গোলাম সরওয়ারেরে উত্তরাধিকারীদের ‘নিও দেশভাগের ইতিহাস’!

“পূর্ববঙ্গের গরীব মুসলমান প্রজা বনাম হিন্দু সম্প্রদায়”- এই রকম ‘নিও দেশভাগের ইতিহাস’ রচিয়তাদের নতুন আমদানী ঘটেছে বলতে আমি নারাজ। বরং তারা একটা দীর্ঘ রিলে দৌড়ের উত্তরাধিকারী। সে রিলে দৌড়ের লাঠি বহন করে চলেছে যে নামগুলো, একত্রে রাখলে পাঁচমেশালী জাত গোত্রের যে বাজার বসবে তাতে ভ্রুকুটি করে হজম করে নিতে কষ্ট হবে জানি। বাম থেকে মুসলিম লীগ, জামাত থেকে ইসলামপন্থি যত গ্রুপ আছে সকলেই এই রিলে দৌড়ে অংশ নিয়েছে। ছফা-রাজ্জাক থেকে গোলাম আযম খাজা নাজিমুদ্দিন থেকে শেরে বাংলা হয়ে শেখ মুজিব- সকলেই একটা সময় পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ইনডেমনিটি করতে এই ইতিহাস রচনা করতেই হয়েছে।

জমিদার কেবল হিন্দুরাই ছিলো না, মুসলমান জমিদার কি প্রজার প্রতি আলাদা আচরণ করত? গোটা সুলতানী আমলে পূর্ববঙ্গের হিন্দু মুসলমান কৃষক তাদের গায়ের চামড়া বরগা দিয়েছিলো তুর্কি আরবী আফগান দস্যুদের কাছে। এই প্রজারা কি সুলতানদের ভোগ বিলাশের খাজনা জোগান করত না? নাকি তখন মুসলমানদের রাজ দরবারে বসিয়ে পাখার বাতাস খাওয়ানো হত? এই দেশের মানুষ সুলতান, মুঘল, ইংরেজ সকলের জন্যই খেটে মরেছে। সুলতানী আমলের কথা বলতে গিয়ে যারা গর্বে গর্বিত হয়ে যান, যারা একই সঙ্গে হিন্দু জমিদারদের হাত থেকে মুসলমানদের মুক্তির সোপান হিসেবে পাকিস্তানকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে জায়েজ করেত চান তারা সুলতানী আমলের এই ইতিহাস মুছে ফেলতে পারবেন? দীনেশচন্দ্র সেন যিনি হিন্দু-মুসলমানের প্রীতিময় সম্পর্ক বর্ণনা করতে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন তিনিও ‘বৃহৎ বঙ্গ’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘মুসলমান রাজা এবং শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ সিন্ধুকী (গুপ্তচর) লাগাইয়া ক্রমাগত সুন্দরী হিন্দু রমনীগণকে অপহরণ করিয়াছে। ষোড়ষ শতাব্দীতে ময়মনসিংহের জঙ্গলবাড়ির দেওয়ানগণ এবং শ্রীহট্টের বানিয়াচঙ্গের দেওয়ানেরা এইরূপ কত যে হিন্দু রমণীকে বলপূর্বক বিবাহ করিয়াছেন তাহার অবধি নাই! পল্লী গীতিকাগুলিতে এই সকল করুণ কাহিনি বিবৃত আছে’।

অথচ একটি বিশেষ সামন্ত ব্যবস্থার ভূমালিকদের (যারা হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই হতো) পাশ কাটিয়ে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের হয়ে যারা কমিউনিটিতে শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতেন বণিক, উকিল, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, কৃষক সকলকে “হিন্দু জমিদার” ও “মহাজন” খোদাই করা তমকা লাগিয়ে তাদের হাত থেকে গরীব মুসলমান কৃষকদের মুক্তির কথা বলা হচ্ছে! পূর্ববঙ্গে ‘কৃষক প্রজা লীগ’ পার্টি ছিলো পূর্ববঙ্গের কৃষকদের জমির উপর ন্যায্য অধিকার আদায় ও জমিদার প্রথা বিলোপ করে কৃষকের অধিকার আদায় করার রাজনৈতিক দল। ফলে পূর্ববঙ্গের শুধু মুসলমান কৃষকই নয়, হিন্দু কৃষকরাও শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে উঠে। কোলকাতার জমিদারদের এখানে জমিদারী উঠে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হলে জমিদাররা ক্ষুব্ধ হবে সেটাই স্বাভাবিক। এটা ছিলো জমিদার শ্রেণীর সঙ্গে কৃষকের লড়াই। কিন্তু তার আড়ালে যে ছিলো মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম নিরুঙ্কশতার গোপন নকশা সেটা বেরিয়ে আসে ইতিহাসের ধাপে ধাপে। নোয়াখালীর গোলাম সরওয়ার কৃষকের খাজনা মওকুফ, ঋণ সালিশি বোর্ড থেকে সুদখোর ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ, জমিদারি বাজার বয়কট করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে নোয়াখালীর হিন্দু জমিদার মহাজনদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন। আর এই সুবাদে দরিদ্র হিন্দু ও মুসলিম কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের নিজস্ব দেশ ও সেটা গড়তে এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু ও ধনী হিন্দুদের না তাড়ালে, এমনকি জমির উপর মুসলিম কৃষকদের নিরুঙ্কশ অধিকার বজায় রাখতে হিন্দু কৃষকের দেশান্তরীন ব্যতিত মুসলমানদের সেই স্বপ্নের দেশ আসলে হিন্দুদের হাতেই পরিচালিত হবে। কারণ মুসলমানরা ছিলো সব জায়গায় পিছিয়ে। ফলে ‘প্রলেতারিয়েতদের নেতা’ পীরজাদা গোলাম সরওয়ার সেই গরীব কৃষক হিন্দুকেও তার জিহাদের তলোয়ার থেকে রেহাই দেয়নি। জমিদার বাড়িতে হামলা করে জমিদার পরিবারকে হত্যা করা নিশ্চয় বিপ্লবীদের কাছে ‘শ্রেণী শত্রু খতম’ করার মত পবিত্র কাজ বলে ধরা হয় কাজেই সেই হত্যার বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেসা করলাম না। কিন্তু সাধারণ দরিদ্র হিন্দু, রাজনীতিবিদ, উকিল, ব্যবসাদার, তাদের দোকানপাট, বাড়িঘরে হামলা, ধর্মান্তকরণ, নারীদের ধর্ষণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ খুলে দেয়। অর্থ্যাত পূর্ববঙ্গে হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের দুর্বল করতে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে লাহোর প্রস্তাব সবই ছিলো মুখোশ লাগানো সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ৪৬-৪৭ সালের পূর্ববঙ্গে হিন্দু ম্যাসাকার সেই মুখোশ খুলে গিয়েছিলো।

জমিদার প্রথার সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়কে এক করে পূর্ববঙ্গের দেশভাগের ফলাফলকে বাঙালী মুসলমানদের স্বাধীনতা মুক্তির সোপান দেখিয়ে যে ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এখন কিছু লোক সেই ইতিহাস নোয়াখালী দাঙ্গার নরঘাতক কৃষক প্রজা লীগের গোলাম সরওয়ারও লিখতে চেয়েছিল। এটা তাই নতুন কোন ইতিহাস নয়।

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix