জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ

আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষের দিকে যদি তাকাই তাহলে বিতৃষ্ণায় মুখটায় ফিরিয়ে নিতে হয়। এদিকে আওয়ামী লীগ এখন ডানপিন্থর দিকে ঝুঁকে পড়া একটি জাতীয়তাবাদী দল। যে জাতীয়তাবাদ ‘বাঙালী মুসলমান’ জাতীয়তাবাদ। এখানে লিবারাল ধর্মনিরেপক্ষ যারা আছেন তারাও মূলত বাঙালী মুসলমান হিসেবে একটা সাতন্ত্রতা অনুভব করেন। এন্টি আওয়ামী লীগ বলতে যে ভোট ও রাজনৈতিক অপজিশন আছে তাদের পরিচয়টি নিয়েই মূলত এই আলোচনা। তারা কারা? ৯০ দশক পর্যন্ত ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ ও ‘স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি’ বলতে দুটো শক্তি বুঝাতো। বুদ্ধিজীবী বলতে প্রগতিশীল যারা সেক্যুলার গণতন্ত্রপন্থি তারা, এর বিপরীতে ইনকিলাব, সংগ্রাম পত্রিকা কেন্দ্রিক জামাত শিবির বেসিক ছোট পরিসরের সাংবাদিক কবি সাহিত্যিক শ্রেণী। কবি আল মুজাহিদ, আল মাহমুদ এরকম কিছু নাম বিপুল বিশাল সেক্যুলারদের স্রোতে ভেসে যেতো তারা। কবি তাত্ত্বিক বাম ফরহাদ মজহারও তখন সেক্যুলার প্রগতিশীল বলয়ের লোক ছিলেন। এখন বিএনপি জামাত হেফাজতের বুদ্ধিজীবী আসিফ নজরুলও ছিলো তখন তরুণ প্রগতিশীল সেক্যুলার শিবিরের মানুষ!

৯০ দশক শেষ হতে একটা পরির্তন দেখা গেলো। মধ্যাপাচ্যে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ শ্রমিক কাজ করার ফলে সেখানকার ইসলামিক প্রভাব বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে চলে আসছিলো। শ্রমজীবীরা তাদের পরিবারগুলোকে প্রভাবিত করেছিলো দেশে ফিরে এসে। অপরদিকে ধনী প্রবাসীদের টাকায় মাদ্রাসার বাম্পার ফলন ঘটে। আর সেখান থেকে বের হতে থাকে বিপুল সংখ্যক আলেম। তাদের কাজ দিতে আরো মসজিদ মাদ্রাসার পরিমাণ বাড়তে থাকে। গ্রামীণ সমাজের গান পালা যাত্রা মেলা বাউল ইত্যাদি ঐতিহ্যের উপর আলেমদের হস্তক্ষেপ সহজ হয়ে পড়ে কারণ শ্রমজীবীদের পরিবর্তন ঘটেছিলো সৌদি গমনের ফলে এবং তাদের হাত ধরে পরিবারগুলোতে।

৯০-এর পর বিএনপি ইসলাম ও মুসলমানের কার্ড খেলে বিজয়ী হবার পর আওয়ামী লীগ নিজেকে ইসলাম ও মুসলিম দল প্রমাণ করতে কেন্দ্রিয়ভাবে নিজেকে পরিবর্তন শুরু করে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গিয়ে বামদের হয় পার্টি বদল নয়ত আত্মহত্যা করা ছাড়া কোন বিকল্প ছিলো না। এ সময় বহু পুরোনো ত্যাগী বাম আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ দেয়। বাকী বামদের কোন উপায় ছিলো না নিজেদের বিশ্বাসের ঘরে চুরি করা ছাড়া। এতদিন যে বিশ্বাসকে ভর করে জীবন পার করেছেন আজ তাকে মিথ্যা বলে স্বীকার করা চাট্টিখানি কথা নয়। তখনই বামদের মনে হতে থাকে তাদেরকে এদেশের পরিবর্তিত জনসমাজের পালস ধরে এগুতে হতে। কমরেডরা মসজিদে যাতায়াত শুরু করলেন। আলহাজ হতে শুরু করলেন। ভাষানীর মত ইসলাম ও কমিউনিজম নিয়ে দ্বিচারিতার উদাহরণ যেহেতু ছিলো তাদের আত্মগ্লাণী তেমন হলো না। ইসলামী মৌলবাদ এমনভাবে বাংলাদেশের আমজনতায় মিশে গেছে বামরা সেটাকে উচ্ছেদ নয় বরং আলিঙ্গন করে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি আসার স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে। কাজেই নাস্তিক সেক্যুলার প্রগতিশীলতার সঙ্গে বামপন্থিদের বিরোধ শুরু হলো। ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ এই অস্ত্র প্রয়োগ শুরু হলো যারা মৌলবাদ বিরোধীতাকে লেখায় চিন্তায় তুলে ধরতে চায়। ইন্টারনেট একটি বড় পরিবর্তন এনেছিলো বুদ্ধিভিত্তিক লেখালেখি ও চিন্তা প্রকাশে। সেখানে দেখা গেলো সেক্যুলার, নাস্তিক, প্রগতিশীলদের সঙ্গে তিনটি শক্তির বিরোধ তৈরি হয়ে গেলো। আওয়ামী লীগ, বামপন্থি ও বিএনপি-জামাত কওমি কেন্দ্রিক শিবিরের সঙ্গে।

বুদ্ধিভিত্তিক লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের লড়াই দৃশ্যমান বেশি এবং সেটাই দিনশেষে রাষ্ট্র সমাজে প্রতিফলন ঘটে। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামাত যারা তারা মার্কামারা ডানপন্থি শক্তি। কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে বামপন্থিরা এখন কি রকম? ‘জান জবানের আজাদী’ এই শব্দগুলো দিয়ে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। বামরা এখন প্রকাশ্যে বলে তারা তাদের রাজনীতিকে এখন এদেশের মানুষের ‘ধর্ম, বিশ্বাস, আচার, ভাষা, রীতি, পোশাক, সংস্কৃতিকে’ কেন্দ্র করে পরিচালিত করছে। এখানে স্পষ্টত তারা প্রগতিশীলতা ত্যাগ করে এদেশের মানুষের ধর্মান্ধতা, আরবী সংস্কতিকরণ (৯০ দশকে যা শ্রমিকদের মাধ্যমে সৌদি আরব থেকে আমদানি ঘটেছিলো), বোরখা হিজাব পোশাক, এবং ভাষা- যা কায়কোবাদ, গোলাম মস্তফা, ফরুক আহমদের হাতে বাংলা ভাষায় জোরজবদস্তিতে যে আরবী উর্দুর উপনিবেশ চেষ্টা হয়েছিলো তাকে সমর্থন করে জনগণের কাছাকাছি যাওয়া। এসব করতে গিয়ে নিজেদের সম্পর্কে অতিতের নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতার ‘অপবাদ’ ঘোচাতে তারা বর্তমানে জামাত শিবিরের মতই এন্টি নাস্তিক! তাদের মুখে এখন যতবার ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ কথাটা চলে আসে ততবার একজন ইসলামপন্থির মুখেও আসে না। একটা বড় সমিকরণের মুখে তাই বাংলাদেশ। ছাত্রনেতা ভিপি নূর, জোনায়েদ সাকি, বিএনপি জামাত, বামপন্থিরা, মাদ্রাসার আলেম ওলামাদের সঙ্গে লেখাপড়া জানা একদা প্রগতিশীলতার জয়গান করা পরিবর্তিত পল্টি খাওয়া আদর্শচূত্য লোকজন। ছফা, প্রেফেসর রাজ্জাকদের মুসলিম বাংলার স্বপ্ন এখন এদের হাতে। এটা ইসলামপন্থিদের উত্থান কিংবা ব্রাদারহুডের উত্থান নয়। এটা ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের’ উত্থান। আওয়ামী লীগ ‘বাঙালী মুসলমান জাতীয়তাবাদী’ ডানপন্থি শক্তি ধারণ করেছে। এখানে টিকে থাকতে লীগকে সামনে মৌলবাদের এত কাছাকাছি যেতে হবে যে মৌলবাদে বিলিন হবার আশংকা অনেকখানি। এ জন্যই শিরোনামটা করা হয়েছে ‘জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’।

তাহলে পরিনাম কি হতে যাচ্ছে? সমাধানিই বা কি? এমন হতে পারে পাবলিক ইসলামী শাসন চাইলে সেটাই হবে। কিন্তু লীগ মনে করতে পারে সেটা আমাদের নেতৃত্বেই হতে হবে। বামরাও মনে করতে পারে ক্ষতি কি ইসলামী শাসনে? ‘হকের শাসন’ কায়েম করা তো কমিউনিজমেরই রাজনীতি! এই লড়াই পতন হবে কোন একটি শক্তির। তখন ফান্ডামেন্টালিস্ট ইসলামপন্থিদের সঙ্গে টিকে থাকা ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী লীগ/বাম তাদের সঙ্গে ফাইট। তখন প্রগতিশীলতা নয়, সঠিক ইসলাম অনুসারী কে তার লড়াই। এখানেই বাংলাদেশের শেষ দেথতে পাই। তাহলে সমাধান কি?

ইসলাম মানুষের বানানো একটি মতবাদ তাই এটি আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বিলিন হয়ে যাবে। ভাষা, সংস্কতি, পোশাক, খাদ্যভাস, ধর্ম, আচার আচরণ এগুলো ক্রমশ পরিবর্তনশীল। তাই ‘জান জবানের’ গান দুদিন পরেই হারিয়ে যাবে। মানুষকে নিজের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, রাজনীতির কারণেই সেক্যুলার হতে হবে। নিজের জন্যই গণতান্ত্রিক হতে হবে। কাজেই এই পৃথিবীটা একদিন ‘বাউলের হবে’ এটা শাহ আবদুল করিমের মিথ্যে প্রবোধ নয়। ‘বাউল’ যদি একটি সিম্বল হয় তাহলে সেখানে যে উদারত বিশালতা এবং জাতি ধর্ম বর্ণ শ্রেণীহীন জনমানসের যে স্থান সেটা তো সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সমাজের কথাই বলে। তাই পরিশেষে কিন্তু আশাবাদই দেখতে পাই…।

তার মানে নো চিন্তা ডু ফুর্তি? এতখানি আশাবাদী হওয়াও মনে হয় বেহিসেবী হবে। কারণ পৃথিবীতে জাতীয়তাবাদ নানা কারণে আর উছিলায় ফিরে ফিরে আসে। মুসলমান হিন্দু বাঙালী অবাঙালী … জানি না ধর্ম বিলুপ্ত হলেও ভিন্ন চেহারায় রয়ে যাবে কিনা…। তাই পঞ্চাশ বছর ধর্ম থাকবে ধরে নিয়েও নিশ্চিন্ত বসে থাকার সুযোগ নেই। শুধু মানব সমাজ গড়ার জন্য চিন্তার মুক্তির লড়াই তাই প্রতিদিনের।

#সুষুপ্ত_পাঠক

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix