কাজী নজরুল ইসলাম কেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি?

বাংলাদেশে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে যে আদিখ্যেতা তার একমাত্র কারণ নজরুলকে স্রেফ মুসলিম কবি হিসেবে নিজেদের সম্পত্তি মনে করা। দু:খজনক হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের লিবারালরাও নজরুলকে বরাবর রবীন্দ্রনাথের পাশের চেয়ারটিতেই বসতে দেন যাতে মুসলিমরা খুশি হয়। অপরদিকে হিন্দুত্ববাদীরা নজরুল হিন্দু মেয়ে বিয়ে করায় তাঁকে ‘লাভ জিহাদী’ বলে কুৎসিত আক্রমণ চালায়। তাই দু’পাড়েই নজরুল অত্যন্ত নগ্নভাবে মুসলমান কবি বা মুসলিম সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন।

বলতে গেলে বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লা- এটুকু ছাড়া আর কোন যোগসূত্র নেই। নজরুল মূলত কোলকাতার মানুষ। তার গোটা সাহিত্য সেখানেই লেখা। সেসব বাদ দিলেও নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা ছিলো বড়ই বেমানান। নজরুল ইসলামকে ভারতের জাতীয় চেতনার কবি বলা উচিত। নজরুল ইসলাম ভারতের জাতীয় কবি হতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ যখন প্রবন্ধে লিখলেন, “হিন্দুসমাজের লোকেরা কী বলে সে কথায় কান দিতে আমরা বাধ্য নই; কিন্তু ইহা সত্য যে কালীচরণ বাঁড়ুজ্যে মশাই হিন্দু খ্রীস্টান ছিলেন। তাঁহার পূর্বে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর হিন্দু খ্রীস্টান ছিলেন। তাঁহারও পূর্বে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দু খ্রীস্টান ছিলেন। অর্থাৎ তাঁহারা জাতিতে হিন্দু, ধর্মে খ্রীস্টান। খ্রীস্টান তাঁহাদের রঙ, হিন্দুই তাঁহাদের বস্তু। বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসলমান আছে। হিন্দুরা অহর্নিশি তাহাদিগকে ‘হিন্দু নও হিন্দু নও’ বলিয়াছে এবং তাহারাও নিজেদিগকে ‘হিন্দু নই হিন্দু নই’ শুনাইয়া আসিয়াছে; কিন্তু তৎসত্ত্বেও তাহারা প্রকৃতই হিন্দুমুসলমান’…” -তখন এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন পূর্ব বঙ্গের মুসলমানরা। তারা স্বাতন্ত্র্য মুসলিম, তারা হিন্দু নহেন। তাদের সংস্কৃতি হিন্দু নয়। মজা হচ্ছে তারাই নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি ঘোষণা করেছিলো! যে ছফা-সলিমুল্লাহ খানরা রবীন্দ্রনাথের ‘হিন্দু-মুসলমান’ বা ‘হিন্দু-খ্রিস্টান’ এরকম সংস্কৃতিগত অভিন্নতাকে মেনে নিতে পারেননি তারাই নজরুলকে তাদের প্রধান লেখকের আসনে বসালেন! আবুল মনসুর আহমদ লিখলেন, ‘হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর সাথে একদেশে একত্রে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা হিসেবেও, প্রজা হিসেবেও। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এই জন্য যে, হিন্দুরা চাহিত আর্য-অনার্য, শক, হুন যেভাবে ‘মহাভারতের সাগর তীরে’ লীন হইয়াছিল, মুসলমানেরাও তেমনি মহান হিন্দুসমাজে লীন হইয়া যাউক। তাহারা শুধু ভারতীয় মুসলমান থাকিলে চলিবে না, ‘হিন্দুমুসলমান’ (হিন্দুরূপী মুসলমান) হইতে হইবে। এটা শুধু কংগ্রেসী বা হিন্দুসভার জনতার মত ছিল না, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথেরও মত ছিল’।

বেশ ভালো কথা। সেরকমই থাকুন। তাহলে নজরুলকে জাতীয় কবি করার হেতু কি? নজরুল পাকিস্তান বা বাংলাদেশ যে চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত সেখানে একেবারেই বেমানান। নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের ‘হিন্দু রূপী মুসলমান’ ছিলেন! নজরুলের রঙ মুসলমান ছিলো কিন্তু বস্তু হিন্দু ছিলো। এই ‘হিন্দু’ মানে আজকের হিন্দুধর্ম বলে পরিচিত কোন ধর্ম বিশ্বাস নয়। আসলে স্থানীয় সংস্কৃতি খাবার পোশাক সাহিত্য ধর্মকে মুসলিম আগমনের পর হিন্দু নামে ডাকা হয়। কিন্তু নজরুল চন্ডিপাঠ করতেন। দক্ষিনেশ্বর কালি মন্দিরে যেতেন। কালি সাধনা করতেন। এগুলোকে বলা উচিত তার ব্যক্তিগত উপাসনার জায়গাটাকে কোন সীমারেখা দিয়ে তিনি সীমাবদ্ধ করতে চাননি। তিনি জায়নামাজ নিয়ে যেমন বসেছেন তেমনি কালি মন্দিরে গিয়েছেন। এই ব্যক্তিগত উপাসনার বাইরে তিনি শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন। কৃষ্ণ বন্দনা করেছেন। নিজের ছেলের নাম কৃষ্ণ রেখেছেন। বাঙালী মুসলমানের নিজস্বতা বলতে যে আরবী ফার্সি সংস্কৃতিকে লালন নজরুল তার বিপরীত। নজরুল দেশকে মা স্বরূপে কল্পনা করে নতমস্তকে প্রনাম জানাতেন। অথচ বন্দে মাতরমের বিরোধীতা করে মুসলমানরা তাদের জন্য নারায়ে তাকবির আল্লাহ আকবর শ্লোগান বেছে নিয়েছিলো কারণ দেশকে মাতৃ কল্পনা করা তাদের জন্য শিরক। সলিমুল্লাহ খান যখন নজরুলকে ধারণ করতে না পারার জন্য হুমায়ুন আজাদ, গোলাম মুরশিদদের নাম করেন তখন হাসি পায় এই ভেবে যে এই ছফা শিষ্য কি নজরুল সামান্য পরিমাণে হলেও পড়েছেন? নজরুল জীবনী পাঠ করেছেন? নজরুল ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতিকে ধারণ করতেন, আবারো বলছি এখন হিন্দুধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি সেটাকে নয়। মৌলবীরা আমাদের সংস্কৃতিগুলোকে যে ‘হিন্দুয়ানী’ বলে ঠাওড়ায় সেই সংস্কৃতিকে। রবীন্দ্রনাথ সেই সংস্কৃতির কথা তার প্রবন্ধে বলেছিলেন। নজরুলকে তাই মামুলি হিন্দু মুসলমান ছাঁচে যারা ফেলে তারা অশিক্ষিত! ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে লাহোর প্রস্তাব উঠলে নজরুল তার বিরোধীতা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। দেশভাগের সময় কবি অসুস্থ। তিনি সুস্থ থাকলে কখনই পূর্ব পাকিস্তানে যেতেন না এটা নিশ্চিত। নজরুল যখন বোধহীন অসুস্থ তাকে বাংলাদেশে আনা হয় ভারত সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে। বাংলাদেশে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে আসেন। এই আনার পেছনের একমাত্র কারণ নজরুল মুসলমানদের কবি কাজেই তিনি বাংলাদেশের সম্পদ! তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হলো। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় সাহিত্য কীর্তিতে বাংলাদেশের পদ্মার মাটি মানুষ আকাশ বাতাস আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাংলাদেশের জাতীয় কবি হবেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু তার একটি গানকে জাতীয় সংগীত করার ব্যালেন্স মনে হয় নজরুলের গানকে রণসংগীত ও জাতীয় কবি ঘোষণা। কেন বলছি এসব কথা? ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে গঠন করা হয়েছিলো ‘ইকবাল-নজরুল একাডেমি’ নামের সংগঠন। ভাবা যায়? কবি ইকবাল আর নজরুলের দর্শন কি একই সঙ্গে একজন মানুষ ধারণ করতে পারে? মানে যারা এই একাডেমি করেছিলো তারা নজরুলকে মুসলমানের কবি ধরে নিয়েই করেছিলো। নজরুলের যথেষ্ঠ ক্ষতি বাংলাদেশ করেছে। বলা উচিত বাংলাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদ সাম্যের কবিকে অপমান করেছে। সলিমুল্লাহ খানদের হাতে নজরুল খৎনা হচ্ছেন!

নজরুল ইসলামের জীবনের শেষদিকের কিছু কথা বলে শেষ করছি। নজরুল তখন গুরুতর অসুস্থ। প্রচন্ড অর্থকষ্ট। ঋণে জর্জরিত। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক চরম অপমান করে কবিকে অর্থ দেয়ার কথা বলে ফিরিয়ে দিলেছিলেন। মনে করা হয় নজরুল দ্রুত অসুস্থ হন এই অপমানের শোকে। বন্ধু জুলফিকারকে চিঠিতে তিনি লিখেন, নবযুগ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে যে সাত হাজার টাকা দেবার কথা ছিলো হক সাহেব সাত-আট মাস ঘুরিয়ে তাকে ‘কিসের টাকা’ বলে ফিরিয়ে দেন। চিঠিতে কবি লিখেন, ‘৭ মাস ধরে হক সাহেবের কাছে গিয়ে ভিখারির মতো ৫/৬ ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে এসেছি। হিন্দু মুসলিম ইকুইটির টাকা কারো বাবার সম্পত্তি নয় …আমার কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অতি কষ্টে দু একটা কথা বলতে পারি’। শেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি (স্যার আশুতোষ মুখার্জির ছেলে ও বর্তমান হিন্দুত্ববাদীদের আইকন) এগিয়ে আসেন নজরুলের জন্য। মধুপুরের নিজের বাড়ি ছেড়ে দেন কবির জন্য। কৃতজ্ঞ কবি চিঠি লিখেন শ্যামাপ্রসাদকে, ‘শ্রীচরণেষু, আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন। মধুপুর এসে অনেক ভালো অনুভব করছি। মাথার যন্ত্রণা অনেকটা কমেছে। জিহ্বার জড়তা সামান্য কমেছে। আপনি এত সত্বর আসার ব্যবস্থা না করলে হয়তো কবি মধুসূদনের মতো হাসপাতালে আমার মৃত্যু হতো।’ নজরুল ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত নজরুলের পত্রাবলি’র ৭৯ ও ৮০নং পত্রে এটা পাবেন।

এরপর পুরোপুরি অসুস্থ নজরুল বাংলাদেশে এলেন ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অতিথি। মৃত্যুর তিন মাস আগে তড়িঘড়ি নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিত্ব দেয়া হয়। যখন তিনি মারা যান তার লাশ ভারতে যাবার সম্ভাবনায় বাংলাদেশ সরকার কবির পরিবারকে না জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবর দিয়ে দেয় মসজিদের পাশে! যে কবি একই সঙ্গে লিখেছেন, ঐ মোর রমজানের রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, আবার শ্যামা বন্দনায় লিখেছেন, তোর রাঙ্গা পায়ে নে মা শ্যামা / আমার প্রথম পূজার ফুল’ তাকে মসজিদের পাশে কবর দিয়ে তাকে ‘মুসলমানের কবি’ বানানোর ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করা হয়। আহমদ ছফাদের সাম্প্রদায়িক ‘বাঙালী মুসলমান জাতীয়তাবাদ’ তত্ত্বকে নজরুল স্বজ্ঞানে থাকলে লাথি দিয়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিতেন। আফসোস যে সেই তাঁকেই নষ্টরা তাদের জাতীয়তাবাদের প্রধান কবি হিসেবে ব্যবহার করছে!

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix