কাশি মথুরাতে মসজিদ বানাল কে ও আমাদের করণীয়

হিন্দু ধর্মীয় তীর্থস্থান কাশি ও মথুরাতে শাহি মসজিদ আছে এটি ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার যে সংস্কৃতি তার পরিচয় বহন করে। পক্ষান্তরে দুটি প্রাচীন হিন্দু তীন্থস্থানে মুঘলদের মসজিদ নির্মাণ তাদের অসহিষ্ণু ধর্মীয় সংস্কৃতি পরিচয়ই বহন করে। কাজেই বর্তমানে কাশিতে ‘জ্ঞানবাপী মসজিদ’ আসলে কোন মন্দিরের উপর স্থাপিত হয়েছিলো কিনা সেটি খনন করে দেখার আদালতের রায়টি তাই ভারতীয় সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি বিরোধী। ইতিহাসে মুসলিম শাসনের আগ্রাসনের স্বীকৃতি থাকুক, সেই ইতিহাসকে খুড়ে এখন রক্ত বের করার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

মক্কা মদিনা জেরুজালেম যেমন মুসলমানদের কাছে পরম তীর্থস্থান হিন্দুদের কাছে কাশি মথুরা ঠিক তেমনি। এসব স্থানে দেবতাদের বসবাস ছিলো বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করে। আপনি জেরুজালেমে একটিও মন্দির আবিস্কার করে দেখাতে পারবেন? ইহুদীদের ‘সোলাইমানের মন্দির’ ঠিক পৌত্তলিকদের মন্দির নয়। কারণ আব্রাহামিক ধর্মের অন্যতম বৈশিষ্ঠ হলো তারা প্রবলভাবে পৌত্তলিক বিরোধী। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বহু মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে তাদের পবিত্রতার কাছে। এই দুটি ধর্মের উপর এক কাঠি বেশি উগ্র ইসলাম জেরুজালেমে মসজিদ তৈরি করেছে। মক্কা মদিনাতে শত শত মন্দির থাকার পরও ইসলাম তার একটিও প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য হিসেবে আস্ত রাখেনি। মক্কাতে কেউ মন্দির গির্জা দেখাতে পারবেন? পারবেন না। তাহলে কাশি গয়াতে মসজিদ কেমন করে হলো? জেরুজালেমে ‘আল আকসা মসজিদ’ করার কোন প্রয়োজনই ছিলো না কারণ সেটি হাজার বছর আগে থেকে ইহুদী খিস্টানদের তীর্থস্থান। মুহাম্মদ জেরুজালেমে গিয়েছিলেন তার ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ নেই। কথিত মিজার গমনের সময় এখানে যাত্রা বিরতি করেছিলেন প্রফেট মুহাম্মদ এরকম বিশ্বাসকে ভিত্তি করে জেরুজালেমে মসজিদ তৈরি ছিলো অন্যের ধর্মীয় তীর্থস্থানে নিজের ধর্মকে জানান দেয়ার চেষ্টা। হিন্দুরা বিশ্বাস করে লোকনাথ ব্রাহ্মচারী কাবাঘর দর্শন করতে গিয়েছিলেন, তাহলে এখন কি কাবার পাশেই একটা লোকনাথ মন্দির করা উচিত? কাশি গয়াতে মসজিদ থাকতে পারলে এবং সেটাকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতীক দেখাতে পারলে কাবাঘরের পাশে একটা পৌত্তলিক মন্দির থাকুক!

না, আমি আসলে এগুলোর কিছুই চাই না। এসব বলার একটাই অর্থ, আমাদের বুঝতে হবে অতিতে অনেক অন্যায় অবিবেচনা প্রসুত ঘটনা ঘটে গেছে যা কাম্য ছিলো না। সেটি স্বীকার করে নেয়া উচিত আমাদের। তাহলেই কেউ মসজিদ খুড়ে মন্দির ছিলো কিনা সেটা দেখতে জোরজুরি শুরু করবে না। এইসব রাজনৈতিক ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট আসে জনগণের ভেতরে থাকা পুঞ্জিভূত ক্ষোভকে পুঁজি করেই। কারণ জনগণ যদি ইতিহাস বইয়ে  স্বীকৃতি পেত প্রাচীন শাসনামলের রাজা বাদশাহরা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলেন যা ছিলো ভুল তাহলে জনগন মনে হয় না মন্দির খোজার চেষ্টা করত। ১৯৯১ সালে ভারতের আদালতের দেয়া রায়ের সঙ্গে আমি একমত যেখানে আদালত বলেছিলো, “অযোধ্যা ছাড়া দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে”।

অর্থাত যেখানে মসজিদ আছে সেখানে মসজিদই থাকবে, যেখানে মন্দির আছে সেখানে মন্দিরই থাকবে। এটাই সমাধান। কারণ ইতিহাসের স্বীকৃতি আর সেটিকে ফের আগের মত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এক নয়। অতিতের অন্যায়ের স্বীকৃতি চাই কিন্তু বর্তমানের শান্তির বিঘ্নিত হোক তা চাই না। মুসলিমরা নিরপেক্ষ ইতিহাসের মাধ্যমে একদিন অনুধাবন করতে বাধ্য হবে তাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রমাণ কথিত মুসলিম শাসনে মন্দির ও গির্জাগুলোকে মসজিদ বানিয়ে দেয়া। তুরস্কের হাইয়া সোফিয়া গির্জাকে মসজিদ করে দেয়া, কাশিতে ঔরাঙ্গজেবের হাতে মসজিদ নির্মাণ নিয়ে মুসলিমদের লজ্জ্বিত হওয়াই সকলের কাছে কাম্য। বেহুদা ওরাঙ্গজেবকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণের চেষ্টা বরং বর্তমান মন্দির মসজিদ বিতর্কের সময় হিন্দুদের আরো বেশি করে হিন্দুত্ববাদী করে তুলবে। মুঘলরা মক্কার শাসকদের উপঢ়ৌকন পাঠাতেন কেন? মক্কার শাসকদের স্বীকৃতি লাভ কেন চাইতেন? ঔরাঙ্গজেবের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন মক্কার শাসক। সেই মান ভাঙ্গানোর বহু চেষ্টা করেছিলেন ঔরাঙ্গজেব। ভারতের একজন শাসক কেন মক্কার শাসকের কাছে দায়বন্ধ থাকবে? সেই ধারাবাহিকতাতেই আমরা দেখি ইংরেজ শাসনে তুরস্কের ইসলামী খিলাফত ও তার খলিফার পক্ষে ‘খিলাফত আন্দোলন’ শুরু করে ভারতীয় মুসলমানরা। পরাধীন ভারত নিয়ে তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের খলিফা হচ্ছে ইসলামী খিলাফতের শেষ খলিফা!

শেষ করি কাশি মসজিদ বিতর্কে ভারতীয় প্রগতিশীলদের ধন্যবাদ জানিয়ে। কারণ হিন্দু ব্যাকগ্রাউন্ড হবার পরও তারা ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সেক্যুলারিজম ও সংখ্যালঘুদের প্রতি সব সময় সোচ্চার। এটি বাংলাদেশ পাকিস্তানের কথিত প্রগতিশীলদের কাছে আশাও করা যায় না।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix