জিজ্ঞাসিত বাঙালী মুসলমান: ‘তমদ্দুন মজলিশ’ কেন বিজেপি আরএসএস নয়?

‘তমদ্দুন মজলিশ’-কে বুঝলে বাঙালী মুসলমানের প্রগতিশীলতার ছদ্মবেশকে বুঝতে পারবেন। খুব স্পষ্ট করে বুঝতে পারবেন এখন যারা ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের তীব্র ঘৃণা করছে তারা নিজেরা কতখানি ‘মুসলিমবাদী’! ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পর পাকিস্তানের বাঙালী মুসলমান যেন ‘ইসলামী আদর্শ ও ভাবধারায়’ প্রকৃত মুসলমান হতে পারে সেই লক্ষ্যে ‘তমদ্দুন মজলিশ’ সংগঠনটি গঠন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম। চিন্তা করুন পদার্থ বিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক মানুষকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে তৈরি করতে সামাজিক উদ্যোগ নিলেন! শুনলে আশ্চর্য হবেন উনারা কেউ কিন্তু মৌলবাদী টাইপ মুসলমান ছিলেন না। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিলো মুসলমানরা বামপন্থি ঘেঁষা বেশ আধুনিক মুসলমান হয়ে উঠুক! তারা চেয়েছিলো পাকিস্তানে ‘ইসলামিক সমাজতন্ত্র’ গড়ে উঠুক। এখনকার ধাড়ী বামপন্থি বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দিন উমার সেই সংগঠনে যুক্ত ছিলো। হিসাব করুন, একদা ‘ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নকারী’ বুদ্ধিজীবীরা এ কারণেই বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনকে এখন অবলীলায় বলে ফেলেন এগুলো ওপারের বিজেপিকে সুবিধা করে দেয়ার জন্য করা হচ্ছে। হিন্দুরা নয়, মুসলমানরাই বেশি নির্যাতিত।…

 

তমদ্দুন মজলিশ পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিলো। এটা থেকেও একটা জিনিস প্রমাণিত হয় ভাষা আন্দোলনকে যারা একটা প্রগতিশীল মুভমেন্ট দেখিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রমাণ করতে চান তারা সত্য বলেন না। কারণ আমরা ছয় দফাতেও কোন রকম অসাম্প্রদায়িক দেশ চেতনার কথা দেখি না। এমনকি ৫৪ সালের যুক্তফন্ট তাদের নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলো তারা ক্ষমতায় গিয়ে কুরআন সুন্না বিরোধী কোন আইন করবে না। কারণ আইউব খান তখন মুসলিম নারীদের বিয়ে তালাক ও সম্পত্তির অধিকার কাগজে কলমে নিয়ে এসেছিলেন যা ছিলো ইসলামী আইনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এসবের জন্য ক্ষিপ্ত ছিলো আলেম ওলামারা। সেই লক্ষ্যে সদ্য জন্ম নেয়া ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’, শেরে বাংলার ‘কৃষক প্রজা লীগ’ জনগণের মনোভাব বুঝতে পেরে বলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে কুরআন সুন্না বিরোধী কোন আইন করবেন না। তাহলে কি করে বলা সম্ভব এইসব দলগুলো মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশকে প্রগতিশীল সেক্যুলার অসাম্প্রদায়িক করার ওয়াদা করেছিলেন? এরকম কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে?

 

‘তমদ্দুন মজলিশ’ এর উদ্দেশ্য বা আদর্শ আরএসএস বা বিজেপি থেকে কোনভাবেই ভিন্ন নয়। অথচ এই সংগঠনের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তারা কখনই বিজেপি আরএসএস বা হিন্দু মহাসভার নেতাদের মত এদেশে ঘৃণ্যিত হন না। কেন? কাজি মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদদের কি হিন্দুত্ববাদী বুদ্ধিজীবী নেতাদের মত সাম্প্রদায়িক হিসেবে বিবেচনা করা হয়? উল্টো তাদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে এদেশে বিবেচনা করা হয়। ভারতের প্রগতিশীলরা হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে মহত কোন আন্দোলনেও সমহত হওয়া দূরে থাক তাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে চা খেতেও যেখানে রাজি হবে না সেখানে ১৯৪৭ সালে তমদ্দুন মজলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্ব দিয়েছে! ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ এর প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশের সভাপতিত্বই করেন তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাশেম! এই মুসলিমবাদীদের নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে সমাবেশে যোগদান করেন মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রহমান, কল্যাণ দাসগুপ্ত, এ.কে.এম. আহসান এস.আহমেদ এবং ডাকসুর তৎকালীন সভাপতি ফরিদ আহমেদ!

 

অনেকেই ষাটের দশককে প্রগতিশীল মুভমেন্ট হিসেবে দেখাতে চাইবেন। আমি তার সঙ্গে একমত। কিন্তু এই মুভমেন্ট সরাসরি ‘বাঙালী মুসলমানের নিজস্বতা’ জাতীয় আন্দোলনের বিপরীত চিত্র ছিলো। আহমদ ছফারা পরবর্তী দশকে ‘বাঙালী মুসলমানের নিজস্বতা’ আন্দোলন ব্যাপকভাবে শুরু করেছিলেন। ষাটের দশকের সংস্কৃতি আন্দোলনের ফলে শিক্ষিত বাঙালী মুসলমানদের ছেলেমেয়েদের নাম বাংলায় রাখার চল শুরু হয়েছিলো। অথচ ‘বাঙালী মুসলমান’ এই পরিচয়কে সাতন্ত্র রাখতেই আহমদ ছফাদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো। তারও আগে হিন্দুদের মত নাম, পোশাক, উত্সব থেকে বেরিয়ে আসতেই ওহাবী আন্দোলন শুরু হয়েছিলো। সেটাকেই বলা যেতে পারে প্রফেসার রাজ্জাক-ছফাদের ‘বাঙালী মুসলমান’ জাতি সত্ত্বার সূচনা। তিতুমীর যা চেয়েছিলেন সেরকম আদর্শ ইসলামিক রাষ্ট্রই তমদ্দুন মজলিশ চেয়েছিলো। তবু এখানে কঠরভাবে মুসলিমবাদী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মত সমালোচিত হয়নি। শ্যামাপ্রসাদ যেখানে ভারতীয় সেক্যুলারদের হাতে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে সমালোচিত হন সেরকম কি এখানে ভাষানী শেরেবাংলা সরওয়ার্দী কখনো হন? ডক্টর আহমদ শরীফ একটা লেখায় ‘শিথা গোষ্ঠি’-কে বলেছিলেন তারা প্রগতিশীল ছিলো না। তারা মুসলমানই ছিলো, মুসলমানদের ভালো চাইত। আমিও সেটাই বলি। এখানে মুসলিমবাদই চলছিলো, চলছে। হিন্দুত্ববাদের মতই তারা সব কিছুকে মুসলমান বানাতে চায়। তারাই আবার নরেন্দ্র মোদির খুব নিন্দে করে!

 

১৯৪৭ সাল থেকে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে যত মত পথের মানুষ আছেন তারা সকলেই ‘মুসলিমবাদী’। এখানে বাম ডান লীগ সব একাকার। তবু সকলেই তীব্র হিন্দুত্ববাদ বিরোধী! অথচ দেখুন, ভারতের প্রগতিশীলরা প্রকৃতভাবেই হিন্দুত্ববাদ বিরোধী অসাম্প্রদায়িক শক্তি। তারা নিজেদের পরিচয় ‘হিন্দু’ সম্প্রদায় হিসেবে দেয় না। তারা কখনো ‘তমদ্দুন মজলিশ’ গঠন করেননি ‘হিন্দু আদর্শ’ বাস্তবায়নে। এসব গঠন করে বিজেপি আরএসএস। তাই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিজীবীরাই হিন্দুত্ববাদীদের উল্টো পিঠ! এদের আসল চেহারা এভাবে যারা বের করে দেখায় তাদেরকে তাই জোর করে বিজেপি আরএসএসের এজেন্ট বানাতে হয়! না হলে ইজ্জত প্লাস্টিক হয়ে যায় যে!

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix