত্রীর খাতা খেকে কেটে দিবেন। তিনি মনে করেন, লেলিন সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু। চমেস্কি কথাগুলি বলেছেন তিনি সোভিয়েত রাশিয়া বা লেলিন বিরোধী সে জন্য নয় কিন্তু। আপনি যদি ভালো করে খেয়াল করেন, দেখতে পাবেন, লেলিন, মাও, ক্যাস্ত্র সকলেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছেন। রাষ্ট্রগুলিকে ‘কমিউনিস্ট রাষ্ট্র’ বানিয়েছেন। এরা সকলেই ভূতপূর্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তন করে আরেকটি রাষ্ট্রই তৈরি করেছেন। পূর্বতনরা যে খাঁচা দিয়ে বন্দি করে জনসাধারণকে শাসন করত, ঠিক সেরকমই দেখতে আরো কঠিন অসহনীয় খাঁচাই তৈরি করেছিলো মানুষকে শাসন করতে। অথচ ‘সমাজতন্ত্র’ কোনদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না যতদিন ‘রাষ্ট্র’ ‘সরকার’ ব্যবস্থা বজায় থাকবে। এখান থেকেই ‘নৈরাজ্যবাদী’ ও ‘বামপন্থিরা’ আলাদা হয়ে যায়। ‘নৈরাজ্য’ মানে হামলা ভাংচুর করা তা নয়। যদিও নৈরাজ্য বলতে সংবাদপত্রে এভাবে লেখে, ‘চরম নৈরাজ্য শুরু করে ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয়েছে’ ইত্যাদি। আসলে নৈরাজ্যবাদ মানে হচ্ছে রাজ্য বা রাষ্ট্র বা সরকার ব্যবস্থা না মানা। নৈরাজ্যবাদী মানেই বামপন্থি তা কিন্তু নয়। তবে সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে নৈরাজ্যবাদী না হয়ে ভিন্ন পথ নেই। কিন্তু বামদের গুরু কার্ল মার্কস পুঁজিবাদের দোষ ত্রুটি ক্ষতি নিয়ে যত কথা বলেছেন, সমাজতন্ত্র কি করে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে তা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। তাই লেলিন বা অন্যরা ঠিক মার্কেসের ধারাবাহিকতা কিনা সেটি কোনভাবেই নির্ধারণ করা যায় না।

 

কমিউনিস্টরা রাষ্ট্র ব্যবস্থা দখল করে আসলে “লাল আমলাতন্ত্র” প্রতিষ্ঠা করে। নৈরাজ্যবাদের জনক মিখাইল বাকুনিন নামের একজন নৈরাজ্যবাদী তাত্ত্বিক সাবধান করে দিয়েছিলেন কমিউনিস্টরা বিপ্লব করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে আসলে “লাল আমলাতন্ত্র” কায়েম করে মানুষকে গোলামী করতে বাধ্য করবে। তার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিলো সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া কিংবা বিলুপ্ত পূর্ব জার্মানিতে। লেলিন জার শাসিত রাশিয়া দখল করে ‘কমিউনিস্ট রাষ্ট্র’ গঠন করেছিলেন। অর্থাত জারতন্ত্র বদলে লেলিনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। জারের যেমন সরকার প্রশাসন ছিলো, লেলিন ঠিক সে জায়গায় কমিউনিস্ট সরকার প্রশাসন বসিয়েছেন। এবং এখন পর্যন্ত পৃথিবী জুড়ে যত বামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন সংগ্রাম আন্দোলন করে যাচ্ছে মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য তারা সকলেই একটি সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের লক্ষ্য ঠিক করেছে। এখন যে সরকার ব্যবস্থা আপনাকে যেরকম শৃঙ্খলিত, নতজানু করে রেখেছে ঠিক সেভাবেই কমিউনিস্ট বা ইস লামিক রাষ্ট্র শৃঙ্খলিত করে রাখবে। এটা এতটাই সত্যি ও বাস্তব যে মনে হয় না এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করবে। তবু আরেকটু খোলশা করে আলোচনা করা দরকার…।

 

বর্তমান বিশ্বে ‘ইস লামী খিলাফত’ কিংবা ‘কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্র’ আপনাকে তাদের নিজেদের রঙ করা নতুন একটি খাঁচায় বন্দি করা ছাড়া অন্য কিছু দিতে পারবে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর তবু খাঁচার উপরে কোন ছাদ নেই। চাইলে কেউ খাঁচা টপকে বেরিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ইস লামিক কিংবা কমিউনিস্ট খাঁচার উপরে নিচে চারপাশে কঠিন লৌহকপাট থেকে আপনার কোন মুক্তি নেই। কিন্তু নৈরাজ্যবাদ যে সমাজতন্ত্রের কথা বলে সেখানে কোন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের কথা বলে না। ‘নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র’ কোন সরকার বা রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা হবে না। জনগণ নিজের বিষয়ে একত্রে বসে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এর জন্য কোন কর্তৃপক্ষ, অফিস, বিভাগ বানিয়ে বেতন দিয়ে লোক পোষা লাগবে না। তাই অর্থ লোপাট হবে না, দুর্নীতিও হবে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও ঘটবে না। এরকম বাস্তব উদারণ কিন্তু অতি সাম্প্রতিকাল খেকেও দেয়া যায়। যেমন ডেনমার্কের একটি গ্রাম ক্রিশ্চিয়ানা যেখানে ১৯৭১ খিস্টাব্দ থেকে কিছু মানুষ বসবাস করছে যারা নিজেদের ডেনমার্কের অংশ মনে করে না। সেখানে কোন সরকার নেই। ডেনমার্ক সরকারও তাদের নিজেদের মত থাকার বিষয়ে কোন মাথায় ঘামায়নি। স্পেনের গৃহযুদ্ধের আগে বেশ কিছু স্থানে সরকারহীনভাবে মানুষের বসবাসের উদাহরণ আছে। এমনকি সোমালিয়াতে ১৯৯১ খিস্টাব্দের পর থেকে কোন সরকার ছাড়াই দিব্যি চলে যাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সোমালিয়া বিগত সরকারবিহীন সময়ে অতিতের সরকার ব্যবস্থার চেয়ে বেশ উন্নতি করেছে। যদিও বৃহত পরিসরে অনেক মানুষের মাঝে কি করে নৈরাজ্যবাদ অর্থাত সরকারবিহীন মুক্ত সমাজ দিয়ে চলা যাবে সেরকম বিতর্ক আছে। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পৃথিবীতে কোন কিছুকে নিখুঁত নির্ভুল বলে মনে করি না। আমি নৈরাজ্যবাদীও নই। কমিউনিস্টও নই। আমি ব্যক্তি স্বাধীনতায় প্রবলভাবে বিশ্বাসী। কিছু লোক জনসাধরণকে নিয়ন্ত্রণ করুক তারও বিরোধী। জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্র ও দেশপ্রেমের কঠোর বিরোধী। মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সকলের জন্য সমান সুযোগ, সুষম বন্টনে বিশ্বাসী বিধায় নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রীদের অনেক কাছাকাছি। তবু নিজেকে ঠিক কোন ‘বাদের’ বা ‘বাদী’ হিসেবে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারি না। কাজেই এই লেখা কোন নৈরাজ্যবাদী বা সমাজতন্ত্রী হিসেবে আমি লিখছি না। সেরকম কোন উদ্দেশ্য আমার নেই।

 

এঙ্গেলস নৈরাজ্যবাদীদের রাষ্ট্রহীন অবস্থানের বিরোধীতা করেছিলেন। কমিউনিস্টরা মনে করে, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে কমিউনিস্ট শাসন শুরু করলে যখন গোটা বিশ্ব কমিউনিস্ট হয়ে যাবে তখন আপনাআপনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। এই রকম চিন্তার সঙ্গে নোয়াম চমেস্কি একমত নন। এমনকি বিশ্বজুড়ে “নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রী” সকলেই একমত নন। তাদের কথা ব্যক্তি মানুষ স্বাধীন না হলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। সরকার বলতে কিছু থাকবে না। রাষ্ট্র বা “দেশ” বলতে কিছু থাকবে না। নৈরাজ্যবাদীদের এইসব স্বপ্ন কি ইউটোপিয়া? নিছক কল্পনা বিলাস?

 

ইতিহাসে কিন্তু আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্র সরকার ছাড়াই মানুষ দিব্যি ভালো থেকেছে। সরকার পুলিশ আইন না থাকলে তো লাঠালাঠি খুন রাহাজানি কিংবা বহির্শত্রুর আক্রমনের শিকার হতে হবে ইত্যাদি প্রাথমিক চিন্তা আমাদের মাথায় চলে আসে কারণ আমরা মানব জাতির ইতিহাস তেমন চর্চা করি না। যদি আমরা আরবদের কথা চিন্তা করলে দেখতে পাবো ইস লাম আসার পূর্বে তাদের কোন রাষ্ট্র ছিলো না। তারা গোত্রে গোত্রে ভাগ ছিলো। সবগুলো গোত্র মিলেমিশে থাকত। সেখানে যুগ যুগ ধরে ইহুদী খিস্টানসহ আরো বেশ কিছু ধর্ম সম্প্রদায় ও জাতি রাষ্ট্র সরকার পুলিশ সেনাবাহিনী ছাড়াই বসবাস করেছে। কোন সমস্যা হলে তারা নিজেরা বসে  মিমাংসা করেছে। প্রফেট মুহা ম্মদ বালক ও যৌবনে সিরিয়া সফর করে সেখানকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধতা দেখে নিজেদের দারিদ্রতার সঙ্গে তুলনা করে হতাশ হয়ে পড়তেন। তখন থেকেই তিনি একটি আরব সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্ন দেখে থাকতে পারেন। আরবদের সকল গোত্রকে এক করে অর্থনৈতিক এইসব সমৃদ্ধতায় মালিকানা ছিনিয়ে নেয়ার উপনিবেশিক ধর্মের নাম ‘ইস লাম’। অথচ গ্রীকরা যখন রাষ্ট্র আইন সেনাবাহিনী তৈরি করে চলেছে আরবরা তখন রাষ্ট্রহীন জীবন কাটিয়েছে। সেই রাষ্ট্রহীন ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা “অন্ধকার যুগ” বলাটা বিজয়ীদের পূর্বতনদের হীনভাবে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রই রাষ্ট্র বিরোধীদের “নৈরাজ্যবাদী’ বলে এমনভাবে অর্থ বানায় যাতে এর মানে দাঁড়ায় সন্ত্রাসী রাহাজানির সমার্থক। ইস লাম আসার পর আরবরা “ইস লামী রাষ্ট্র” গঠন করে। সেই রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ছিলো। সেই সেনাবাহিনীর খরচ মেটাতে যুদ্ধ করতে হত। যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য বাড়িয়ে রাষ্ট্রে তহবিল পূর্ণ করতে হত। রাষ্ট্রে আইন জনসাধারণকে মানতে বাধ্য করা হত। তারপর সেই সাম্রাজ্যের ক্ষমতায় কে বসবে তা নিয়ে গৃহযুদ্ধ হলো। গোটা আরব ‘ইস লামি খিলাফতের’ রক্তের স্রোত দেখতে পেলে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত। অর্থাত রাষ্ট্র ব্যবস্থার আগে আরবদের কোন অসুবিধা না হলেও রাষ্ট্র ব্যবস্থাই তাদের পরাধীন করে তুলেছিলো। ইস লামী খিলাফত আরব থেকে ইহুদী খিস্টানদের উচ্ছেদ করেছিলো। ইস লামী সাম্রাজ্যবাদ যখন পাকাপোক্ত তখন বাগদাদে মুতাযিলা নামের যে জ্ঞান ভিত্তিক একটি আন্দোলন শুরু হয় সেখানে কেউ কেউ এই নৈরাজ্যবাদের চর্চা করতেন। তারা খলিফার শাসন বিহীন সমাজের কথা চিন্তা করতেন। তবে তারা কেউ কমিউনিস্ট ছিলেন না। মানে সেরকম কোন রাজনৈতিক মিল তাদের মধ্যে পাওয়া যায়নি। অর্থাত আপনাকে নৈরাজ্যবাদী হতে হলে কমিউনিস্ট হতে হবে তা নয়। সম্পদের সুষম বন্টন, শ্রমের মর্যাদা, শ্রেণীহীন সমাজ চেয়ে যে সমাজতন্ত্র তাকে পেতে কমিউনিস্ট পার্টিতে গিয়ে নাম লেখাতে হবে না বা আপনি বামপন্থিদের উপর আস্থা রাখবেন তেমনটা নয়। কারণ তারা আপনাকে আরেকটি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাতেই নিয়ে যাবে। কিউবার সরকার স্বাস্থসেবার মান ভালো করেছে, খাদ্যের নিশ্চিয়তা দিয়েছে, শিক্ষার হার একশভাগ করেছে, এগুলো কমিউনিস্ট বিজ্ঞাপন হতে পারে, সমাজতন্ত্রের নয়। কারণ কিউবার মানুষ স্বাধীন নয়। ‘মানুষের সমাজ’ নির্মাণ না করতে পারলে কখনই মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসবে না। কমিউনিস্টদের প্রশ্ন করুন- নেদারল্যান্ড সুইডেন এইরকম ইউরোপীয়ান দেশগুলি তো কমিউনিস্ট শাসন ছাড়া দিব্যি ভালো আছে এটা কিভাবে সম্ভব হলো? দেখবেন তারা উত্তর দিতে পারবে না। ভারতে কেরালা রাজ্যের ‘কমিউনিস্ট সরকার’ করোনা মোকাবেলায় ভারতের অন্য রাজ্যগুলো থেকে এতটাই সফল যে সেখানে এখন স্কুল কলেজ সব খুলে দেয়া সম্ভব হয়েছে। কেরালা সরকার তো ভারতে ‘কমিউনিজম রাষ্ট্র’ গঠন করেনি। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তারা যে রাজনীতি করে তাতে কমিউনিস্ট নীতি প্রয়োগের কোন সুযোগ নেই। তবু সবাই ‘কমিউনিস্টদের’ বাহবা দিচ্ছে? তাহলে ইউরোপের শতভাগ গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা যে সরকার ব্যবস্থা দিয়েছে তাদের ক্রেডিটের জন্য কোন আদর্শকে বাহবা দেয়া হবে? ইউরোপের এইসব দেশের মানুষও দ্রুত নৈরাজ্যবাদী হয়ে পড়ছে। তারা বলছে ‘সরকার’ পেলেপুষে রাখার জন্য তাদেরকে যে ট্যাক্সের বোঝা বইতে হয়, দিনে দিনে নতুন নতুন ট্যাক্স যেভাবে তাদের উপর চেপে বসছে সেসব মেটাতে গিয়ে তাদের জীবন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ তার জীবনকে আর উপভোগ করতে পারছে না। তারা ভাবছে সরকারহীনতাই তাদের অধিকতর মুক্তি দিতে পারে। অভিবাসীদের প্রতি তাদের যে জনসমর্থন আমরা দেখেছি বিগত দিনে সেটি সম্ভব হত না যদি তারা প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র সমর্থক হত। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান ‘ইস লামি রাষ্ট্র’ সমর্থকদের নানাবিধ তত্পরতার কারণে ইউরোপীয়নাদের আবার নতুন করে জাতীয়তাবাদী হয়ে পড়ার দিকে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। সেটি অন্য আলাপ। সংগত কারণেই এখানে আলোচ্য নয়।

 

ভারতবর্ষেও আমরা রাষ্ট্র সরকারহীন সমাজ দেখতে পাই। ভারতবর্ষের মানুষ ‘সরকারকে’ অনুভব করতে পেত না। তারা তাদের জীবনকাল কাটিয়ে দিত গ্রামের নিজস্ব রীতি পদ্ধতিতে। রাজার খাজনা দেয়া ছাড়া তাদের নিয়ে মাথা ব্যথা ছিলো না। সরকার মানে রাজ দরবার। সাধারণ মানুষের জীবন সরকার ও রাষ্ট্রহীন যে গ্রামীণ জীবন সে জীবন আজকের সরকার পুলিশ সেনাবাহনীর কথিত নিরাপত্তার জন্য যে ট্যা্ক্স, নির্বাচন, আইন, আদালত, অধ্যাদেশ দিয়ে চুড়ান্ত রকমের নরক বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সেই নরক থেকে মুক্তি দিতে কখনো আপনাকে কমিউনিস্টরা, কখনো আপনাকে ইস লামী খিলাফতবাদীরা তাদের কল্পিত রাষ্ট্রচিন্তা দিয়ে প্রভাবিত করে। যা আসলে একটি খাঁচা ভেঙ্গে আরেকটি খাঁচায় গিয়ে প্রবেশ করা ছাড়া নতুন কিছু নয়।

 

নোয়াম চমেস্কি তো তাহলে ভালো কথাই বলেন। তাহলে আমি তার এত সমালোচনা করি কেন? এরকম প্রশ্ন এখন উঠবে জানি। চমেস্কিকে সমালোচনার কারণ হচ্ছে, চমেস্কি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে দেখতে পেলেও বিশ্বজুড়ে যে “মুস লিম ভ্রাতৃত্ববাদ” নামের একটি রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা যায় তার বিরোধীতা করেন না। তিনি ইরানের মত ইস লামী বিপ্লবী রাষ্ট্রগুলোর ধ্বংস নিয়ে কথা বলেন না। তিনি ফিলিস্তিনিদের উপর ইজরাইলী আগ্রসান নিয়ে কথা বলেন কিন্তু একজন নৈরাজ্যবাদী হিসেবে ফিলিস্তিনিদের যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন হামাস দেখায় তার বিপদ নিয়ে কেন লেখেন না? অথচ তিনি নৈরাজ্যবাদী! হয়ত লেখেন, যেমন নৈরাজ্যবাদ নিয়ে তার লেখালেখি আছে যেখানে তিনি কমিউনিস্ট ‘লাল দানবের’ ভয় দেখিয়েছেন। সেখানে তিনি প্রচলিত সব বামদের থেকে নিজের অবস্থান যে বিপরীত সেকথা লিখেছেন। কিন্তু সেসব তো সিরিয়াস পাঠকদের জন্য। তিনি যে কোন প্রতিক্রিয়ায় যখন গণমাধ্যমে কথা বলেন তখন এরদোয়ানের বিজয়ে ট্রাম্পের বিজয়ের মত নাখোশ হন না কেন? তাই চমেস্কিকে যতখানি সমালোচনা করেছি সব এইসব একচোখা নীতির কারণে। অরুন্ধতি রায় ও চমেস্কিকে এক জায়গায় রাখছি না। অরুন্ধতী রায় ভারতকে মাওবাদী ভারত বানানোর স্বপ্ন দেখে থাকলে ভারত এখন যা আছে তার বদলে একটি ‘লাল আমলাতন্ত্র’ দিয়ে ধ্বংস করতে চান। কারণ মাও’রা ভারতে একটি ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্র দখলের লড়াই করছে। যেমনটা নকশলরা করেছিলো। নকশালদের এই খুনখারাবী নিয়ে সাহিত্য হয়েছে। সিনেমা হয়েছে। যেখানে তাদের বিপ্লবকে সমর্থন করা হয়েছে। মূলত ভারতবর্ষসহ বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলি অধিকার ভিত্তিক মানব মুক্তির সংগ্রাম হয়েছে তার সবগুলিকে ডুবিয়েছে বামপন্থিরা। তেভাগা আন্দোলন ছিলো কৃষকের ফসলের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার। গ্রামে গ্রামে কৃষক সে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলো। কিন্তু এ আন্দোলনটি বামপন্থিরা পরিচালিত করায় তাদের রাষ্ট্র কায়েমের বিপ্লবের দিবা স্বপ্ন একটি মানব মুক্তির আন্দোলনের অপমৃত্যু ঘটায়। চমেস্কির মত পরবর্তী প্রজন্মের বাম বুদ্ধিজীবী লেলিনকে বলছেন ‘সমাজতন্ত্রে শত্রু’। নকশালরা সফল হলে ভারতে কি কোন অরুন্ধতী রায়ের জন্ম হত যিনি নিজের মতামত স্বাধীনভাবে বই লিখে সকলকে জানাতে পারেন? আপনি কি চীন কিংবা কিউবাতে কোন চিন্তক পাবেন যাদের জন্ম হয়েছে পৃথিবীতে বড় রকমের পরিবর্তনের প্রতিভা নিয়ে? হয়নি কারণ তাদের হতে দেয়া হয় না। কারণ সেখানে স্বাধীন চিন্তার স্বাধীনতা নেই। তাই এসব জায়গায় কত চমেস্কি অরুন্ধতী কারখানায় একঘেয়ে কষ্টকর রুটিন কাজ করে জীবন পার করে দিচ্ছে…।

 

আমি ‘নৈরাজ্যবাদ’ বিশেষজ্ঞ নই। তবে মানুষ ও নিজের মুক্তির জন্য যে আকাঙ্খা করি সেটি রাষ্ট্র সরকার ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। আমি নিশ্চিত যদি আপনি মানবিক একজন মানুষ হোন, যদি সত্যিই ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, বৈষম্যহীন সমাজ চান, তবে আপনিও রাষ্ট্র বিরোধী। আপনি কি চারপাশে সব কিছু দেখে প্রশাসন, সরকার, নেতা, পুলিশ, আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন না? এটাই তো নৈরাজ্যবাদ! আমরা সকলেই যে নৈরাজ্যবাদকে নিজের অজান্তে সমর্থন করি সেটি আমি নিশ্চিত করে বুঝেছি। আমি আসলে যে সমাজে জন্ম নিয়েছি সেখানে জন্ম নিয়ে ধনীদের সঙ্গে নিজ শ্রেণীর বৈষম্য এত বেশি দেখেছি যে তার অবসান চাওয়াটা আমার জন্য সহজাত। এমন কি দরিদ্র শ্রেণীর হকার দোকনদার অটো চালক বাস ড্রাইভারদের হাতে শোষিত হওয়া নিত্যদিনের যে অভিজ্ঞতা সেসব বামপন্থিদের একচোখা ‘প্রলেতারিয়েত বিপ্লবী চিন্তাভাবনা’ দিয়ে ব্যাখ্যা পাবেন না। ফুটপাথে বসা হকার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গড়ে উঠা পেশি শক্তির বলে বলিয়ান। আপনার মত পথিকের অধিকার সে প্রতিদিন পা দিয়ে দলিত করে দম্ভ করে চোখ রাঙ্গায়। এই সমাধান প্রলেতারিয়েতদের রাষ্ট্র কায়েমে হবে কি? নাকি সরকার পুলিশ মাস্তান যে যন্ত্র থেকে জন্ম নেয় সেই সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দিলে মুক্ত সমাজ, সহযোগীতার সমাজ মিলবে? যদিও নৈরাজ্যবাদীদের অতিত রেকর্ডও ভালো নয়। ইউরোপে বহু স্থানে নিজেদের মতবাদ প্রচার করতে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে তারা বিরোধী তা জানান দিতে নানা রকম সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। নৈরাজ্যবাদও একটি ‘বাদ’ বিধায় তার ত্রুটি বিদ্যমান। মানব সমাজ ও তার জীবন, মানুষের মনজগত এত বিচিত্র যে তাকে ধারণ করে সবচেয়ে নিখুঁত কোন ব্যবস্থা আজো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু রাষ্ট্রহীন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র হয়ত মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দিতে সক্ষম। আমি নৈরাজ্যবাদের হয়ে বলার মত যোগ্য ব্যক্তি নেই। কিন্তু সহজ করে যদি আমাকে নৈরাজ্যবাদ বুঝাতে বলেন তাহলে অতিসম্প্রতি সুনামগঞ্জের বাঁধ যখন বন্যার পানিতে ভেঙ্গে শহর তলিয়ে যাবার উপক্রম হলো, যখন সরকারী বাঁধ রক্ষাণাবেক্ষণ কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয় ফাইল চালাচালি করে সময় নষ্ট করছিলো তখন স্থানীয় জনগণ নিজেরাই তাদের শহর সম্পদ রক্ষা করতে নিজেরা প্রচেষ্টায় বাঁধ নির্মাণে হাত দিয়েছিলো। এটাই নৈরাজ্যবাদ। সরকার নয়, বরং জনগণ সবাই মিলে সকলের সমস্যা সমাধান করবে। কাউকে শাসন নয়, নিয়ন্ত্রণ নয়, সবাই মিলে পরিচালনা করবে। যখন বাঁধ মেরামত করতে সরকার ব্যর্থ হয়, কিংবা কারখানায় আগুন লেগে গরীব শ্রমিক মারা যায়, সরকার যখন মালিক পক্ষের পাহারাদারের ভূমিকা নেয় তখন কি আপনি সরকার রাষ্ট্র সম্পর্কে বলে উঠেন না, তাহলে এগুলো থাকার কি দরকার? এটাই নৈরাজ্যবাদ। কমিউনিজম আর নৈরাজ্যবাদকে গুলিয়ে কেউ কেউ এক করে ফেলে। কমিউনিজম বলে সবাইকে সমানভাবে ভাগ করে দিবে। এটা করতে তারা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে দশজন মিলে একটা স্বৈরাচারি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠন করে। নৈরাজ্যবাদ বলে সবাইকে সমানভাবে বন্টন ও সবাই স্বাধীন হবে কিন্তু এটা করতে কোন সরকার পুলিশ সেনাবাহিনী প্রশাসনের দরকার নেই। একটা গ্রাম, একটা নগরের অধিবাসীরা সবাই মিলে তাদের নিজেদের ভালো বা কল্যাণ নিজেরাই ঠিক করবে। নৈরাজ্যবাদ যেরকম সমাজের কথা বলে সেরকম সমাজ ব্যবস্থা পৃথিবীবাসী অতিতে জীবনযাপন করে এসেছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্র নিজে তার প্রয়োজনীয়তা নানাভাবে ব্যাখ্যা করবে এবং রাষ্ট্রে জন্মে সেসব ব্যাখ্যা আমাদের কাছে সহজাত মনে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

 

কিন্তু কি করে সে ‘নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র’ আসবে? ক্ষমতাশালীদের গলা কেটে? নাকি যীশুর মত স্যারেন্ডার করে? দু:খের বিষয় হচ্ছে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন সঠিক পস্থা বের হয়নি। বের হয়নি বলেই যে সত্য মিথ্যে হয়ে যায় তা নয়। সত্যকে জানা গেছে। পথটা অজানা। হিংস্রতা রাহাজানি দিয়ে নয়, রক্তপাতহীনভাবে একদিন রাষ্ট্র সরকার বলতে কিছু থাকবে না সেটা আমি জানি। তখন শুধু মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। সেই দিন নিকটে অথবা বহুদূরে…

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix