গীতিকার শিবলির ফিলিস্তিনিদের নিয়ে কবিতা ও মুস্তফা সওয়ার ফারুকীর ভারতীয় পরিচালক বিরোধীতা

আজকে তিনটি বিষয় আপনাদেরকে দেখাবো। প্রথমটি সাংবাদিক গোলাম মোর্তজা ফেইসবুকে জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল তাহের ফিলিস্তিনিদের পক্ষে যুদ্ধ করতে চাইলে বঙ্গবন্ধুর অনুমতি পাননি। কিন্তু বেশ কিছু তরুণ তখন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে যুদ্ধ করতে ফিলিস্তিনে গিয়েছিলেন তার মধ্যে অন্যতম কর্ণেল তাহেরের ভাই ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীর প্রতীক।

 

বামপন্থিদের আফগানিস্থানে পশ্চিমা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়ার একটি প্রচার বাংলাদেশে আছে। তালেবান অধ্যুষিত আফগানে দখলদার মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করতে গিয়েছিলো এমনটা অনেক বামপন্থিই দাবী করেন। আমরা কাছে সেরকম কোন অথেনটিক সোর্স নেই তাই এই বিষয়ে কখনোই বিস্তারিত লিখতে পারিনি। কিন্তু আমরা সকলেই জানি কিন্তু স্বীকার করি না, ফিলিস্তিনি, আফগানিস্থান বা কাশ্মির- এইসব অঞ্চলের অশান্তি যুদ্ধ ইত্যাদি অবস্থানে আমরা ফিলিস্তিনি আফগানিস্থান কাশ্মিরের পক্ষে থাকি কারণ “তারা মুসলমান”। ফিলিস্তিনিদের নিজেদের যুদ্ধটা তাদের দেশের জন্য, যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু বাকী বিশ্বের মুসলমানদের জন্য সেটা মুসলমান বনাম ইহুদী যুদ্ধ! যদি মানবতার জন্য তারা যুদ্ধে যেয়ে থাকে তাহলে আইএস বিরোধী ইরাক সিরিয়ার সরকারী বাহিনী কিংবা কুর্দি বাহিনীর হয়ে কেউ যুদ্ধ করতে গেলো না কেন? আফগানিস্থানে কেউ তালেবান বিরোধী যুদ্ধে গিয়েছে? ইয়াজিদি নারীদের জন্য শোকগাঁথা জানিয়ে কেউ কবিতা লিখেছে?

 

কবিতার কথা যখন এলো তখন একটি কবিতার কথা বলি। ব্যান্ড সংগীতের এক সময়কার গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী ফিলিস্তিনি হুইলচেয়ারে বসে ইজরাইল সৈন্যদের বিরুদ্ধে ঢিল ছোড়া ‘ফাদি আবু সালাহ’কে নিয়ে একটি কবিতাটি লিখেছেন। এই কবিতাটি আমি পাই জামাত শিবিরের ফেইসবুক পেইজ ‘বাঁশের কেল্লায়’। শিবলি সাহেব কোনদিনই ইয়াজিদি নারীদের জন্য কবিতা লিখবেন না। তিনি ‘ফাদি আবু সালাহ’কে নিয়ে কবিতা লিখলে ‘নাদিয়া মুরাদ’কে নিয়েও কবিতা লেখার কথা! কে নাদিয়া মুরাদ? তিনি ইয়াজিদি নামের একটি ধর্মের অনুসারী হওয়ার কারণে আইএস যোদ্ধাদের হাতে ‘গণিমতের মাল’ হয়েছিলেন। বন্দি শিবিরে তাকে মুজাহিদরা প্রতিরাতে নামাজ শেষ করে এসে ধর্ষণ করত। তার সেই স্মৃতিকথা, হাজার হাজার ইয়াজিদি নারীদের উপর নেমে আসা কেয়ামত নিয়ে তিনি বই লিখেছেন ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে। নির্যাতিত নারীদের কন্ঠস্বর হওয়ার বিশেষ অবদানের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু বাংলাদেশ তথা মুসলিম বিশ্বের মানবতাবাদীদের কবিতা গান সাহিত্যে নাদিয়া মুরাদ ঠাঁই নিতে পারেননি। উল্টো আইএসের উত্কট ইসলাম দর্শনের দুর্গন্ধ ঢাকতে এই ‘মুসলিম বিশ্ব’ আইএসকে ‘ইজরাইল স্টেট’ বানিয়ে ছেড়েছে!

 

আমি যে বললাম ফিলিস্তিনি ইস্যু মুসলমানদের কাছে ইসলাম ও মুসলমান ছাড়া আর কিচ্ছু না- তার প্রমাণ দেখুন লতিফুর শিবলির কবিতায়। তিনি লিখেছেন-

 

“এরপর ওরা কেড়ে নিয়েছে তোমার শৈশব,

অথচ তুমি কখনোই শিশু ছিলে না,

তুমি ছিলে সেই জান্নাতের সবুজ আবাবিল।

আব্রাহার হস্তি বাহিনীর উপর কঙ্কর ছুড়ে যেভাবে তছনছ করে দিয়েছিল,

আজ তাবত পৃথিবী জানে তুমিই সেই আবাবিল,

একই কায়দায় ছুড়ে মারো কঙ্কর আব্রাহাম ব্যাটেল ট্যাঙ্কের দিকে।“

 

পুরো কবিতায় কি করে ইসলাম চলে এলো দেখুন। তাদের মনবতাবাদও যে ইসলাম ও মুসলমান দেখে জাগে সে তো নাদিয়া মুরাদে নিস্পৃহতা থেকে বুঝা যায়। যদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তান না হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে হত তাহলে আসল খেলা দেখতে পারতেন! এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উঁচুমানের সাহিত্য বাঙালী মুসলমান তৈরি করতে পারেনি। ভারত যদি শত্রু হত তাহলে ভাষা উপমায় সহজাত হিন্দু ঘৃণা ও ভারত বিরোধীতা অন্য এক উত্কর্ষতায় নিয়ে যেত। শিবলির কবিতাটি কিন্তু খুবই উঁচুমানের হয়েছে। এটা ঘটেছে তার ভেতরের সহজাত মুসলিম চেতনা ও তীব্র ইহুদী বিরোধীতার কারণে। এই যে কর্ণেল তাহেরসহ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মধ্যে যারা সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তারা বিপুলভাবেই ‘পাকিস্তান’ যে আদর্শ তার উপর অনুগত ছিলো। কিন্তু অর্থনৈতিক ও জাতিগত বৈষম্য এবং ২৫ মার্চ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প তাদের হাতে ছিলো না। নইলে ৬৫ সালে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে এই ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট খুবই প্রশংসা কুড়িয়েছিলো। কাজেই তাদের গোপনে ফিলিস্তিনি হয়ে যুদ্ধ কিছুতে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ থেকে ছিলো না।

 

এবার তিন নম্বর বিষয় নিয়ে কথা বলে শেষ করি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে সিনেমাটি তৈরি হচ্ছে সেটি ভারতীয় পরিচালক দিয়ে বানানোয় আপত্তি তুলেছেন মুস্তফা সরওয়ার ফারুকী। ভারতীয় পরিচালক দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিনেমা না বানানোর যুক্তি হলো “যেহেতু বঙ্গবন্ধু বিরোধীদের অভিযোগ প্রোপাগান্ডা যা-ই বলেন, সেটা হলো বঙ্গবন্ধু ভারতের দ্বারা তৈরি করা একজন নেতা, ভারত পাকিস্তানকে ভাঙার জন্য বঙ্গবন্ধুকে তৈরি করেছে”। বাকীটুকু শেষ করেছেন এভাবে, “এখন এসে যখন দেখি বঙ্গবন্ধুর জীবনী বা ইমেজ বানানোর দায়িত্বটা ভারতের একজন ফিল্মমেকারকে দেয়া হয়, আমি তখন ঐ মিটিংয়ে বলেছিলাম, তখনকি আমরা অজান্তেই ঐ প্রোপাগান্ডাটার হাতে যুক্তি তুলে দেই কী-না৷ এটা আমি তাদেরকে বিবেচনা করতে বলেছিলাম৷’’

 

ফারুকী নিজেই যে বঙ্গবন্ধুকে ভারতের বানানো নেতা, এবং পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য ভারতের চক্রান্ত ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে অন্যচোখে দেখে না সেটি কালে কালে যেদিন মিলিয়ে নিতে পারবেন তখন আমরা এই লেখাটির কথা স্মরণ করবেন। এই মূর্খ জামাতী পরিচালকটিকে মনে করিয়ে দিবেন, বিখ্যাত ‘গান্ধি’ সিনেমার পরিচালক একজন ব্রিটিশ ছিলেন। তিনি রিচার্ড অ্যাটেনবরো! গান্ধিকে তার বিরোধীরা নানাভাবে অপমান করে। তার মধ্যে “ব্রিটিশদের দালাল” অন্যতম। তাই বলে একজন ব্রিটিশ রিচার্ড অ্যাটেনবরো তাঁকে নিয়ে সিনেমা বানালে কেউ প্রশ্ন তুলেনি। ফারুকীর আসল জ্বালাটা আমরা বুঝি! যতই এদেশের মানুষ দেশপ্রেম দেখাক নিজের স্বজনের চিকিত্সা নিয়ে ছেলেখেলা করে না। তাকে দেশের বাইরে চিকিত্সা করাতে নিয়ে যায়। কারণ সকলেই দেশের স্বাস্থসেবার বেহাল অবস্থার কথা। ভারত বিরোধী বাংলাদেশী মুসলমানদের ভারতে চিকিত্সা নিতে যাবার স্রোত দেখে বুঝা যায় পাগলেও নিজের ভালো বুঝে! শেখ হাসিনাও জানে তার বাবাকে নিয়ে সিনেমা করতে দিলে ফারুকী কিংবা অমিতাভ রেজা কি জঘন্ন ছাইপাশ বানিয়ে ফেলবে। ফারুকীরা থাকতে ভারতের পরিচালকদের কেন ডাকতে হয়, সেটা বিকেএমইএ ও বিজিএমই নামের দুটি গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠনকে জিজ্ঞেস করে দেখুন এই সেক্টরে বিপুল কর্মসংস্থান থাকার পরও কেন দেশীয় ছেলেমেয়েদের বদলে ভারতীয় ও শ্রীলংকার ছেলেমেদের বেশি বেতনে রাখতে হয়? ফারুকীদের অন্ধ ভারত বিরোধীতা শুধু শুধু কি বাড়ছে! শ্যাম বেনেগেলের কারণে আরো বাড়বে!

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix