নারী ইমামের পেছনে নামাজ অথবা ঋতুমতী নারীর পুজার অধিকার

‘মুসলিম নারী ইমাম’ ও ‘হিন্দু নারী পুরোহিত’ এই দুটি বিষয়কে ধর্মের সংস্কার হিসেবে ধরতে পারেন কিন্তু ধর্মের সংস্কার থেকে কি লাভ হবে? মুসলিম নারীদের জন্য আলাদা মসজিদ এবং সেখানে একজন নারী ইমাম তাদের নামাজ পড়াবেন। মহিলারা নামাজের সময় হলে ঘর থেকে বের হয়ে আসবেন মুসলিম নারীদের পর্দার পোশাক পরে। এই দৃশ্যের মধ্যে আগামীর প্রগতির দিকে এগিয়ে যাবার নির্দশন কোথায়? একজন নারী পুরোহিত তো হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারগুলোকেই পুজাআচ্চা দিয়ে প্রথা পার্বন দিয়ে জিইয়ে রাখবেন। ‘মুসলিম নারী ইমাম’ মহিলাদের ইমাম হতে না পারার ১টা রেওয়াজ ভেঙ্গে ইসলামের ৯৯টি রেওয়াজই তো চর্চা করতে মহিলাদের উদ্বুদ্ধ করবেন তাই না?

সম্প্রতি যে নিউজটা আবার সাড়া ফেলেছে, ঋতুমতী অবস্থায় পুজা করেছে এক হিন্দু মেয়ে। শাস্ত্র মতে এই অবস্থায় নারী অপবিত্র তাই পুজায় সে বসতে পারবে না। কিন্তু সেই বিধান চ্যালেঞ্জ করে পুজায় বসে তার কোন অধিকার প্রতিষ্ঠা হলো? ঋতুমতী অবস্থায় মুসলিম নারীদেরও নামাজ রোজা করতে নিষেধ আছে। কিন্তু সেই রেওয়াজ ভেঙ্গে নামাজ রোজা শুরু করলে মুসলিম নারীদের কি ফলটা মিলবে? ধর্মে নারীদের পুরুষের মত যে যে অধিকার দেয়নি সেগুলোতে নারীরা অংশগ্রহণ করে নারী মুক্তির কোন পথ খুলে যাবে?

বাংলাদেশের একজন নারী কাজি হতে চেয়ে আদালতের রায়ের কারণে হতে পারেনি কারণ সেটা ইসলাম সমর্থন করে না। তখন আদালতের ধর্মকে সাক্ষী রেখে রায় দেয়ার সমালোচনা করেছি। সেটা অন্যদিক। কিন্তু নারী কাজি বিয়ে পড়ানোর সুযোগ পেলে ইসলামের দেনমাহরের মাধ্যমে একজন পুরুষের কেনা দাসী হওয়ার যে আইন তা কি সন্মানজনক হয়ে যাবে?

ডেনমার্কে মারিয়াম মসজিদের ইমাম শিরিন খানকান যখন বিশ্বের প্রথম নারী ইমাম হলেন তখন হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিলো। উদারবাদীরা স্বাগত জানিয়েছিলো এই বলে যে এর মাধ্যমে উগ্র ইসলামের অবসান ঘটবে। আর মূল ইসলামপন্থিরা এটাকে ইহুদীনাসারাদের ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্র বলে অভিহত করেছিলো। কোন সন্দেহ নেই ডেনমার্কের সরকারের একটি ভূমিকা এখানে থাকতে পারে। কারণ তারা বহুদিন ধরে ইসলামের উগ্র চেহারা দ্বারা আক্রান্ত ছিলো। তারা চাইতেই পারে সেরকম কিছু। একইভাবে মুসলিমদের মধ্যে একটা শ্রেণী চাইছিলো ধর্মের মধ্যে থেকে পরিবর্তনের। ডেনমার্কের মহিলা ইমাম শিরিন খানকান গণমাধ্যমে বলেছিলেন, “আমার দৃষ্টিতে এটা শুধু লিঙ্গের ব্যাপার নয়, এটা জ্ঞানের ব্যাপার। যার জ্ঞান আছে, সে ইসলামের বার্তা প্রচার করতে পারবে। নবী মুহাম্মদের (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) সময় তাঁর বাড়ির নামাজ ঘরে কিন্তু মহিলারা ইমাম হিসেবে কাজ করেছেন।”

এই ঘটনার পর বাংলাদেশের ইসলামী ফাউন্টেশন থেকে বলা হয়েছিলো, “কোরান-হাদিসের বিধানমতে এবং চৌদ্দশো বছরের ইসলামিক বিধিবিধান অনুসারে যেভাবে পৃথিবীতে এবাদত বন্দেগী চলছে তাতে নারী সম্প্রদায়ের ইমামতি করার কোনও বিধান নেই।” শিরিন খানকানের ইসলামে নারী ইমামের যে রেফারেন্স দেখিয়েছিলেন তার জবাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলছিলেন “এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভ্রান্তিমূলক কথা। এরকম কিছু মিথ্যা হাদিসের বরাত দিয়ে কেউ কিছু বলে থাকেন, তবে এ বিষয়ে কিছু আমার জানাতে নাই। সাত-আট বছর আগে আমেরিকাতে এক ভদ্রমহিলা এই কাজ করতে চাচ্ছিলেন, বিশ্ববাসী মেনে নেয় নাই”।  (সূত্র: বিবিসি বাংলা, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬)।

মহাপরিচালক সাহেব সঠিক কথাই বলেছেন। এরকম সংস্কার যে ধর্মগুলোতে চালানোর চেষ্টা হয় সেই সম্প্রদায়ের মূল অনুসারীদের ৯৯ ভাগই সেটা মেনে নেয় না। উপরন্তু ইতিহাসে দেখা যায় সংস্কারপন্থিরা কালের স্রোতে মূল ধর্মমতেই বহমান হয়ে যায়। ইংরেজরা ভারতবর্ষে জিহাদী ইসলামের পরিবর্তে ইংরেজি বিজ্ঞান দর্শন পড়ুয়া আধুনিক মুসলমান তৈরি করতে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হতে স্যার সৈয়দকে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু কালের স্রোতে আজ আলীগড় থেকেও খিলাফতী মুসলমানই বের হয়। জামাত ইসলাম কিন্তু কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক মৌলবাদী দল নয়, তারা মূলত আলীয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রিক। মাঝখান থেকে মুসলমানদের সামনে দুরকমের মাদ্রাসার জন্ম হয়েছে- কওমি আর আলীয়া। এই হচ্ছে সংস্কারের ফলাফল!

ঋতুমতী অবস্থায় পুজা করতে পারলে হিন্দু মেয়েদের কি এমন অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে? মহিলারা ‘মহিলা ইমামের’ পেছনে ‘মহিলা মসজিদে’ নামাজ পড়লে কি শরীয়া আইন, খিলাফত, তিন তালাক, চার বউ উঠে যাবে? মানুষ যদি সংস্কারের মাধ্যমে সম্প্রদায়ের পরিচয়েই থেকে যায় তাহলে সমাজ রাষ্ট থেকে কি করে সাম্প্রদায়িকতা উঠে যাবে? ইতিহাসও বলছে ধর্ম সংস্কার হয় না বরং সমস্যা বাড়ায়। তাই ধর্মের বিধান ভেঙ্গে চমক নয়, শাস্ত্রকেই উত্খাত করুন। ধর্ম ফেলে দেয়ার জিনিস, ঘষে মেজে গ্রহণ করার নয়।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix