কিছু মিথ্যাচার খন্ডন

সুষুপ্ত পাঠক: ধর্মের প্রশ্নে মুসলমান মাত্রই মিথ্যুক, অসৎ, ঠগবাজ…। ইসলাম সম্পর্কে অমুসলমানদের মুগ্ধতা বিষয়ে সারাবিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে যে সব কাহিনী প্রচলিত আছে তার সবই নির্জলা মিথ্যায় ভরপুর। অনেক ক্ষেত্রে সত্যকে এমনভাবে বিকৃত করা হয় যা জানলে যে কোন আত্মসন্মানবোধ সম্পন্ন মুসলমানই লজ্জ্বা পাবে। যেমন মহাকবি দান্তের ডিভাইন কমেডিতে হযরত মুহাম্মদের উল্লেখ আছে জানিয়ে একবার আমার কলেজের প্রফেসর বুঝাতে চেয়েছিলেন আমাদের নবী সম্পর্কে অমুসলমানদের কত আগ্রহ! ডিভাইন কমেডি আমার সেই শিক্ষক জীবনে পড়েও দেখননি নিশ্চিত। যদি পড়তেন তাহলে জানতেন, দান্তের নরকে ঈশ্বর মুহাম্মদ এবং তার সাহাবী আলীকে পাপের কারণে শাস্তি দেয়ার কথা উল্লেখ আছে!

মুসলমানদের মধ্যে আরেকটি জনপ্রিয় অপপ্রচার হচ্ছে মাইকেল এইচ হার্টের লেখা “A ranking of the most Influencial persons in History” বই নিয়ে। প্রথমেই বাংলাতে এই বইটির নাম অর্থগতভাবে বিকৃত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই বইটির অনুবাদ করা হয়েছে বিশ্বের একশজন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ! অথচ হার্ট তার বইয়ের নাম দিয়েছেন যার বাংলা করলে অর্থ হয় “ইতিহাসের সবার্ধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিগণের তালিকা”। এই বইটি হার্ট হিটলারকেও রেখেছেন তালিকায়। কারণ তিনি বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লিস্ট করেছেন। সেখানে নরপিশাচ থেকে সাধুসন্ত যারাই তাদের সময় পৃথিবীকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন তাদেরকেই তিনি তালিকাতে রেখেছেন। সেক্ষেত্রে হার্টের মনে হয়েছে তিনি তালিকায় হযরত মুহাম্মদের নাম সবার আগে রাখবেন তাই তিনি রেখেছেন। হার্টের মুহাম্মদের নাম সবার আগে রাখার অন্যতম কারণটি ছিলো, মুহাম্মদ সেই সপ্তম শতাব্দীতে নিজে একটি ধর্ম তৈরি করে, একজন সেনানায়ক হিসেবে রাজ্য বিস্তার করে আরব জাতীয়তাবাদকে ‘মুসলিম’ পরিচয়ে এক করে বাধতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মুহাম্মদের এই দর্শন প্রায় সমগ্র বিশ্বকে ইসলামী খিলাফতের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছিলো। এ জন্য ইসলাম ও তার ফাউন্ডার মুহাম্মদ ছিলো সপ্তম শতাব্দীতে সবচেয়ে আলোচিত। মাইকেল এইচ হার্টের লেখা বইও মুসলমানরা পড়ে দেখেনি। যদি দেখত তাহলে ভুলেও তারা এই বইয়ের নাম মুখে নিতো না। কারণ হার্ট তার বইতে মুহাম্মদকে প্রথমে স্থান দিয়ে তার নবীত্ব যে সবই গাঁজাখুরি গল্প সেটা স্পষ্ট করে বলেছেন এভাবে, “…Moreover, he is the author of the Moslem holy scriptures, the Koran…”। অর্থ্যাৎ, মুহাম্মদ যে নিজেই কুরআন লিখেছে এই বইতেই সেটা হার্ট জানাচ্ছেন। অথচ এই বই দেখিয়েই মুসলমানরা মুহাম্মদকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলে দাবী করে!

ঐতিহাসিক গিবন, টমাস কারলাইল, যাযক রেভারেন্ড আর বসওয়াথ স্মিথ, ফরাসি ঐতিহাসিক মসিয়ে লা মার্টিন প্রমুখদের উক্তি মাঝে মাঝেই উল্লেখ করে মুসলমানদের দেখা যায় তাদের নবীর সত্যতা সম্পর্কে প্রচার করতে। এটাও একটা বিকৃত অপপ্রচার। কারণ ইনারা কেউই মুহাম্মদকে নবী হিসেবে মান্য করে কোন মন্তব্য করেননি। বরং মুহাম্মদকে একজন জেনারেল হিসেবে আলোচনা করেছিলেন। তার যুদ্ধ নীতি, যুদ্ধাপরাধ নিয়েও আলাপ করেননি, করেছেন সপ্তম শতাব্দীতে আরবের ছোট ছোট গোত্রগুলো একত্র করে একটি ‘জাতি’ গঠন করার প্রশংসা…। আলোচকদের সকলেই ধর্ম বিশ্বাসে ছিলেন খ্রিস্টান এবং কেউই খ্রিস্টান ধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেননি। যদি কোন অমুসলিম কুরআনকে ঐশ্বরিক গ্রন্থ এবং মুহাম্মদকে সত্যিকারের ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগকারী মানুষ হিসেবে মনে করেন তাহলে তার ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ না করাটা অস্বাভাবিক। মরিস বুকাইলি যেমন সৌদিদের টাকা খেয়ে বই লিখে বাইবেলকে ভুল এবং কুরআনকে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক উল্লেখ করেও নিজের খ্রিস্টান ধর্ম আকড়ে ছিলেন। মুসলমানরা যদিও মনে করেন খ্রিস্টান এই ডাক্তার কুরআনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এই ডাঁহা মিথ্যেটি মুসলিম বিশ্বে আজো ব্যাপক জনপ্রিয়। অথচ ইউলিয়াম ক্যাম্পেবেল নামের অপর একজন খ্রিস্টান ডাক্তারের সঙ্গে ই-মেইল চ্যাটিংয়ে বুকাইলির মুসলিম হবার কোন প্রমাণ মেলে না বরং বুকাইলি তা অস্বীকার করেন।

এখানে সেই ই-মেইল পড়তে পারেন: Is Dr. Maurice Bucaille a Muslim?

প্রতারণা করে মানুষকে ইসলামে বিশ্বাসী করার এই প্রবণটা যে কোন ধর্ম বিশ্বাসী মুসলিম মাত্রই সত্য। একজন একটা মিথ্যা প্রচার করলে বাকীরা সেটা যাচাই না করেই বিশ্বাস করে রীতিমত ব্যক্তিগত মিশনারি প্রচেষ্টায় সেই মিথ্যাকে প্রচার করতে থাকে। যেমন বাইবেলে মুহাম্মদের কথা ছিলো সেটা খ্রিস্টানরা বাদ দিয়ে দিয়েছে। এই কথার পিছনে কোন রকম ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণপত্র দেখারও মুসলমানদের টাইম নেই। তারা অবলীলায় এই তথ্য নিজেদের মধ্যেই কেবল চালাচালি করে তা-ই নয়, সুযোগ পেলেই খ্রিস্টানদের মুখের উপর বলে বসে। অথচ ৩৫০ খিস্টাব্দে হাতে লেখা সবচেয়ে প্রাচীন বাইবেলের কপি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। অর্থ্যাৎ মুহাম্মদের জন্মের ২২০ বছর আগে লেখা বাইবেলেও মুহাম্মদের নাম নিশানা পাওয়া যায়নি। কেমন করে মুহাম্মদের জন্মের ২০০ বছর আগেই খ্রিস্টান মিশনারিরা জানবে মুহাম্মদ নামের কেউ জন্মাবে? সত্যিই যদি তারা বিশ্বাস করত মুহাম্মদ নামের কেউ জন্মাবে যার ভবিষ্যতবাণী বাইবেলে লেখা আছে তাহলে কি একজন ধার্মীক ঈশ্বর বিশ্বাসী খ্রিস্টান হিসেবে বাইবেলকে বিকৃত করার মত অপরাধ কেউ করতে পারত? এই সংক্রান্ত আমার একটা লেখা আছে যেখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আগ্রহীরা লেখাটি দেখতে পারেন: হযরত মুহাম্মদের আগমনী বার্তা কি ইহুদী-খ্রিস্টানদের কিতাবে উল্লেখ আছে?

শুধু কি বাইবেল? হিন্দুদের বেদেও মুহাম্মদের জন্মের কথা লেখা আছে বলে দাবী করা হয়! ভবিষ্য পুরাণ নামে হিন্দুদের কিছু গল্পগাথাতে মুহাম্মদের ইঙ্গিত থাকার দাবী করা হয়। সর্বপ্রথম আহমদিয়া মুসলিমদের ইমাম মির্জা গোলাম আহমদ শ্রীকৃষ্ণকে নবী বলে দাবী করেছিলেন। গোলাম আহমদ নিজেকে সর্বশেষ নবী বলে দাবী করে মুসলমানদের অন্যান্য গ্রুপের কাছে কাফের হিসেবে নিন্দিত হলেও এখানে দিব্যি জাকির নায়েক গোলাম আহমদের থিউরীকে গ্রহণ করতে পিছু হটেনি। ভবিষ্য পুরানে মুহাম্মদের ইঙ্গিত বলে যেটা দেখানো হয় সেটা ধরলে মুহাম্মদকে নরাধাম পিশাচ হিসেবেও মানতে হয়। মুসলমানরা কি এভাবে তাদের নবীকে নিকৃষ্ট অর্থে হিন্দুদের কিতাবে দেখতে চায়? এই সংক্রান্ত বিস্তারিত লেখাটা এখান থেকে দেখতে পারেন: হযরত মুহাম্মদের আগমনী বার্তা কি হিন্দু ধর্মে উল্লেখ আছে?

পৃথিবীর যে কোন বিখ্যাত অমুসলিম ব্যক্তিত্বের নাম দিয়ে মুহাম্মদের প্রশংসা করিয়ে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা বহু পুরোনো একটি মুসলিম রীতি। এক্ষত্রে কিছু জনপ্রিয় কাহিনী প্রচলিত আছে যেমন সাহিত্যিক বাণার্ড শ’ মুহাম্মদের প্রশংসা করেছেন। ‘জেনুইন ইসলাম’ নামে এক বইতে নাকি শ’ এই কথা বলেছেন। কার্যত জেনুইন ইসলাম নামের কোন বই-ই নেই। এটি একটি ম্যাগাজিন যা একবার মাত্রই প্রকাশিত হয়েছিলো। শ’ কস্মিনকালেও ইসলাম ও মুহাম্মদের কোন প্রশংসা করেননি। সবটাই তাকিয়া করা হয়েছে শ’ নামে। ইন্টারনেটে শ’ নামে যে মিথ্যাচার চলে তার সব থেকে প্রামাণ্য দলিল বা উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ হিসেবে পাঠকদের এই লেখাটি কৌতুহল মেটাতে পারবে। এখানে দেখানো হয়েছে শ’ নিজস্ব বক্তব্য এবং তাকে নিয়ে জেনুইন ইসলামেসহ অন্যান্য ইসলামী কাগজের মিথ্যাচারের নমুনা:

Being an Unforgivably Protracted Debunking of George Bernard Shaw’s Views of Islam

এই বিষয় নিয়ে আমি আগেও লিখেছি। আরো অনেকেও আগে লিখেছে। তবু লিখলাম কারণ আমার পোস্টে এবং ইনবক্সে প্রচুর মানুষ আমাকে হেদায়েত দেয়ার আশায় বলেন অমুক তমুক ইসলামের প্রশংসা করেছে ইত্যাদি। আমার মনে হয় পুরোনো বিষয় নিয়ে আবার লেখায় আমার বন্ধুরা বিরক্ত হবেন না। কারণ লেখাগুলোর অবিরাম মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। ইন্টারনেটে ইসলামের এরকম মিথ্যা ঠগবাজি প্রচারণা হাজার হাজার হলেও সেইসব মিথ্যার জবাব দেয়া লেখা হাতে গুণা দুই একটা। নতুনদের অনেকেই হয়ত আসল সত্যগুলো জানে না…।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix