করোনাকালে ঈদ বাজারে ভিড়, মুক্তিযুদ্ধকালের ঈদ উত্সব ও অন্যান্য

করোনাকালে শপিংমল খুলে দেয়ার প্রথম দিনই ঈদ শপিংয়ে উপচে পড়া ভিড় দেখে ঘাবড়াবেন না! ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর যুদ্ধকালীন সময়েও ঈদ পালন করেছিল ঢাকাবাসী! যুদ্ধের সময় ঢাকাতে ঈদের জামা কাপড়ও বেচাকেনা হয়েছে! অথচ তখন দেশে যুদ্ধ চলছে! লেখক আমিরুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করেছেন পুরান ঢাকায় বাচ্চারা নতুন কাপড় পরে ঘুরেছে। তিনি লিখেছেন, “একাত্তরের বিবর্ণ, বিষণ্ন ঈদের স্মৃতি বলতে নামাজ পড়া, পোলাও খাওয়া আর বড়দের পায়ে ধরে সালাম করা- এসব কিছুটা মনে আছে” (ইত্তেফাক, ৩ অক্টোবর, ২০১৪)।

দেশে যুদ্ধ চলছে আর তখন ঢাকাতে একটা মুসলিম পরিবার গরুর মাংস দিয়ে পোলাও খেয়ে তৃপ্তিতে ঘুম দিতে পারছেন! আমিরুল ইসলামের ভাষ্যে, “সেবার ঈদের দিনেও আব্বা সকালের দিকে চিত্কার শুরু করলেন একা একা। কেন যুদ্ধ চলছে? এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? কতদিন এই যুদ্ধ চলবে? আব্বা নিজে নিজেই প্রশ্ন করছেন। নিজেই উত্তর দিচ্ছেন। আর যুদ্ধের কারণে তার যে ব্যক্তিগত ক্ষতি হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিপর্যয় হচ্ছে সেই বিষয়টাই তিনি হাহাকার করে চিত্কার করছেন।মা তখন পোলাও-মাংস বেড়ে দিলেন। মায়ের রান্না ছিল অসাধারণ। রান্নায় প্রচুর তেল মসলা দিতেন তিনি। গরম গরুর মাংসের ধোঁয়া উঠছে আর মসলার সুরভিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সেই গন্ধেই আকুল হয়ে উঠলেন আব্বা। মেঝেতে দুই পা ভাঁজ করে বসে পড়লেন। তারপর ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করলেন পোলাও আর গরুর মাংস। টকটকে লাল ঝোলের মাংস। আব্বা খেতে খেতে একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেলেন। তার কোনো উত্তেজনা নেই। খাওয়ার পরে আব্বা ঠাণ্ডা মেঝেতে চিত্ হয়ে শুয়ে পড়লেন। আমাদের ঘরে কোনো ফ্যান ছিল না। আব্বা হাত-পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন। পরম তৃপ্ত তিনি”।

যুদ্ধকালীন “অবরুদ্ধ ঢাকাতে” একটি মুসলিম পরিবারের এই চিত্রের বিপরীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের হদিস আমরা পরে অনুসন্ধান করব তার আগে যুদ্ধকালীন ঈদের আরো কিছু স্মৃতিচারণ দেখে নিতে চাই। কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল গফুরের মেয়ে ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক উপ-প্রধান জেবুননেছা জুবি স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, “এমন দিনে কী ঈদ করা যায় ? তাই পণ করেছি ঈদ করবো না। সেদিন আমরা স্বাধীনতা পাবো সেদিন ঈদ করবো। কিন্তু সত্যি কি সব মানুষ ঈদ করা থেকে বিরত ছিলো? না ছিলো না। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এবারে যেন বেশি আনন্দ করছে। ঈদের নতুন শাড়ি আর গহনা পরে বের হয়েছে বেড়াতে”।

শিল্পী হাশেম খান ঈদের নামাজ পরতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখলেন ইমাম সাহেব পাকিস্তানের কল্যাণ কামনা করে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুণকীর্তন করে দোয়া চাইলেন খোদার কাছে”। অপরদিকে সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের বলছেন যুদ্ধাবস্থায় ঈদের জামাত পড়া জায়েজ নেই বলে তিনি ঈদের নামাজ পড়তে যাননি! এতখানি রেডিকাল মুসলিম সাহিত্যিক যে পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিলেন সেটাই বেশি! যাই হোক যুদ্ধের মধ্যেও যে দুঃখু দুঃখু একটা ভাব নিয়ে সেমাই পোলাও খেয়ে নতুন জামা পরে এই জাতিকে ঈদ পালন করতেই হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে! এই করোনা মহামারীতে তাই শপিংমল খুলে দেয়ার পর যেভাবে সবাই ঈদ শপিং করতে হামলে পড়ছে তাতে আর অবাক হওয়ার কি আছে? যারা যুদ্ধের সময়ও ঈদের নতুন জামা পরে সেমাই খেতে পারে তারা করোনার চাইতেও ভয়ংকর!

উপরের স্মৃতিচারণগুলো করেছেন সমাজে সুপরিচিত সংস্কৃতি পরিমন্ডলের মানুষজন যাদের স্মৃতিচারণেই অন্যদের নির্লজ্জ্ব ঈদ পালনের ক্ষোভ দেখা গেছে। তাদের পরিবারগুলোর দেশ নিয়ে যে রকম রাজনৈতিক সচেতন ছিলো সেটি তখনকার বাংলাদেশের শিক্ষার হার বিবেচনায় মুষ্টিমেয় কিছু পরিবারই ধরতে হয়। তাদের কাছে বিষণ্ন ঈদ মনে হলেও আমজনতা সুযোগ পেলেই ঈদ পালন করেছে, শপিং করেছে, ভূড়িভোজ দিয়ে তৃপ্ত হয়েছে। যেহেতু সে বছর ঈদের বাজার বসেছিলো আর পোলাম কোর্মা খেয়ে ঘুরে বেরিয়েছে লোকজন তাতে এই জাতির একটা সুস্পষ্ট রূপ আমরা দেখতে পাই! এই রকম মনোবিকার এখনো চলছে। করোনাকালকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে তবু লকডাউন নামের নাটক চলাকালে শপিংমল খুলে দেয়ার প্রথমদিনে মানুষ হামলে পড়ছে ঈদের কেনাকাটা করতে! এরা ঈদের নতুন জামা পরে বাইরে ঘুরতে বেরুবে?

লেখাটা শেষ করি একটা অফটপিক আলাপ দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে যারা হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আলাদা করে জেনোসাইডকে অস্বীকার করেন তারা দেখান তো ঢাকায় সে বছর দুর্গা পুজা কোথায় হয়েছে? যুদ্ধের বছর তো দুর্গা পুজাও ক্যালেন্ডার মেনে হাজির হয়েছিলো। একাত্তরে অবরুদ্ধ ঢাকায় কী সুন্দর লোকজন ঈদে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ একটি হিন্দুও তখন ঢাকায় নেই! পুরান ঢাকায় তো হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো ! পাকিস্তানীরা এদেশে “অসাম্প্রদায়িক” হামলা চালিয়েছিলো বলে এখন যারা নতুন ইতিহাস লিখছেন তারা এসবের একটি উপযুক্ত জবাব দিবেন কি? কোথাও নম: নম: করেও দুর্গা পুজা হয়েছিলো ঢাকায়? বাচ্চারা মন্ডবে মন্ডবে ঘুরে বেরিয়েছিলো নতুন জামা পরে? তাহলে আলাদা করে মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুরা টার্গেট হয়নি সেটা কিসের ভিত্তিতে দাবী করেন?

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix