ধর্মীয় দলিলে মুহাম্মদের নবীত্ব: কে কুরবাণী হয়েছিল, ইসমাইল না ইসহাক?

আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে মক্কার এক সাধারণ যুবক মুহাম্মদ যখন আকস্মিক জনসম্মুখে ইসলাম নামের একটি নতুন ধর্মের ঘোষণা দিলেন তখন সেটি কোন চমকে যাওয়ার মত ঘটনা ছিল না। নবী দেখে দেখে আরবরা এমনিতেই অভ্যস্থ। আরবে তখন প্রচলিত ছিল প্যাগনদের বহু ঈশ্বরবাদী ধর্মের পাশাপাশি একেশ্বরবাদী ইহুদী-খ্রিস্টানসহ আরো কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্ম। মূলত প্রধান দুটি ধারা বহু ঈশ্বরবাদ ও একেশ্বরবাদ। প্যাগনদের ৩৬০ জন দেবতা ছিল যারা পরাক্রমশীল ক্ষমতার অধিকারী। অন্যদিকে ইহুদীদের মুসা ও খ্রিস্টানদের ঈসা নবী। ইহুদী আর খ্রিস্টান পরস্পর জ্ঞাতি। এই দুই ধর্মের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এক ও অভিন্ন। দুজনেরই পূর্বপুরুষ বলে আব্রাহাম নবীকে ধরা হয়। আব্রাহাম নবীর নাম বিলক্ষণ আবদুল মুতালিব শুনে থাকবেন। কেননা প্যাগনদের প্রতিবেশী হিসেবে ইহুদীরা যুগ যুগ ধরে আরবে বসবাস করে আসছে। আবদুল মুতালিব হিশাম বংশের মানিগুণি লোক হিসেবে কাবাঘরের দেখভাল করতেন। ইহুদীরা জানতো প্যাগনদের প্রধান মন্দির হলো এই কাবা। প্রতি বছর বিশেষ একটি দিনে এখানে প্যাগনরা জড়ো হয় পূজা করতে। এই ঘরের চারপাশে এরা সাত বার পাঁক খেয়ে ঘুরে পূন্য অর্জন করে। এটুকু বাদে ইহুদীদের পরদাদাও বোধহয় কোনদিন শুনেনি তাদের নবী আব্রাহাম এই কাবাঘর তৈরি করেছিলেন! ইহুদী-খ্রিস্টান ধর্মের কোন পন্ডিতই কোনদিন কাবাঘরের সঙ্গে তাদের নবীর কোন যোগসূত্রের দাবী করেননি। কাবাঘরের ইনকাম ছিল সে যুগেও ঈর্ষণীয়। কুরাইশদের হিশাম বংশ বেঁচেবর্তে থাকতো এই কাবাঘরের আয়-রোজগারের টাকায়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থে ভাগ বসাবে না ইহুদীরা এটা হতেই পারে না। ব্যবসায়ীক বুদ্ধি ইহুদীদের কোনকালেই কম ছিল না। কিন্তু কাবাঘরের উপর নিজেদের দাবী তো দূরে থাক, পৌত্তলিক আরবদের মন্দির মনে করে একেশ্ববাদী হিসেবে ইহুদী-খ্রিস্টানদের উল্টো কাবাঘর নিয়ে নাক সিঁটকানোরই কথা। কাজেই চল্লিশ বছর বয়েসে মক্কার আবদুল মুতালিবের নাতি, আব্দুল্লাহ পূত্র মুহাম্মদ যখন নতুন ধর্ম ইসলামের ঘোষণা দিলেন তখন কোন সাড়া পড়েনি। তবে তুমুল হাসাহাসি হয়েছিল যখন তিনি আরবদের বললেন, তোমরা হচ্ছো ইহুদীদের নবী ইব্রাহিমের বংশধর! আর ইহুদীরা হেসেই খুন হয়েছিল যখন মুহাম্মদ বলেছিল তিনি তাদের প্রতিশ্রুত শেষ নবী!
সেমিটিক ধর্মের নবী হতে হলে মুহাম্মদকে স্রেফ আবদুল মুতালিবের বংশধর হলে চলবে না। কারণ সেমিটিক ধর্মের শেষ নবী হতে হলে তাকে অবশ্যই নবী বংশে জন্মগ্রহণ করতে হবে কারণ আদি পুস্তকে এরকমই ভবিষ্যত বাণী করা হয়েছে। অবশ্যই তাকে আব্রাহাম নবীর বংশে জন্মগ্রহণ করতে হবে। কারণ ইহুদীদের আদি পুস্তকে আব্রাহামের বংশেই সুসংবাদ পাওয়া কথা বলা হয়েছে। কাজেই নিজেকে নবী বলে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কুরাইশরা কি বললো তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইহুদী-খ্রিস্টানরা কি বলল। তাদের কাছে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে হলে অবশ্যই নবীদের ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখতে হবে। যদি মুহাম্মদ বলেন আল্লার ইচ্ছায় তিনি প্যাগন বংশতেই জন্ম নিয়েছেন, তাহলে উনার নবী দাবীকে কেউ গুরুত্বই দিবে না। প্যাগনদের মধ্যে কোন “নবী” আসে না। যেহেতু মুহাম্মদ একজন “নবী” তাই প্রথমেই তাকে ইহুদীদের কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হয়েছে। তাকে তাই প্রমাণ করতে হবে তিনি আব্রাহামেরই বংশধর।
ইহুদীরা হেসেই খুন! তাদের বক্তব্য- নবী হতে হলে তোমার প্রথম শর্তই হলো, তোমাকে একজন ইহুদীর ঘরে জন্ম নিতে হবে। কারণ নবী আসবে ইহুদীদের মধ্য থেকে। এই পর্যন্ত যত নবী এসেছেন আমাদের মধ্যে তা আব্রাহাম ও তার বংশধর ইসহাক ও ইয়াকুবের বংশ থেকে। তুমি তাহলে কে? ফাঁপর হচ্ছে, মুহাম্মদের পক্ষে কোন মতেই নিজেকে ইসহাকের বংশধর বলে দাবী করা সম্ভব নয়। কারণ হচ্ছে ইব্রাহিমের পুত্র ইসহাক, এই ইসহাকের পুত্র ইয়াকুবের বংশধরদেরকেই ইহুদী বা ইজরাইল জাতি বলা হয়ে থাকে। বাকী থাকে ইব্রাহিমের অন্য পুত্র ইসমাইল। কাজেই ইব্রাহিমের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র স্থাপনে নিজেকে ইসমাইলের বংশধর বলা ছাড়া মুহাম্মদের আর কোন উপায় নেই। আর একটা মিথ্যা বলার জন্য দশটা মিথ্যা বলতে হয়। তাতেও কাজ না হলে লেগে যায় গোঁজামিল। মনে রাখতে হবে মুহাম্মদ নিজেকে নবী বলে দাবী করার পর ইহুদীদের বড় বড় পন্ডিতদের মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছিল। কেমন করে সে নবী হলো তার ইন্টারভিউ তাকে দিতে হয়েছিল। কাজেই ইব্রাহিম নবীর ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে কিছুতে নিজেকে নবী বলে দাবী করা যাবে না। আরো একটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে, ইসলাম প্রচারের শুরুতে নবীজির প্রবল বিশ্বাস ছিল ইহুদীরা তার নতুন ধর্মকে গ্রহণ করবে বা নবী হিসেবে তাকে মেনে নিবে অন্তত নিমরাজি হয়েও। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। মক্কার ১০ বছর সেই চেষ্টা চলে। যদি নবীজি আগাম ধারনা করতে পারতেন যে ইহুদীরা কোনদিন তাকে নবী বলে মানবে না, তাহলে সম্ভবত নিজেকে ইব্রাহিম নবী ও ইসমাইল নবীর সঙ্গে অন্যভাবে যুক্ত করতেন বা আদৌ করতেন না। কিন্তু একবার মুখ দিয়ে কথা বের হয়ে গেলে তা আর ফেরত নেয়া যায় না। তাই একটা মিথ্যাকে ঢাকতে দশটা মিথ্যা এসে হাজির হয়। আচ্ছা, আপনাদের মনে কি কখনো প্রশ্ন জাগেনি কেন মুসলিমরা দাবী করে ইসমাইলকে ইব্রাহিম নবী কুরবানী দিতে চেয়েছিলেন আল্লার ইচ্ছায়? কেন এই একই বিষয়ে ইহুদী-খ্রিস্টানরা বলে থাকেন ইব্রাহিম ইসহাককে কুরবানী দিয়েছিল? তাওরাতের পুরাতন নিয়ম ও নতুন নিয়ম কুরআনের বহু বহু বছর আগে লেখা হয়েছে। যদি ইব্রাহিম ইসমাইলকে কুরবানী দিয়েই থাকে তাহলে ইহুদীদের সেটা পরিবর্তন করার কোন কায়েমী স্বার্থ থাকতে পারে কি? তাওরাতের কোটি কোটি কপি সে সময়ে সমস্ত আরবসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। সেগুলোর এমন একটি কপি পাওয়া যাবে না যেখানে ইসমাইলকে কুরবানী দেয়া হয়েছে বলে কেউ দেখেছে। তাওরাতে পরিস্কারভাবে বলা আছে ইব্রাহিম ইসহাককে কুরবানী দিয়েছিল। তাওরাতে বর্ণনা আছে: “তোমার একমাত্র পূত্র ইসহাককে মোরিয়া দেশে নিয়ে যাও। সেখানে পর্বতগুলোর মধ্যে একটির উপর তাকে আমার উদ্দেশ্যে হোমবলি হিসেবে বলি দাও… (আদি পুস্তক- ২১:২২-২২:১৩)। অথচ কুরআনের কোথাও পরিস্কারভাবে ইসমাইলের নাম উল্লেখ করে বলা হয়নি ইব্রাহিম ইসমাইলকে কুরবানী দিয়েছিল! কেন এই লুকোচুরি? হাদিসেও নাম উল্লেখ নেই ইব্রাহিম ইসমাইলকে কুরবানী দিয়েছিল। কেন এই ছলচাতুরি? মুসলিম বিশ্বে মুখে মুখে প্রচলিত ইব্রাহিম নবী ইসমাইলকে কুরবানী দিয়েছিল, এতে আমরা ধরে নিতে পারি মুহাম্মদ তার অনুসারীদের মৌখিকভাবে সে গল্পই শুনিয়েছিলেন। তাহলে হাদিসে সেটি আসেনি কেন? আমার নিজের ধারণা সেটি পরিকল্পিতভাবেই সরানো হয়েছে কারণ সেটি না করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে! আসুন এবার দেখি সেই থলের বিড়ালটি কোথায় লুকিয়ে আছে। ইসমাইলকে কুরবানী দেয়া যে ইব্রাহিমের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয় তা কুরআন-হাদিসের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করি।
কুরবানী নিয়ে কুরআনে সুরা আস সাফাতের মাধ্যমে যা জানতে পারি সেখানে কোথাও ইসমাইল বা ইসহাক কারুর নামই নেই। সেখানে কারুর নাম উল্লেখ না করে বলা হয়েছে ইব্রাহিমকে আল্লাহ পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। অতপর সেই ছেলেটি যখন “হাঁটাচলা করার বয়েসে উপনিত হলো” তখন তাকে ইব্রাহিম বলি দেয়ার জন্য মনস্থির করলেন। আয়াত-১০২। খেয়াল রাখুন কুরআন বলছে যখন ছেলেটি “হাঁটাচলা করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলো” তখন ইব্রাহিম তাকে কুরবানী দিতে মনস্থির করলেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এই তথ্যটি মাথায় রেখে এবার আসুন ঘুরে আসি ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী সারাহ্ ও ইব্রাহিমের রক্ষিতা হাজেরার কাহিনী থেকে। সেখানেই আমাদের কাছে কাকে কুরবানী দেয়া হয়েছিল সেটি একদম পরিস্কার হয়ে যাবে।
সারাহ্ হচ্ছে ইব্রাহিমের বিবাহিত স্ত্রী। ইব্রাহিম সারহকে বিয়ে করেছিলেন এই শর্তে যে, ইব্রাহিম তাকে কখনো ত্যাগ করবে না। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা- ৩৪৩)। সুহায়লী (র:) কুতায়বি ও নফফাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, সারাহ্ ইব্রাহিমের আপন ভাই হারানের কন্যা! অর্থ্যাৎ ইব্রাহিম ভাতিজি বিবাহ করেছেন। তখন নাকি ভাতিজি বিবাহ বৈধ ছিল! (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা- ৩৪৩)। কিছু ইসলামী পন্ডিত আবার এ মতের বিরুদ্ধচারণ করেছেন, তারা বলেছেন, এটা সঠিক নয়, কারণ এতে নবী চরিত্রে কালিমা লেগে যায়। আশ্চর্য তারা কি নবী মুহাম্মদের পুত্রবধুকে বিবাহ ও নিজের কন্যা ফাতিমাকে চাচা আলীর কাছে বিয়ে দেয়ার ঘটনাগুলো দেখেন না? এগুলো কোন কালিমা লেপন করেনি ইসলামের নবীর উপর? …যাই হোক, সারাহকে নিয়ে ইব্রাহিম যখন হিযরতের পথে তখন পথের মধ্যে যে রাজ্যটি পড়ে সেখানকার বাদশার কানে সংবাদ পৌঁছায় এক অপরূপা সুন্দরীকে দেখা যাচ্ছে এক বিদেশীর সঙ্গে। বাদশার লোকজন এসে পথরোধ করে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার সঙ্গের এই নারী কে? ইব্রাহিম উত্তর করেন- ইনি আমার বোন…।(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা- ৩৪৪)। কেন নিজের স্ত্রীকে বোন পরিচয় দেয়া হলো তা আমি কোন ইসলামী বইতেই খুঁজে পাইনি। কি অর্থ থাকতে পারে ইব্রাহিমের এই মিথ্যাচারের? এটি নাকি ইব্রাহিমের জীবনে তিনটি মিথ্যাচারের মধ্যে একটি। তার মানে এরকম মিথ্যা বলার যথেষ্ঠ কারণ ছিল। এমন যদি হয় বোন পরিচয় দিলে ইব্রাহিম অযাচিত ঝামেলা থেকে রেহাই পাবে- তাহলে এটা যথেষ্ঠ যুক্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু আমরা দেখি সারাহকে বোন বলার পর বাদশা তার দরবারে সারাহকে আমন্ত্রণ জানান! ইব্রাহিম কিন্তু পথেই থেকে যান। তিনি নাকি তখন নামাজ (!) পড়তে থাকেন স্ত্রীর যেন কোন ক্ষতি না হয়। ইব্রাহিম যদি বলতো এটা তার স্ত্রী- তাহলে কি কোন ভিন্ন কিছু হতো? যেহেতু মিথ্যা বলার কোন হেতু কোন কিতাবেই বলা নেই তাহলে এখানে ইব্রাহিমকে আমার কি ভাবতে পারি? সারাহকে নিজের বোন বললে তাকে কুমারী বুঝায়। কারণ আমরা দেখতে পাই বাদশা সারাহকে তার হেরেমে স্থান দেন। কিন্তু তার গায়ে হাত দিতে গেলে আল্লাহ তাকে (বাদশাকে) গজব দান করেন। এভাবে তিনবার গজব হওয়ার পর বাদশা সারাহকে আল্লার কাছে তার জন্য দুআ করতে বলেন। সারাহ দুআ করাতে বাদশা মুক্তি লাভ করেন। বিনিময়ে বাদশাহ সারাহকে হাজেরা নামের এক দাসী উপহার দেন। আমাদের মত মনে যাদের পাপ, তারা কিন্তু গল্পে বিশ্রী কিছুর ইঙ্গিত দেখতে পায়। কারণ ইসলামী গ্রন্থগুলোতেই দেখা যাচ্ছে সারাহকে নিয়ে ইব্রাহিম যখন পরে সে স্থান ত্যাগ করেন তখন বহু পণ্যসামগ্রী, মালসামান, ভেড়া-ছাগলের পাল, দাসীবাদী (হাজেরা সহ) তাদের সঙ্গে ছিল। এত সব উপঢৌকন বাদশা দিয়েছিল? কিসের তুষ্টিতে?
তারপর দীর্ঘকাল কেটে যায়। সারাহ’র কোন সন্তান হয় না। আল্লাহ ইব্রাহিমকে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও ইব্রাহিম পুত্র সন্তানের মুখ দেখতে পান না। সারাহ্ একদিন ইব্রাহিমকে বললেন, যেহেতু আমি সন্তান ধারন করতে পারছি না সেহেতু তুমি হাজেরার সঙ্গে ইয়ে করে সন্তান লাভ করো। সারাহ্ খুশি মনেই হাজেরাকে স্বামীর শয়ন ঘরে পাঠিয়ে দেন।( দেখুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা- ৩৪৮)। হাজেরা প্রকৃতির নিয়ম মেনে যথা সময়ে সন্তান ধারন করে সন্তান ভূমিষ্ঠও করেন। এই সন্তানের নামই রাখা হয় ইসমাইল। সন্তান গর্বে হাজেরার মনে এক সময় অহংকার চলে আসে। একসময় মনিবা সারাহ’র উপর নিজের স্থানও ভাবতে শুরু করে দেন। কিন্তু হাজেরা এক দাসী বৈ কিছু নয়। তার সন্তানও ইব্রাহিমের উত্তোরাধিকারী নয়। সারাহ ঈর্ষাণীত হয়ে হাজেরাকে তাড়িয়ে দেয়ার কথা বলেন স্বামীকে। ইব্রাহিম বলেন, তুমি হাজেরা সম্পর্কে যা সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই করা হবে। ইব্রাহিম এরপর হাজেরা ও তার সদ্য জন্মানো শিশু ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে বের হন। বহুদূর এক নির্জন মরুভূমিতে গিয়ে হাজেরাকে একটা পাথরের উপর বসিয়ে রেখে তিনি ফিরে চলে আসেন। শিশুটি তখন হাজেরার স্তন পান করছিলো। (দেখুন ইবনে আব্বাস বর্নিত, সহী বুখারী, বই-৫৫, হাদিস নং-৫৮৪ ও আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা- ৩৪৯-৩৫০)। ইব্রাহিম বিড়াল খেদানোর মত করে তার এক সময়ের ফূর্তির মেয়েমানুষকে এবং তার ফসল নিস্পাপ শিশু ইসমাইলকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ফেলে যখন পাল্লাচ্ছেন তখন ভীত হাজেরা ইব্রাহিমের জামা খামচে ধরে কাকুতি-মিনতি করে বলছেন, ইব্রাহিম আপনি এখানে আমাদের ফেলে পালাচ্ছেন কেন? এই নির্জন মরুভূমিতে আমরা কি খেয়ে বাঁচবো! আমাদের এখানে ফেলে যাবেন না! ইব্রাহিম, দয়া করুন!…। কিন্তু ইব্রাহিম এক দাসীর জন্য ও তার একরাতের ফূর্তির সন্তানের জন্য দয়া দেখাতে আসেননি। ইব্রাহিম যখন কোন জবাব না দিয়ে হাজেরাকে অগ্রাহ্য করে চলে যাচ্ছেন তখন হাজেরা শেষবারের মত ইব্রাহিমকে জিঞ্জেস করেন, ইব্রাহিম এটা কি আল্লাহ’র ইচ্ছা? ইব্রাহিম জবাব করেন- হ্যাঁ। হাজেরা নম্রভাবে উত্তর করেন, তাহলে আর ভয় নেই। তিনি আমাদের ধ্বংস করবেন না।( পড়ুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’র ইসমাইল (আ:) ও হাজেরাকে নিয়ে ইব্রাহিম (আ:)-এর ফারান পর্বতমালা তথা মক্কাভূমিতে হিযরত ও কাবাঘর নির্মাণ চ্যাপ্টার, পৃষ্ঠা- ৩৫০)। ভাবুন একবার কি অবলীলায় ইব্রাহিম আল্লার নামে হাজেরাকে মিথ্যা কথা বলে ফেলেন! মরুভূমিতে রেখে আসার কথা আল্লাহ ইব্রাহিমকে কখন বললেন? একটি অবলা নারী ও অসহায় শিশুকে নির্জন তপ্ত মরুভূমিতে ফেলে আসা একজন নবীর পক্ষে কতটুকু মানান সই? যাই হোক, এই প্রসঙ্গে একটি কথা না বললেই নয়, নবী মুহাম্মদ নিজেকে ইসমাইলের বংশধর বলে যে প্রমাণ দাখিল করেছেন এই বলে যে, ইব্রাহিম ইসমাইল ও তার মাকে যে মরুভূমিতে ছেড়ে আসেন এটাই হচ্ছে এই মক্কা। এখানেই ইসমাইল পরে বিয়েশাদি করে বংশ বিস্তার করে আরব জাতির জন্ম দেন। নবীজির এই দাবী আসলে বিশ্বাস করা খুব কঠিন। বাস্তবতা নবীজির পক্ষে কথা বলে না। কারণ মক্কা থেকে যেরুজালেমের উড্ডয়ন দুরত্ব প্রায় ১৩৫০ কি মি:। সেই যুগে গাধা বা ঘোড়ায় চড়েও দুর্গম মরুভূমিতে সদ্য মাতৃ স্তন্য পান করা একটি শিশুকে নিয়ে পাড়ি দেয়া একেবারেই অসম্ভব। তাওরাত বলে ইব্রাহিম তাদের মিশরের আশেপাশে কোথাও নির্বাসন দিয়েছিল। বাস্তবতা হচ্ছে ইব্রাহিমের পক্ষে কোনভাবেই তার বসবাসের জায়গা থেকে খুব বেশিদূরে গিয়ে হাজেরা ও তার শিশুকে নির্বাসন দেয়া সম্ভব নয়। কাজেই আরব কুরাইশ জাতিকে ইসলাইলের বংশধর বলে দাবী করা কষ্ট কল্পনা মাত্র। যাই হোক, এবার অন্তিমে চলে আসি। দেখি কুরআন-হাদিসে কুরবানী নিয়ে কি বলা হয়েছে। তার আগে শিশু ইসমাইলকে নির্বাসন দেয়ার পর ফের তার সঙ্গে ইব্রাহিমের সাক্ষাৎ-এর সময়টা ইসলামী দলিল থেকে জেনে নেই। ইব্রাহিম হাজেরাকে তার শিশু পুত্র সমেত ফেলে আসার পর আর যে তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ ছিল না সেটা ইসলামও স্বীকার করছে। এই হাদিসে ইবনে আব্বাস বলেন, অত:পর নির্বাসিত পরিজনের কথা ইব্রাহীম এর মনে উদয় হইল। তিনি তাহার স্ত্রী সারাহ কে বলিলেন, আমি আমার নির্বাসিত পরিজনের কথা জানিতে চাই। ইবনে আব্বাস বলেন, অত:পর ইব্রাহীম তাহাদের নিকট আসিলেন এবং সালাম দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করিলেন- ইসমাইল কোথায় ?ইসমাইলের স্ত্রী বলিল- তিনি শিকারে গিয়াছেন।- সহী বুখারী, বই-৫৫, হাদিস নং-৫৮৪। এর মানে হচ্ছে ইসমাইল তখন বিয়েশাদি করা প্রাপ্ত বয়স্ক এক মানুষ। এর আগে যে ইসমাইলের সঙ্গে ইব্রাহিমের দেখা হয়নি সেটা তো হাদিস পড়লেই বুঝা যাচ্ছে। এবার কুরবাণী বিষয়ে কুরআন কি বলছে দেখেন, হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর- ১০০। / সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম- ১০১। / অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখিযে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ। সে বললঃ পিতাঃ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন- ১০২। অথচ ইসমাইল যখন তার মায়ের স্তন পান করে তখনই তাদেরকে মরুভূমিতে নির্বাসন দেয়া হয়েছে যা হাদিস ও সিরাত সাক্ষ্য দিচ্ছে। কুরআন কিন্তু হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলের নির্বাসনের কাহিনী বর্ণনা করেছে। সেই সঙ্গে কুরবানী কথায় বলছে “শিশুটি যখন হাঁটাচলার বয়সে উপনীত হয়েছে” তখন ইব্রাহিম তাকে কুরবানীর জন্য মনস্থির করলেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই শিশু? ইসমাইলের সঙ্গে তো ইব্রাহিমের দেখা হয়েছে যখন সে বিয়ে করে সংসারী মানুষ। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে বিস্তারিত বর্ণনা আছে এই বিষয়ে। সেখানে পরিস্কার বলা হয়েছে শিশু অবস্থায় ইসমাইল ও তার মাকে ফেলে আসার পর ফের পিতা-পুত্রের দেখা হয় যখন ইসমাইল পূর্ণ বয়স্ক বিবাহিত যুবক। তাহলে “শিশু হাঁটাচলার বয়েসে উপনীত হওয়ার পর” যাকে কুরআনী দেয়া হয়েছিল সে কে? ইহুদী-খ্রিস্টান ও মুসলিম বিশ্বাস মতে ইব্রাহিমের দুই পুত্র ইসমাইল ও ইসহাক। ইব্রাহিমের আর কোন পুত্রের কথা জানা যায় না। আপনার যদি ইসহাককে কুরবানী দেয়া হয়েছিল তাওরাতের এই দাবীকে মানতে আপত্তি থাকে তো আপনিই বলুন কুরআন-হাদিসের বর্ণনা অনুসারী আপনার কাকে মনে হচ্ছে ইব্রাহিম কুরবানী দিয়েছিল? জেনেসিস, অধ্যায় :২২, বাক্য : ০১- ১৩-তে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। সেখানে স্পষ্ট করে ইসহাকের নাম বলা আছে। কুরআনে কারুর নাম বলা নেই। এমন না যে কুরআনে ইসমাইলের নাম কোথাও নেই। ইসমাইলের নাম একাধিক বার আছে। শুধু নেই জায়গা মতই। কেন এই ঘোলাটে করে রাখার চেষ্টা? কারণ ইসমাইল ও তার মাকে নির্বাসন দান ও ফের তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প বলে কাবাঘরের ভিত্তি তৈরি দাবী করা, ইসমাইলের বংশধর বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে এদিকে ইসমাইলের কুরবানীর বয়স যে বেড়ে যায় কথা বোধহয় মনে পড়েনি! ইহুদীদের খুশি করার জন্য তাদের প্রতি গদগদ হয়ে বলার সময়ও কি খেয়াল ছিল না এসব ইসমাইলকে গুরুত্বহীন করে দেয়?- “আমি ইব্রাহিমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুব এবং বশংধরের জন্য স্থির করলাম নবুয়ত ও কিতাব এবং তাকে আমি দুনিয়াতেই পুরুষ্কৃত করেছিলাম। আখিরাতেও সে সৎ কর্মকারীদের অন্যতম হবে…। (সুরা আনকাবূত ২৬-২৭)। শেষ কথা, কুরআন সংকল্পন হয় নবীজির মৃত্যুর অনেক পরে ওসমানের জমানায়। সে-সময়ই কুরআনের মধ্যে যথাসাধ্য অসংগতি দূর করা হয়। তবু বিষগিট্টু কিছু যে থাকে যাবে তা তো বলাই বাহুল্য! ইসমাইল ইসহাক হচ্ছে ইসলামের সেই বিষগিট্টু! …
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix