হিমালয় কোল ঘেঁষে রাপ্তি নদীর তীরে ছোট্ট রাজ্য কপিলাবস্তু। এই রাজ্যের শাক্য বংশীয় রাজা শুদ্ধোধন। শাক্যরা ক্ষত্রিয় যোদ্ধা জাতি। শুদ্ধোধন রাজা হিসেবে সুশাসক ও ন্যায়বান ছিলেন। তার পুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম। ভোগ বিলাশের কোন কমতি রাখেননি শুদ্ধোধন পুত্রের জন্য। কিন্তু সব কিছু ফেলে একদিন গভীর রাত্রে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। শয্যায় অঘোর ঘুমে স্ত্রী যশোধরা ও সদ্য জন্মানো পুত্র রাহুল। ‘রাহুল’ বা ‘রাহুলা’ অর্থ আঁকড়ে ধরা। বেঁধে রাখা। গৌতম এভাবেই ছেলেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, যে ভোগ বিলাশের ঘৃণিত জীবন তার সঙ্গে মায়ায় বেঁধে ফেলবে তাকে। তাই তার নাম ‘রাহুল’। সিদ্ধার্থ গৌতমের তখন ঊনত্রিশ বছর। পুত্রের গেরুয়া পোশাক ও দাড়িগোফ কামানো সন্ন্যাসী বেশ দেখে পিতা শুদ্ধোধন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। নিশুতি রাতে যখন গৌতম গৃহত্যাগ করবেন, স্ত্রী পুত্রকে ঘুমন্ত রেখেই যখন নেমে পড়ছিলেন, একবার লুকিয়ে স্ত্রী পুত্রকে দেখবেন বলে আবার উপরতলায় উঠে এসেছিলেন। সিদ্ধার্থের ভয় ছিলো, স্ত্রী জেগে থাকলে তার কান্নায় তিনি দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন। তাই কাউকে কিছু না বলে প্রিয় ঘোড়া কন্থক ও সারথি ছন্দককে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বনের সীমানায় এসে বহুদিনের সঙ্গী ছন্দককে নির্দেশ দেন কন্থককে নিয়ে ঘরে ফিরে যেতে। গৌতম একা বনের মধ্যে প্রবেশ করেন। একজন শিকারীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে তার সঙ্গে পোশাক পরিবর্তন করে নেন। রাজকীয় রত্নখচিত পোশাক বদলে চামড়ার সাধারণ পোশাক পরে গভীর থেকে গভীর বনের মধ্যে প্রবেশ করতে থাকেন সিদ্ধার্থ। পেছনে পড়ে থাকে কপিলাবস্তু। প্রিয়তমা স্ত্রী, পুত্র রাহুল…।

 

মোটামুটি এই গল্প আমরা সকলেই জানি। ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের যে চিত্র আমরা চিরকাল দেখে অভ্যস্থ তার সঙ্গে তার গৃহত্যাগের এই রোমান্টিক গল্প শুনে শুনে তাঁর সম্পর্কে কখনো হিরোটিক আবেগ কখনো উপন্যাসের নায়কোচিত চরিত্র মনে করা ছাড়া আমাদের কাছে ‘বুদ্ধ’ সম্পর্কে আর কোন ধারণা নেই। কি করেছিলেন তিনি? কেন রাজপুত্রের সৌভাগ্যময় জীবন ফেলে কঠিন অনিশ্চিত জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন? কি তার আদর্শ? মানুষকে ঠিক কি বলে গিয়েছিলেন তিনি? আড়াই হাজার বছর আগের একজন মানুষকে নিয়ে ধর্ম ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নাস্তিকদের কাছেও কেন সমান আগ্রহের বিষয়?

 

‘বুদ্ধ’ একটা পর্যায়ের নাম। ‘নির্বান’ লাভের মাধ্যমেই বুদ্ধত্ব অর্জন করতে হয়। বর্তমান প্রচলিত বৌদ্ধ ধর্ম আমাদের বলে, বর্তমানকাল শেষে ‘মেত্তায়া’ নামের একজন নতুন বুদ্ধ আসবেন। গৌতম বুদ্ধের আগেও আরো ‘বুদ্ধ’ ছিলেন। গৌতম বুদ্ধের পূর্বসুরী বলা হয় ‘বিপাসসি’ নামের একজনকে।

 

‘বুদ্ধত্ব’ অবতার পর্যায়ের কিছু নয়। ওগুলো ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী পৌরাণিক ধারনা। গৌতম নিজে বলেছেন, তার অভিজ্ঞতা ও নির্বাণ লাভের উপায় সম্বলিত সব কিছু মানবীয়, অতিপ্রাকৃত ঐশ্বরিক কিছু নয়। গৌতম বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ হতাশাপূর্ণ ও অর্থহীন একটি জীবনকে গোপন করতে আমাদের অস্তিত্বের পরম অর্থ ও মূল্য আছে এমন একটা সান্ত্বনা ও বিশ্বাস চর্চা করার জন্য ধর্মের উত্পত্তি ঘটিয়েছিলো। এর ফলে ধর্ম একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছিলো। একইসঙ্গে কায়েমী স্বার্খ হাসিলের অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষমতার অস্ত্র যখন মানুষকে বহু শতাব্দী গত হওয়ার পর কোন পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে তখনই নতুন ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছে। আরবের সেমিটিক ধর্মগুলো, গ্রীসের পৌত্তলিক ধর্ম, ভারত কিংবা আরবের পৌত্তলিক ধর্মগুলো নতুন নতুন ধারণায় বহু শাখায় বিকশিত হয়েছে শুধুমাত্র এই কারণেই। সিদ্ধার্থ গৌতম যখন জগতের দু:খ কষ্ট জরার সমাধান জানতে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন সেসময় ভারতের মানুষ ঠিক নতুন প্রেরণা সান্ত্বনার জন্য একজন ‘বুদ্ধের’ অপেক্ষায় ছিলেন। নতুন একজন বুদ্ধ আসবেন এরকম একটি কথা চালু ছিলো সে সময়। তিনি অবশেষে এলেন। তিনি ‘ধম্ম’ দিলেনও। কিন্তু সে ধর্ম কেমন তরো?

 

গৌতম দেবতাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন সম্ভবত, কিন্তু তাদের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। মনে করতেন মানুষের দু:খ কষ্ট জরা বিনাশ থেকে মুক্তি লাভ যাকে ‘নির্বান’ বলছেন তাতে দেবতারা কোন কাজে আসে না। গৌতম মানুষের যে মুক্তি লাভের পথ খুঁজে পেয়েছেন যা তিনি পরবর্তীতে তার শিষ্যদেরকে, সমগ্র পৃথিবীবাসীকে জানিয়ে যাবেন সেটাকে কখনই অন্যান্য ধর্ম পুরুষের মত স্বৈগীয় বলে দাবী করেনি। মুক্তি লাভ সম্পূর্ণ মানবিক যা মানব সন্তান প্রাকৃতিকভাবেই পেতে পারে। গৌতম মনে করতেন, দু:খ কষ্ট জরা যেহেতু আছে সেহেতু এর বিপরীত অবস্থান বা উপায়ও আছে যা তাকে খুঁজে পেতে হবে। সেই সন্ধানেই তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন।

 

“চান্দোগ্যা উপনিষদে” ব্রাহ্মণ উদ্দালোকা তার বৈদিক জ্ঞানে গর্বিত ছেলে শ্রেতাকেতুকে একটি জলের পাত্রে একটা লবনের টুকরা ফেলে দিয়ে বললেন পরদিন পরখ করতে। দেখা গেলো পাত্রে লবন মিশে অদৃশ্য হয়ে গেলেও জলের স্বাদ লবণাক্ত হয়ে গেছে। পিতা পুত্রকে বুঝালেন এই বিশ্বজগত ঠিক পরম আত্মায় তার প্রতিটি সৃষ্টিতে এভাবে মিশে আছেন। বস্তুত এই শিক্ষা ছিলো ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ তার বিপরীত। কারণ ব্রহ্মা এইভাবে সকল সৃষ্টিতে মিশে থাকলে জগতে কেউ শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট নয়- সকলেই সমান। তাই ব্রাহ্মণদের পুজার অধিকার, শ্রেষ্ঠ জাতি গর্বও অনৈতিক। একইসঙ্গে ব্রহ্মা বা ঈশ্বর অথবা পরআত্মাকে আরাধনা করতে পুরোহিতের প্রয়োজন নেই। উপনিষদের সাধুরা ব্রাহ্মণ ধর্মের পুরোহিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বিরোধীতা করেছিলেন গৌতমের জন্মের বহু বহু শতক আগে থেকে। গৌতম গৃহত্যাগী হবারকালে ভারতে ধর্মীয় বিশ্বাসে একটা পরিবর্তন সবাই অনুভব করছিলো। প্রচলিত আর্য ধর্ম রূপ নিয়েছিলো প্রতিক্রিয়াশীল পুরোহিততন্ত্রে। মানুষ ধর্মের কাছে আশ্রয় নিতো সর্বশেষ আশ্রয়স্থল জেনে। কিন্তু সেখানে ব্রাহ্মণদের প্রথা পার্বনের বস্তুবাদী চাহিদার ফর্দ তাদেরকে হাঁপিয়ে তুলেছিলো।

 

গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে আমরা যা জানি তার সবটুকুই বৌদ্ধ ধর্মীয় সোর্স থেকে পাওয়া। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে কল্পনা অলৌকিকতা ও ঐশ্বরিক অনুসঙ্গ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। তবু হতাশ হবার কারণ নেই। পালি টেক্স থেকে ঐতিহাসিক অনেক তথ্যই পন্ডিতরা বের করে এনে আমাদের সিদ্ধার্থ গৌতম সম্পর্কে জানিয়েছেন। বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর যে দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বুদ্ধের বাণী আচার নির্দেশ পালি ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো যাকে ডাকা হত ‘তিপিতাকা’। তিপিতাকা অর্থ তিনটি ঝুড়ি। বুদ্ধের বাণী ইতিহাস ঘটনা নির্দেশ ইত্যাদি বিভিন্ন বিভাগে আলাদা করার সময় তিনটি ঝুড়ি বা পাত্রে লিপি করে রাখা হয়েছিলো। এটিই বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ‘তিপিতাকা’ বা ‘ত্রিপিটক’।

 

পালি ত্রিপিটক থেকে গৌতম সম্পর্কে আমরা যা জানি, জন্মের মাত্র ৫ দিনের মাথায় গৌতম সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন ১০০ জন ব্রাহ্মণ ঋষি। পুত্রের জন্ম উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মণভোজের আয়োজন করেছিলেন গৌতমের পিতা শুদ্ধোধন। ঋষিরা গৌতমের পিতার কাছে ছেলের ভবিষ্যতবাণী বলেছিলেন, এই ছেলে হয় সন্ন্যাসী হবে নয়তো জগতখ্যাত রাজা হবে। তারা বলেছিলেন, গৌতম একদিন চারটি জিনিস দেখে গভীর ভাবনায় গৃহত্যাগ করে বনবাসী হবে। সেরকম চারটি জিনিস হচ্ছে, জরাগ্রস্থ (বৃদ্ধ) মানুষ, একজন রোগী, মৃতদেহ ও একজন সাধু। কপিলাবস্তুর ভবিষ্যত রাজা গৃহত্যাগ করে বনে গিয়ে ধ্যান করবে এটা শুদ্ধোধন চাননি। তাই গৌতমকে বিলাসী, আমোদ প্রমোদে ঠাসা এক প্রাসাদে এই চারটি জিনিস নিষিদ্ধ করে সেখানেই বড় করতে লাগলেন। ২৯ বছর বয়স পর্যন্ত গৌতম বৃদ্ধ মানুষ, অসুস্থ মানুষ, মৃতদেহ ও কোন সাধু সন্ন্যাসী দেখার সুযোগ পেলেন না। কিন্তু ‘স্বর্গের দেবতারা’ গৌতমের নিয়তি আগেই লিখে রেখেছেন। তাই গৌতমের ২৯ বছর বয়সের সময় তাদের অলৌকিক ক্ষমতা বলে এই চারটি জিনিস গৌতমকে দেখানোর সুযোগ করে দিলেন। ফলত গৌতম জীবন নিয়ে গভীর ভাবনায় পতিত হলেন। জীবনের পরিণতি কি? কেন এই জীবন? মানুষের জীবনে দু:খ, জরা মৃত্যু কেন? এ থেকে মুক্তির কি উপায়? একদিন একজন পীড়িত মানুষকে দেখলেন যে পথের মধ্যে পড়ে আছে নিজের বমির উপর। কেউ তাকে এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে না। এত অসুস্থ যে নিজে উঠে বসতেও পারছে না…। আরেকদিন এক বৃদ্ধকে দেখলেন যিনি বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছেন। মুখের একটি দাঁতও নেই। চামড়া কুচকে ঝুলে গেছে। সিদ্ধার্থ ব্যথিত হলেন। মানুষের এই পরিণতি? সে নিজেও একদিন এইভাবে বৃদ্ধ হবেন? অসুস্থ হবেন?… একদিন এক সন্ন্যাসী এলেন ভিক্ষা করতে। তার মুখের প্রশান্তি আর শান্ত চলন দেখে সিদ্ধার্থ মুগ্ধ হলেন। কিসে সে এত প্রশান্ত ও সুখি? জিজ্ঞেস করেছিলেন যুবক সিদ্ধার্থ। অনেক কিছু জানলেন সে সন্ন্যাসীর কাছ থেকে। সিদ্ধার্থের সহচর ছন্দক খুব বুদ্ধিমান ছিলেন। প্রভুর সমস্ত কৌতুহল ও প্রশ্নের উত্তর সুন্দর করে ব্যাখ্যা করে বুঝাত। গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হলেন সিদ্ধার্থ। এই ভাবনা যদিও বালক বয়সে প্রথম কিছুটা আঁচ পেয়েছিলেন।

 

সিদ্ধার্থ যখন বালক তখন পিতার সঙ্গে লাঙল উত্সব দেখতে মাঠে গেলেন। তিনি দেখলেন লাঙলের ফালের চোটে কচি ঘাসগুলো সব উপড়ে যাচ্ছে, ঘাসের মধ্যে পোকামাকড়ের ডিমগুলোও সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বালক গৌতমের মনে হলো তার নিকটাত্মীয়দের যেন হত্যা করা হয়েছে। গৌতম মনে হয় তখনই জীব জগতের নিষ্ঠুর খাদ্য ও খাদকের যে চক্র তার সন্ধান লাভ করেন। এগুলো তার মনে গভীর ছাপ ফেলে।

 

সিদ্ধার্থ মানব জীবনের মূল যে দু:খ ভোগান্তি, অসুখি অশান্তি তা থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। কোন কল্পিত ঈশ্বর পরকালে মুক্তি পাবার কথা বলেননি। তিনি নিজে অলৌকিক ঈশ্বরে বিশ্বাস হয়ত করতেন কিন্তু মনে করতেন না মানব জীবনে তাদের কোন হস্তক্ষেপ আছে। কারণ তিনি যোগ সাধনার মাধ্যমে মুক্তির কথা বলেছেন, প্রার্থনার মাধ্যমে নয়।

 

নির্বান লাভ বলতে এটা বুঝায় না যে এরপর মানুষের সকল দু:খ কষ্ট বলতে আর কিছু থাকবে না। গৌতম জানতেন নির্বান লাভের পরও তিনি বৃদ্ধ হবেন এবং এক সময় মারা যাবেন। এই সময়কালে তিনি দু:খ কষ্ট জরায় আক্রান্ত হবেন। তাই নির্বান মানে নারী পুরুষ এমন একটি মানসিক বোধ আয়ত্ত করবে যখন সংসারে দু:খ কষ্ট হতাশা দুর্ঘটনা অভাব ক্ষতি সব রকম পরিস্থিতিতে অদ্ভূত এক সহনশীলতা, মেনে নেয়া, মোকাবেলা করা, অদ্ভূত এক প্রশান্তির সঙ্গে জীবনের এইসব অনুসঙ্গকে স্বীকার করে নেয়ার কৌশল। এখানে অলৌকিক কোন ঈশ্বরের কাছ থেকে কোন শক্তি পাবার বিষয় নেই। গৌতম সেরকম কোন দাবীই করেনি। করেননি বলেই তিনি যোগের কৌশল সাধারণ মানুষের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। এইসব অনুশীলন করে মানুষ একটা স্তরে পৌঁছে সব রকম অনুভূতি থেকে নিজেকে শূন্য একটা স্তরে নিতে পারে।

 

আমি নিজে ‘নির্বান লাভ’ ব্যাপারটাকে বুঝেতে চাই। কিন্তু জানি সংসারে থেকে বহু মানুষের সঙ্গে লেনদেন, দায়িত্ব কর্তব্য, সংসারের প্রয়োজন আর চাহিদার মাঝে বাস করে, একজন গৃহীর পক্ষে ব্যাপারটি বুঝা বেশ কষ্টসাধ্য। সিদ্ধার্থ গৌতম আমাদের মত মানুষদের কথা চিন্তা করেছিলেন। তিনি শুরুতে তার মতবাদ প্রচার করতে চাননি কারণ সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারবে না। কিন্তু পরে মত বদলেছেন। সাধারণ মানুষদের জন্য ভিক্ষুর জীবন বা সাধনা নয়, তাদের জন্য অন্যভাবে চিন্তা করেছেন। কিন্তু কিভাবে আমি তা অর্জন করব? এই লেখা লিখতে গিয়ে ও বুদ্ধকে আবিস্কার করতে গিয়ে আমি বারবার আলো ছায়ার দোলায় দুলেছি। মনে হয়েছে এই সব কিছু বুঝে ফেলেছি, পরক্ষণেই তার হারিয়ে ফেলেছি। তাতে ‘নির্বান’ সম্পর্কে আমাকে আরো বেশি আকূল করে তুলেছে। নির্বান কি একজন মানুষের গোটা জীবনকে রবীন্দ্র সংগীতে আশ্রয় করে নেয়ার মত? জীবনের সমস্ত দু:খ কষ্ট মৃত্যু ত্যাগ বিসর্জন সমস্ত কিছুতে সংগীত দিয়ে একটি ভিন্ন প্রশান্তির জগত তৈরি করে জীবনকে অবলোকন করা? আমি এরকম বহু মানুষের দেখা পেয়েছি যারা স্বীকার করেছেন সংগীত তাদের জীবনের আশ্রয়। রবীন্দ্রনাথ তার নিজের গান দিয়ে নিজেকে ‘নির্বান লাভ’ করেছিলেন? ছেলেকে শ্মশানে পুড়িয়ে এসে যখন ট্রেন ধরবেন, একজন অচেনা লোক তাকে চিনতে পেরে সাহিত্য সংগীত নিয়ে আলাপ জুড়ে দিলেন আর তিনি তার জবাব দিলেন শান্তভাবে! এতখানি আপনার আমার পক্ষে কি সম্ভব হবে? কেমন করে রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন তা তাঁর গান শুনলে অনুভব করতে পারা যায়। নির্বানের উদ্দেশ্য অন্তত তাই। আশি বছর বয়সে যখন দুজন অসাধারণ শিষ্যের মৃত্যু সংবাদ পেলেন তখন বুদ্ধ ধীর শান্তভাবে তা গ্রহণ করলেন। কিন্তু শিষ্য আনন্দ তা সইতে না পেরে অঝরে কাঁদতে লাগল। বুদ্ধ তাকে শিক্ষা দিলেন, আনন্দ আমি কি তোমাকে বলিনি এই পৃথিবীতে কোন কিছুই চিরদিনের জন্য নয়? তাহলে কিসের জন্য আর্তনাদ?

 

গৌতম প্রথমে শিষ্য নিতে রাজি ছিলেন না। তার “ধম্ম” সাধারণ মানুষ গ্রহণ করতে পারবে না, তার যোগ, আত্মবিসর্জন এইসব তারা অনুশীলন করতে চাইবে না এটাই ছিলো তার শংকা। পালি ত্রিপিটকে এখানে ঈশ্বর ‘ব্রক্ষার’ হস্তক্ষেপের বর্ণণা করেছে। ব্রহ্মা চেঁচিয়ে উঠেছে। গৌতম তার যোগ কৌশল মানুষকে না বাতলে দিলে জগত পরাস্ত হবে। কোন সুযোগ থাকবে না। এটা ছিলো গৌতমকে ভারতের সুপ্রাচীন ধর্মের যোগসুত্রের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আদি সনাতন ধর্ম থেকে নতুন এক ‘বৌদ্ধ ধর্ম’ প্রবর্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মাত্র। কারণ আমরা পালি টেক্স থেকে জানি স্বয়ং ব্রহ্মা স্বর্গ থেকে নেমে এসে হাঁটু গেড়ে বসে গৌতমকে ‘প্রভু’ সম্বধন করে বলেন, তিনি ধর্ম প্রচার না করলে মানুষ নির্বান লাভ করতে পারবে না। এতে পৃথিবীর উদ্দেশ্য সাধিত হবে না…।

‘বৌদ্ধ ধর্ম’ আমাদের বলছে, প্রতি ৩২,০০০ বছর পর পর ধর্ম শিক্ষা যখন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে তখন একজন করে ‘বুদ্ধ’ আসবেন পৃথিবীতে। এটি সেমিটিক ধর্মগুলোর মত ভবিষ্যত ত্রাতা আসার যে ভবিষ্যতবাণী সেরকমই শোনায়। কিন্তু কিসে মানুষের মুক্তি, কেন মানুষের জীবনে কোন স্বস্তি নেই, সুখ নেই, মানুষের মনের সেই পরম শান্তির ধীর স্থীর একটি পথ অন্বেষণ যেখানে প্রতিটি ব্যক্তিকে নিজে খুঁজে নিতে হবে সেখানে এরকম মহাপুরুষের অপেক্ষায় থাকা মানে অন্ধকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া একজন দৃষ্টিশক্তি অধিকারী মানুষের আর্বিভাব। তিনি সব জানেন। তিনি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। সঠিক পথটি তিনি জানেন। একমাত্র তিনিই সত্য পথের খোঁজ পেয়েছেন…। এই হচ্ছে ধর্ম। কিন্তু সিদ্ধার্থ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে কোন প্রচলিত ধর্ম অনুশীলন, দেবতাদের পুজা, কিংবা স্বয়ং গৌতমের আরাধনার শিক্ষা দেননি। পরকাল, আদি মানবের আদিপাপ থেকে মানুষের জন্ম, পৃথিবীর বিনাশ, পাপের ফল, পূণ্যের পুরস্কার- এরকম কোন কিছুই তিনি শিক্ষা দেননি যা ধর্ম দিয়ে থাকে। ব্যক্তি পুজা, ব্যক্তি কাল্টকে বুদ্ধ ভীষণভাবে নিরুত্সাহিত করতেন। শিষ্যদের একদিন তিনি বললেন, একজন পর্যটক নদী পার হতে গিয়ে একটি ভেলার সাহায্য নিলো। পার হয়ে এখন পর্যটকের কি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ভেলাকে পিঠে মাথায় করে বয়ে বেড়ানো উচিত? নাকি ভেলার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নদী তীরেই যাত্রা সমাপ্ত করে বসে থাকা উচিত? নিশ্চয় পর্যটক নদী পার হয়ে ভেলা ফেলে তার গন্তব্য উদ্দেশ্যে চলে যাবে। আমি ও আমার দর্শন ঠিক সেই ভেলা। এটাকে আঁকড়ে ধরে সৌধ মন্দির বানিয়ে বসে থাকতে হবে না। বরং এটাকে কাজে লাগিয়ে নিজের মুক্তিই হচ্ছে উদ্দেশ্য।…

 

এখানেই গৌতম ও প্রচলিত সমস্ত ধর্মমত আলাদাই শুধু নয় গৌতম আড়াই হাজার বছর আগে ধর্মহীন এক মুক্তির দর্শন মানুষের সামনে এনেছিলেন তা পরিস্কার করে। কারণ প্রচলিত সমস্ত ধর্ম নিজেকে সেই ভেলা হিসেবে দাবী করে যা ছাড়া অকূল দরিয়া পার হওয়া যাবে না এবং কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেই ভেলাকে মাথায় করে বয়ে বেড়াতে হবে! ধর্ম হচ্ছে মানবসমাজে এই রকম এক বোঝা। গৌতম কোন বোঝা চাপাননি। তিনি নির্বান লাভের কৌশল শিক্ষা দিতে চেয়েছেন মানুষকে। তাকে বয়ে বেড়াতে নয়। তিনি মানুষের ‘দু:খের নদী’ পার হতে ভেলা হতে চেয়েছেন। ‘মহাবিশ্বের সৃষ্টি’ বা ‘পরম সত্তা’ নিয়ে গৌতমের কিছু বলেননি। কারণ এগুলো জেনেও মানুষের দু:খ থেকে মুক্তি মিলবে না। তাই গৌতম কখনো বিজ্ঞানের শত্রু হননি বা নিজে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। মহাবিশ্ব কি স্থীর নাকি চলমান, পৃথিবী কি সমতল নাকি চৌকো গৌতম সেরকম আগ বাড়িয়ে কোন কথা বলতে যাননি কারণ এসব ‘সত্য’ জেনেও ব্যক্তি মানুষের জীবন থেকে কি দু:খ হতাশা দূর হবে? হবে না। গৌতমের দর্শন তাই শুধুই মানুষের দু:খ জরা থেকে মুক্তির মানসিক অনুশীলন। গৌতমের কোন অলৌকিক ক্ষমতাও নেই। তিনি বৃষ্টি নামাতে পারেন না। তিনি চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করতে পারেন না। তিনি সাগরকে লাঠি দিয়ে দ্বিভাগ করতে পারেন না। তিনি কোন পয়গম্ব বা দেবতা নন। কিন্তু তার মৃত্যুর একশো বছরের মধ্যে যখন ‘ত্রিপটক’ লেখা হলো তখন সেখানে গৌতম অলৌকিক ক্ষমতাধর স্বর্গীয় প্রতিনিধি। এমনকি তার মৃত্যু শোকে একজন শিষ্যের চিত্কারে চন্দ্র দ্বিখন্ডি হয়ে ভেঙ্গে পড়েছিলো!…

 

গৌতম ‘সত্তা’ বা ‘আমি’ বলতে যে একটা অস্তিত্বকে আমরা জাহির করি তাকে অস্বীকার করেছেন। ‘আমি’ বলতে আসলে কিছু নেই। পরিস্কার করে বললে ‘আত্মা’ বলতে কিছুতে বিশ্বাস করতেন না শিশুকাল থেকে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ যে প্রতিনিয়ত বদলায়, রুচিতে, চিন্তায়, অভ্যাসে, স্বভাবে- সেটাই বাস্তব। যদি সত্তা বলতে কিছু থাকত তাহলে প্রতিটি ব্যক্তি হত অনড় অবিচল অপরিবর্তনীয়। অথচ এই ‘আমি’ এর জন্যই আমাদের ইগো, হিংসা, রাগ, প্রতিশোধ, লোভ, অসন্তুষ্ঠি, অসুখি হওয়ার হাজারো কারণ। কিন্তু গৌতম কিছুটা সংশয়ী ছিলেন সাধারণ মানুষ যখন জানবে আত্মা বা সত্তা বলতে কিছু নেই, মরার পর সে ধ্বংস হয়ে যাবে, তার আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না এটা জেনে সে ভীত হয়ে পড়বে। কিন্তু দেখা গেলো তার পাঁচ শিষ্য যখন এই সত্য অনুভব করল তখন তারা চরম সুখ অনুভব করল। মানুষ যখন সত্তাহীনতা জেনে জীবনযাপন করে তখন তারা আগের চেয়ে সুখি জীবনযাপন করে…। কিন্তু সাধারণ মানুষকে নিয়ে বুদ্ধ সংশয়ী ছিলেন। একবার রাজা পাসেনেদি ও তার স্ত্রী আলোচনা করে একমত হলেন যে, তাদের আপন সত্তাই হলো সবচেয়ে প্রিয়। এক কথা বুদ্ধের কাছে যখন পাসেনেদি বললেন তখন বুদ্ধ সেকথার বিরোধীতা করে বলেননি যে, সত্তা বলতে কিছু নেই। এ কারণে বলেননি কারণ বুদ্ধ জানতেন দীর্ঘ ধ্যানী সন্ন্যাসী জীবন কাটিয়ে সাধনার পর যে গূঢ় সত্য তিনি জানতে পেরেছেন সেকথা রাজা এক কথায় কি করে বুঝবেন? কিংবা সেটা তিনি মেনেই নিতে পারবেন না। তাই বুদ্ধ রাজার বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বিমত না করে বললেন, যদি তোমার আপনার সত্তা তোমার কাছে অধিক প্রিয় হয় তাহলে অন্যের কাছেও ঠিক একই রকম তার আপন সত্তা প্রিয়। তাই যে ব্যাক্তির কাছে জীবন সবচেয়ে প্রিয় তার উচিত হবে অন্যের জীবনে আঘাত না করা।

 

 

সত্যি অতি বিস্ময়কর এটা! আমরা যখন নাস্তিক হয়েছিলাম আমাদের মৃত্যুর পর কোন পরকাল নেই এই সত্যকে জেনে তখন আমরা আগের চেয়ে কি ভীষণ সুখি হয়েছিলাম। কিন্তু ধার্মিকদের প্রথম প্রশ্নই থাকে যে মানুষ যদি জানে পরকাল বলতে কিছু নেই, স্বর্গ নরক বলতে কিছু নেই তাহলে মানুষ বেপরোয়া হয়ে যাবে, হানাহানি রক্তপাতে ভরিয়ে ফেলবে…। কিন্তু গৌতম আড়াই তিন হাজার বছর আগে ভারতে সেরকম সত্তাহীন মানব জীবনের সত্য প্রচার করে সাধারণ মানুষকে সুখের ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। কী বিস্ময়কর চিন্তার অগ্রগতি ছিলো গৌতমের। কেমন করে তিনি বানারসের হরিণ বাগিচায় বসে প্রচার করেছিলেন, সত্তার মত ঈশ্বরও ভ্রান্ত এবং একই রকম করে অহম হিংসা রোষ ঘৃণা বিদ্বেষ উশকে দেয়। আর এতে করে মানুষ অসুখি হয়। তাই ধর্ম ঈশ্বর মানুষকে ‘নির্বান’ লাভ করতে দেয় না। পরকালে আয়েশ ভোগপূর্ণ আরেকটি জীবনের লোভ মানুষকে মুক্তি না দিয়ে আরো বেশি করে শৃঙ্খলিত করে দু;খি করে তোলে…। হরিণ বাগিচায় বৃক্ষ নিচে বসে তথাগত বুদ্ধ শিষ্যদের শোনাচ্ছেন এভাবেই জীবনের গূঢ় সত্যগুলোকে…।

 

ত্রিপিটক আমাদের বলে যে যোগের মাধ্যমে অলৌকিকতা সম্ভব। গৌতম অলৌকিকতা দেখিয়েছিলেন। এগুলো নিছক ধর্মকথা। গৌতমের যোগ ছিলো মনোসংযোগকে একটি বিন্দুতে নিয়ে আসা। কিছু অনুশীলনের মাধ্যমে কৃচ্ছসাধনতা অর্জন করা। সাধারণ মানুষ বুদ্ধের কঠিন দার্শনিক নির্বান লাভ বুঝতে পারবে না। তাই তাদের জন্য অনুশীলন। কালক্রমে সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় প্রথা পালন। তাই বুদ্ধকে ভগবান মেনেও ‘বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা’ সুখি হতে পেরেছে? পারেনি। ব্যক্তি কাল্টে বুদ্ধ ঘোর অপছন্দ করতেন। এমনকি এই লেখাটি পড়লে বুদ্ধ খুশি হতেন যা যেখানে তাঁকে নিয়ে মুগ্ধতা ছড়ানো হয়েছে। তিনি অবতার নন। তিনি আসলে কেউ নন। বুদ্ধ শুধু বলেছিলেন নিজেকে সন্ধান করতে। আড়াই হাজার বছর আগে দার্শনিক সক্রেটিসও বলেছিলেন ‘নৌ দাই সেল্ফ’ নিজেকে জানো। একই কথা বুদ্ধও বলেছেন। এক পতিতার পিছনে ধাওয়া করছিলো কয়েকজন যুবক। বুদ্ধ তাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, কোনটি তোমাদের জন্য প্রয়োজনীয়, অর্থহীন আনন্দের পিছনে ছোড়াছুটি করা নাকি নিজেকে জানা? আমাদের কালের জ্যোর্তিরর্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানই সম্ভবত বলেছিলেন, নক্ষত্র খচিত রাতের আকাশের দিকে তাকাতে, মানুষ তখন বুঝতে পারবে এই মহাবিশ্বে সে কত তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন। আধুনিককালের একজন মানুষের উপলব্ধি যা আড়াই হাজার বছর আগে সক্রেটিস, বুদ্ধ অনুসন্ধান করতে বলেছেন। বুদ্ধ তাই আজো গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক।

 

এখানে একটি কথা না বললে অন্যায় হবে যারা ত্রিপিটক সংকলন করেছিলেন, বৌদ্ধ বিহারবাসী বিক্ষুরা, যারা গৌতমকে একজন ধর্মপ্রবর্তকে পরিণত করেছিলেন কালে কালে, তাদের এখানে নিজেদের স্বার্থ বুদ্ধি জড়িত ছিলো বলে মনে হয় না। আশ্রমবাসী এই মানুষগুলো ব্রাহ্মণবাদের বিরুদ্ধে জোড়ালো জাতবর্ণ শ্রমের বিলোপ করতে বুদ্ধকে দিয়ে দেবতাদের পরাজিত করার গল্প সাজিয়ে ছিলেন। কারণ গৌতম ক্ষত্রিয় ছিলেন। তিনি ক্ষত্রিয় হয়েও ব্রাহ্মণদের থেকে শক্তি মর্যাদায় অনেক এগিয়ে ছিলেন এটি ছিলো ব্রাহ্মণ সর্বশ্রেষ্ঠ এই মতবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান। ব্রাহ্মণদের তাই নিজেদের ধর্ম রক্ষা করতে গৌতম বুদ্ধকে নবম অবতার ঘোষণা করতে হয়েছিলো। জন্মগত অবস্থানের কারণে বা প্রাকৃতিক নির্বাচন কাউকে অস্পৃশ্য করে তোলে না। এমনটাই মত দিয়েছিলেন বুদ্ধ। মানুষের কর্মকান্ডই তাকে ‘অস্পৃশ্য’ করে তোলে। বামুন যদি খুন করে সেটাই তার অস্পৃশ্যতা। মানে নিজ কর্মই তার পরিচয়। ডোমের ঘরে জন্ম নেয়াটা কারোর নিজের হাতে নয়। এটা যে প্রাকৃতিক নির্বাচন এটি বুদ্ধ বুঝেছিলেন। প্রকৃতি যে মানব মস্তিষ্কের মত চিন্তা ভাবন করতে পারে না সেটি বুঝেছিলেন বলেই তিনি সত্য জ্ঞানে জাতপাতকে অবাস্তব জেনেছিলেন। এটি কেবলমাত্র তার উন্নত উদার হয়ে উঠা নয়, এটা ছিলো সত্যকে আবিস্কার করা। তাই পালি টেক্স বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলে। তবে বুদ্ধ নাস্তিক ছিলেন এমন কথা বলার কোন সুযোগ নেই। তেমন কোন প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু সেকালের প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের উপর বুদ্ধের নির্বান লাভ প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কারণ প্রথা পার্বন মানুষকে মুক্তির বদলে আরো বেশি ভারাক্রান্ত করে তোলে। বুদ্ধ পুরোহিতন্ত্রের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাই বুদ্ধ প্রচলিত সমস্ত ধর্ম থেকে যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। যেমন সক্রেটিস। সক্রেটিসের প্রচলিত ধর্মগুলোতে আস্থা ছিলো না, তবে তিনি নাস্তিক ছিলেন না। তিনি প্রশ্ন প্রশ্ন করে করে প্রচলিত সমস্ত বিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর যুবকদের বলতেন, ‘নিজেকে জোনো’। বুদ্ধ একই কথা বলে গেছেন। তাকে ‘প্রভূ’ রূপে পুজা করতে নয়। এ কারণে যীশুর সাহাবীদের যে পরিমাণ গুরুত্ব, সাধু পৌলের অবস্থান, আরবের ধর্মের চার খলিফার গুরুত্ব সেরকম করে বৌদ্ধ ধর্মে কিছু নেই। বুদ্ধের দুইজন প্রধান শিষ্য যারা বুদ্ধের মৃত্যুর পর তার বাণী গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদের নামটি ছাড়া কোথাও তাদের পরিস্কার বর্ণনা নেই। তারা যেন আর সব ভিক্ষুদের মতই সাধারণ আশ্রমবাসী। এমনকি গৌতমের পুত্র রাহুল হতে পারতেন সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মাবতার। ভক্তদের কাছে তিনি পুজনীয় হতে পারতেন কারণ তিনি স্বয়ং বুদ্ধের সন্তান। কিন্তু তিনিও অতিসাধারণ এক ভিক্ষু ছাড়া বিশেষভাবে উল্লেখিত নন। এমনকি বৌদ্ধ সাহিত্যে, ত্রিপিটকে পিতা-পুত্রের মধ্যে কোন আবেগ সমৃদ্ধ বিরাট আখ্যান নেই। এমনকি গৌতম নিজেও একজন সাধারণ আশ্রমবাসী ভিক্ষু হয়ে যান…।

 

একদম সাধারণ মানুষের প্রশ্ন বুদ্ধ কি চাইতেন সকলে গেরুয়া পরে ভিক্ষু হয়ে সংসার ত্যাগ করুক? যদি সবাই নির্বান লাভের জন্য গেরুয়া পরে মাথা কামিয়ে ভিক্ষু হয়ে ধন্যা মগ্ন হয়ে থাকবে তাহলে ধান চাষ কে করবে? কাপড় কে বুনবে? মাছ কে ধরবে? বন্যায় বাঁধ দিবে কে? সাধারণের এই প্রশ্ন তাই উঠবে বুদ্ধের দর্শন মেনে নিলে তো পৃথিবী লোপ পাবে। এমনকি বিয়ে সন্তান উত্পাদন না করলে তো মানব সভ্যতা লোপ পাবে। সাধারনে এই রকম একটি  আলাপ শোনা যায় বিক্ষুদের নিয়ে। কিন্তু গৌতম জানতেন, সাধারণ মানুষ সংসার জীবনে থেকে কিছুতে নির্বান লাভ করতে পারবে না। তাকে পরিবারের স্বার্থ দেখতে হবে, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে হবে, ফলে অন্যের থেকে নিজেকে ও তার পরিবারকে ‘আপন’ আর বাকীদের ‘পর’ মনে করে দূরে ঠেলাই তার জন্য স্বাভাবিক। সে জন্য দীক্ষা দু রকমের ছিলো, সংসার ত্যাগী ভিক্ষু জীবনে প্রবেশ করে নির্বান লাভের জন্য দীক্ষা, অপরটি সাধারণ সংসারী মানুষদের জন্য দীক্ষা। সাধারণ মানুষজন যাতে কিছু যোগের সাহায্যে মনকে স্থীর করে লোভ হিংসা প্রতিশোধ দু:খ কষ্ট গ্লাণি থেকে মুক্তি পায়। মনে প্রশান্তি তখনই আসবে যখন নিজের মনকে মুক্ত করা যাবে। উদাহরণ দিয়ে বুঝাই, বাড়িতে একটি আম গাছ আছে, প্রচুর আম যখন গাছ থেকে পারা হলো তখন সেই আম শুধু নিজের জন্য কুঠিগত করতে গিয়ে মন ছোট হয়ে গেলো। নিজের পরিবার মিলে অনেক আম অনেকদিন ধরে খেতে হবে। প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজন কারোর আম খাওয়ার সামর্থ না থাকলেও তাদের আম দিতে মন সায় দেয়নি। উপরন্তু প্রতিবেশীর গাছে বেশি আম ফলন দেখে ঈর্ষায় মন জ্বলেছে। এই যে ভোগ এবং একই সঙ্গে মনে পীড়ন, আম ফুরিয়ে যাবার শংকায় উদ্বিগ্ন হওয়া, সব মিলিয়ে কি আপনার মন অশান্ত অসুখী হয়নি? যদি সব আম সবাইকে দিয়ে খাওয়া হত, আম নি:শেষ হওয়া নিয়ে কোন উদ্বিগ্ন না হত মন, প্রতিবেশীর ফলের গাছ দেখে মন হিংসার সৃষ্টি না হত তাহলে কি সুখি হতেন না? বুদ্ধের মুক্তি বা নির্বানের সাধারণ মানুষের জন্য দীক্ষাটা ছিলো এটাই। কারণ বড় দার্শনিক সত্য তারা বুঝতে পারবে না জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে। তাদের মুক্তি তাই সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য নয়। একই সঙ্গে সবাই সন্ন্যাসী হলে মানব সভ্যতা হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু সংসারে সন্ন্যাসীদেরও দরকার সাধারণের মনে আলো জ্বালানোর জন্যই। নির্বান লাভের পর শেষ পঁয়তাল্লিশ বছর বুদ্ধ বড় বড় নগর শহরে বহু মানুষের সংস্পর্শে কাটিয়েছেন শুধু শিক্ষা দেয়ার জন্য। ছবিতে বোধিবৃক্ষের নিচে ধন্যামগ্ন যে বুদ্ধের ছবি দেখি তাতে অনুমান করতে পারি না বুদ্ধকে রোজ কত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হত। এমনকি নিজের জন্য নির্জন একটু জায়গা পর্যন্ত তাঁকে সন্ধান করতে হত। তাই ধ্যানের জন্য শান্ত নিরিবিলি স্থান জরুরী হয়ে পড়ে। সেরকম বাসস্থান অচিরে তৈরি করা হয়। এরকম বাসগৃহ নির্মাণ করে দিতেন রাজা বা বণিকরা।

 

আমি দেখেছি ফেইসবুকে বিচ্ছিন্নভাবে বুদ্ধের বাণী হিসেবে এমন কিছু লেখা যেখানে দেখানো হচ্ছে বুদ্ধ প্রবলভাবে নারী বিদ্বেষী ছিলেন। বুদ্ধ কি সত্যিই নারী বিদ্বেষী ছিলেন? বুদ্ধের বাবা শুদ্ধোধন মারা যাবার পর গৌতম কাপিলবাস্তুতে বাবার গৃহে যান। গৌতমের মাসি বা খালা পজাপতি, যিনি আবার গৌতমের বিমাতা ছিলেন। সিদ্ধার্থের জন্মের কিছুদিন পর তার মায়ের মৃত্যু হলে তাকে লালন পালন করতে সুবিধা হবে এরকম আরো অনেক কিছু চিন্তা করে মাসি পজাপতিকে বিয়ে করে পিতা শুদ্ধোধন। পজাপতি আজ সব কিছু থেকে মুক্ত। সন্তানতুল্য সিদ্ধার্থ বহুকাল থেকে সন্ন্যাসী হয়ে গৃহহীন। স্বামীও গত হলো। এবার সে গৌতমের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে বলেন তিনি সংঘে সন্ন্যাসী হিসেবে যোগ দিতে চান…। গৌতম জোরালোভাবে সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। বহু অনুনয় বিনয় করেও গৌতমের মন গলানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু পজাপতি মাথা মুরিয়ে গেরুয়া পরে গৃহ ছেড়ে পায়ে হেঁটে গঙ্গার উত্তর তীরবর্তী বিদেহা প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বেসালিতে গিয়ে পৌঁছান। এখানে ভিক্ষুদের একটা আশ্রয়স্থল ছিলো। রক্তাক্ত পা আর ক্লান্ত বিধ্বস্থ শরীর নিয়ে তিনি সেখানে বসে থাকেন। গৌতমের অন্যতম শিষ্য আনন্দ তাকে দেখে চিনতে পারেন এবং এখানে আসার কারণ জানতে চান। পজাপতি বলেন তিনি দীক্ষা চান কিন্তু বুদ্ধ রাজি নন। তিনি মেয়েদের সংঘে যোগ দিতে দিবেন না…। আনন্দ তাকে সেখানেই বসে থাকতে বলে বুদ্ধের সঙ্গে কথা বলতে গেলন। গুরুত্বপূর্ণ এক প্রশ্নের মুখে গৌতম ও তার দর্শন, তিনি মানব জাতির অর্ধেককে নির্বান লাভের অযোগ্য মনে করেন? কিন্তু মুক্তি তো পুরুষ নারী উভয়ের দরকার। আনন্দ বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, প্রভু, নারীদের কি মুক্তির লাভের সুযোগ নেই? বুদ্ধ জবাব দিলেন, অবশ্যই আনন্দ। আনন্দ তখন বললেন, তাহলে পজাপতিকে গ্রহণ করাই হবে মঙ্গলজনক। বুদ্ধ দ্বিধান্বিত তবু। তিনি ভীত ছিলেন সন্ন্যাসীরা নারীসঙ্গকে কামনায় পর্যবসিত করে ফেলেন কিনা। বুদ্ধ যখন গৃহত্যাগ করে চলে যান তখন স্ত্রীকে সঙ্গে নেননি সেটা নারীসঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন না বলে নয়, বরং তীব্রভাবে কামনা করেন বলেই তিনি জানতেন স্ত্রী সঙ্গে থাকলে তার নির্বান লাভ সম্ভব হবে না। এখানে খ্রিস্টিয় সন্ন্যাসীদের মত নারীসঙ্গকে তিনি কদর্যভাবে উপস্থাপন করেননি। বুদ্ধকে শিষ্যের কাছে পরাজয় মানতে হলো। কিন্তু কিছু শর্ত জুড়ে দিলেন গৌতম। নারীরা পদবিতে পুরুষ সন্ন্যাসীদের উপরে থাকবে না। পুরুষ সন্ন্যাসীদের ধমক দিতে পারবে না। নিজে থেকে শাস্ত্র জ্ঞান অন্যকে দিতে পারবে না।… এই রকম শর্ত জুড়ে দিয়ে নারীদের সন্ন্যাসী হওয়ার সুযোগ দেয়া হলো। এ থেকে গৌতম বুদ্ধকে ‘নারী বিদ্বেষী’ বলে রায় দেয়াটা কি সহজ? বিশেষজ্ঞরা বিচার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, গৌতম বুদ্ধ যে যুগের মানুষ সেযুগে নারীরা পুরুষের সম্পত্তি ছাড়া আর কিছুই ভাবা হত না। নারীর ধর্ম হচ্ছে ইহকালে স্বামীর সেবা করে জীবন অতিবাহিত করা। সেই যুগে বুদ্ধ নারীদের সংসার স্বামী পুত্রদের অধীন মুক্ত একটা স্বাতন্ত্র্য পরিচয় দিয়েছিলেন যা ছিলো বৈপ্লবিক। নারীদের সংঘে যোগদানের অনুমোদনে বুদ্ধের ভয়ের ছিলো কারণ তখনো ব্রাহ্মণ ধর্ম তার সংঘের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধচারণ করছিলো। রাজা ও সমগোত্রীয় ধনী বণিক সম্প্রদায়ের অনেকেই গৌতমের বিরুদ্ধে ছিলেন কেননা বহু ধনী পরিবারের ছেলে সংসার ত্যাগ করে সংঘে সন্ন্যাসী হয়ে চলে এসেছিলো। কাজেই গৌতম সংঘে নারীদের স্থান দিয়ে বিরুদ্ধবাদীদের সমালোচনা ও সন্দেহ করার সুযোগ তুলে দিচ্ছেন সেটি তিনি ভেবেছিলেন। একই সঙ্গে এটি মনে রাখতে হবে বুদ্ধ নারীদের পুরুষের মত সমান যোগ্যতা সম্পন্ন বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পুরুষের মত নারীরাও সমানভাবে নির্বান লাভের জন্য দ্রুত তৈরি হতে পারে। এই কথার মধ্যে দিয়ে বুদ্ধ নারী ও পুরুষের মেধার বিষয়ে যে লিবারাল চিন্তা করতেন বুঝা যায়। সম্ভবত, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরবর্তীকালে সংঘে পুরুষ সন্ন্যাসীদের নারী ভিক্ষুনীদের চাইতে উপরে উঠতে আলোচিত বুদ্ধের ‘আট শর্ত’ জুড়ে দেয়া হয়। এগুলো ঘটেছিলো মনে হয় বুদ্ধের মৃত্যুর দুইশো বছরের মধ্যে যখন ত্রিপিটক সংকলিত করা হচ্ছিল।

 

সন্ন্যাসী জীবনের শুরুতে বুদ্ধ ‘সংঘ’ করতে চাননি। পরে মত বদলে ছিলেন। ভাগ্যিস তিনি তার দর্শন প্রচার করেছিলেন। না হলে এই পৃথিবীতে অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে চেপে থাকত। কিন্তু সংঘকে অন্য সব ধর্মের মত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির ক্রীড়নক হয়ে উঠতে বুদ্ধ জীবদ্দশাতেই দেখে গেছেন। বুদ্ধের বয়স তখন আশি। সে সময় সংঘের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠল। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জড়িত হন বুদ্ধের শ্যালক দেবদত্ত। বুদ্ধের জন্য নিবেদিতপ্রাণ রাজা বিম্বিসাকে উত্খাতে রাজকুমারকে সহায়তা করে ‘রাজ-সন্ন্যাসীতে’ পরিণত হোন দেবদত্ত। এমনকি বুদ্ধকে সরিয়ে নিজেকে সংঘের সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চান। বুদ্ধকে পদত্যাগ করে নিজেকে সংঘের প্রধান দাবী করার ঘোষণা প্রত্যাখ্যাত হবার পর দেবদত্ত রাজা বিম্বিসার পুত্র অজাতশত্রুর কাছে প্রস্তাব রাখেন তাদের ক্ষমতায় যাবার পথের কাঁটা দুই বৃদ্ধকে পরস্পর খুন করছি না কেন? রাজপুত্র সেকথা শুনে পিতাকে হত্যা করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন এবং স্বীকারোক্তি করেন তার সঙ্গে সন্ন্যাসী দেবদত্ত জড়িত। সেনা প্রধান পুরো সংঘকে ধ্বংস করতে চাইলে রাজা বিম্বিসার বাঁধা দিয়ে বলেন, গৌতম বুদ্ধ তো আগেই দেবদত্তকে বহিস্কার করেছিলেন। রাজার হস্তক্ষেপে সংঘ সে যাত্রায় নিশ্চিত ধ্বংস হতে রেহাই পায়। বিম্বিসার পুত্রকে ডেকে জানতে চাইলেন কেন তাকে হত্যা করতে চাইছিলো সে? অজাতশত্রু জানাল রাজ শাসন চায় সে। বিম্বিসার বুদ্ধের অনুসারী হয়েছিলেন এই লোভ লালসা ক্ষমতার জন্য মানুষের নিচতা দেখে ক্লান্ত হয়ে। তিনি পুত্রের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে সন্ন্যাসী জীবন বেছে নিলেন। পুত্র ক্ষমতা হাতে নিয়েই পিতাকে গ্রেফতার করিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করলেন, না খাইয়ে তার মৃত্যু হবে। ক্ষমতা যখন পাকাপোক্ত হলো তখন বুদ্ধকে হত্যা করতে গুপ্তঘাতক পাঠানো হলো সংঘে। কিন্তু ঘাতক ছোরা মারতে গিয়ে বুদ্ধকে দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। বুদ্ধ হাসি মুখে বললেন, এসো, কি করতে চাও তুমি…। শিষ্যে পরিণত হলেন ঘাতক। আরো কয়েকবার হত্যার হাত থেকে বেঁচে গেলেন বুদ্ধ। পাথর চাপা দিয়ে মারতে চেয়েছিলো দেবদত্ত। সফল হয়নি। শেষে দেবদত্ত আত্মহত্যা করেন বলেন বৌদ্ধ কিছু কিছু সোর্স দাবী করে। রাজা অজাতশত্রু সব রকম চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু অজাতশত্রুর বিভিন্ন রাজ্যে হামলা চালানোর বিষয়ে বুদ্ধ সুখি ছিলেন না। তিনি আশ্রম ছেড়ে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হোন। পথে দেখা হয় ‘আম্রপালি’ আম খ্যাত বারবণিতার সঙ্গে। বুদ্ধকে খাবারের নিমন্ত্রণ জানালে বুদ্ধ তা গহণ করেন এবং তাকে ধর্ম্ম উপদেশ দেন। সন্ন্যাসীতে পরিণত হোন আম্রপালি। আম্রপালি সংঘের জন্য তার আম বাগানটি দান করে দেন। এখানে থেকে বুদ্ধ আরো দূরে নির্জন কোন স্থানে বেরিয়ে পড়েন। দুর্গম পথ পাড়ি দিতে থাকেন বৃদ্ধ শরীরে। মাঝ পথে শতাধিক ভিক্ষুদের সকলকে চলে যেতে বলে শিষ্য আনন্দকে রেখে। শরীর ভেঙ্গে আসছিলো গৌতমের। বুঝতে পারছিলেন মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। তার আগে ভিক্ষুদের কাছে বিদায় নিতে হবে। তাদের উদ্দেশ্যে গৌতম বলেন, সংঘের কোন প্রধান নেই। প্রতিটি ভিক্ষু অন্যের কাছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। ভিক্ষুর মুক্তি ধ্যানে। সংঘের কে প্রধান, কে চালাবে, এ জন্য তারা পথে বের হননি। অন্য আর সব ধর্মের মত বৌদ্ধরা চালিত হবে না…।

 

গৌতমের জীবনে অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলো। কুন্ডু নামের একজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। কুন্ডু ভোজে বুদ্ধকে শুকোরের মাংস খেতে দিলেন। বুদ্ধ কখনোই জীবিত কোন জীবের মাংস খাননি। কিন্তু সেদিন খেলেন। বাকী খাবারটুকু মাটি চাপা দিয়ে দিতে বললেন কারণ এই খাবার দেবতারাও খাবার যোগ্য নয়। এই কথার মানে ছিলো। বিশেষজ্ঞরা কেউ বলেন, কুন্ডু খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। সে রাতে বুদ্ধ রক্তবমি করেন। অসুস্থ হয়ে যান। কিন্তু যাত্রা বিরতি না করে পথ চলতে থাকেন। ‘কুশিনারা’ নামের এক স্থানের শালবনে তিনি দেহ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এখানেই আশি বছর আগে এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে বুদ্ধ জন্মে ছিলেন। শিষ্য আনন্দকে বলেন, বিষন্ন হয়ো না, দু:খ করো না। আমি তো তোমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছি জগতে কোন কিছু্‌ স্থানী নয়। জীবনের কোন কিছুই স্থায়ী নয়। নির্বান লাভের তখনই সমাপ্ত হবে যখন জীবনের এই মিমাংসাগুলিতে সহজভাবে নিতে শিখবে… হতাশ হয়ো না আনন্দ, চেষ্টা করো, নিশ্চয় তোমার নির্বান লাভ হবে…।

 

গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে আমার সীমিত পড়াশোনা তাকে নিয়ে লেখালেখি করা এক প্রকার দু:সাহসিকতা। বুদ্ধকে বুঝে ফেলেছি সে দাবী অবশ্যই আমি করব না। বুদ্ধকে আমাদের মত ‘নির্বান’ লাভ না হওয়া সংসারী মানুষের পক্ষে জাজমেন্ট না দেওয়াই ভালো। আমিও সে চেষ্টা করিনি। আমি শুধু সাধারণ পাঠককে বুদ্ধকে জানার প্রাথমিক দরজা জানালার সন্ধান দিয়ে এটুকু শুধু বলে দিতে চাই, বুদ্ধকে নিয়ে আজকের বিশ্বেও সমান প্রাসঙ্গিকতা রয়ে গেছে। পশ্চিমা চিন্তকরা বুদ্ধকে বলেছেন ‘লাইট অব এশিয়া’। এটা আংশিক সত্য। পুরো সত্য হচ্ছে বুদ্ধ পুরো পৃথিবীর আলো! কেননা বুদ্ধ মানুষের জীবন যাপনের শাস্ত্র দিয়ে যাননি। বলেননি রাষ্ট্র বানাও। বলেনি, মেয়েদের কিভাবে ঘরের মধ্যে পুরুষের চোখের আড়ালে থাকতে হবে। বলেননি কিভাবে পুরুষ কয়টি স্ত্রী নিয়ে ঘর করবে। গৌতম চিরকালীন সমাধান দেয়ার চেষ্টা করছেন যে সমাধান মানুষ মঙ্গল গ্রহে বসবাস শুরু করলেও প্রয়োজন ফুরোবে না। মানসিক মুক্তি! প্রশান্তি। “নির্বান” লাভ। মানুষ অসুখি, ডিপ্রেশনে আছে, অসুখি বলেই অন্যকে খুঁচিয়ে অসুখি করতে ভালোবাসে। বুদ্ধ এ কারণেই মানুষের জন্য বড্ড প্রয়োজনীয়। আজকের অশান্ত যুদ্ধ বিগৃহ রক্তপাত হানাহানির কালে… বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি… আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম…। বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর পরও মানব জীবনে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

 

[ক্যারেন আর্মস্ট্রং লিখিত ‘বুদ্ধ’ থেকে তথ্য নিয়েছি। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণগুলো আমার]

 

-সুষুপ্ত পাঠক

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix