কমিউনিস্টদের পতন ও উত্তরণের চেষ্টায় ইসলামীকরণ

ইদানিংকালের জোরজবরদস্তি আরবি উর্দু শব্দে কমিউনিস্টদের বই পত্রিকা ফেইসবুক পোস্ট তো সকলের চোখে পড়েছেই, আরেকটা জিনিস এরা প্রচুর আল্লামা ইকবাল, মির্জা গালিব, মাওলানা রুমি, ফিলিস্তিন তুরস্ক ইরাকী কবিদের কবিতা অনুবাদ করছেন। কবি ইকবালের ‘রঙ্গিলা রসূল’ ইস্যুতে তার সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রূপ বাদ দিলে মাঝে মাঝে এমন কথা বলে গেছেন সেসবের জন্য তাকে ধর্মহীনও মনে হতে পারে। গালিব রুমি ইনাদেরকে তাদের সময়ে ‘কাফের’ বলে গালি খেতে হয়েছে। মানে মুসলিম সমাজে তারা ছিলেন উদার আধুনিক। কিন্তু তাদেরকে নিজেদের সম্প্রদায়গত মনে করে চর্চাকারী মুসলিম কিন্তু কট্টরভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদী! মনে করেন পঞ্চাশ বছর পর হুমায়ুন আজাদকে “বাঙালী মুসলিম চিন্তানায়ক” তকমায় যদি তাঁকে স্মরণ করা হয় সেটা মুসলমানদের এগিয়ে যাওয়া নয় পিছিয়ে পড়া। আমার কথার ভুল মানে করলে কুতর্কই বাড়বে। বলছি না ইনাদের লেখা অনুবাদ করা যাবে না। কিন্তু আরবীতে শ্লোগান, উর্দু মিশিয়ে ভাষা তৈরির সময়ে অনুবাদের এই লিস্টি একটা অর্থ সামনে তুলে আনে।

অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে নিজেদের ভীষণভাবে মুসলমান প্রমাণ করতে বামদের কত্সরত হাস্যকর হয়ে উঠছে। মুসলমানরা কোনদিনই ইসলাম ছেড়ে কমিউনিস্ট হবে না। ইসলাম তাদেরকে যে ধর্মরাষ্ট্রের কথা বলে সেটা ছেড়ে কেন তারা বামপন্থি হতে যাবে? তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে কমিউনিস্টদের কোন আশা ভরসা ভবিষ্যত কিচ্ছু নেই! কমিউনিস্টরা নিজেরা যদি দলে দলে হেফাজত ইসলামে যোগ দেয় সেটা আলাদা কথা। রাষ্ট্র থেকে ইসলামকে বাদ না দিলে কমিউনিস্টদের কোন ভবিষ্যত নেই। অখচ তারা ইসলাম ও মুসলমানকে বেইস করেই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে!

সব কমিউনিস্টই যে ভান করছে তা নয়। এমনিতে কমিউনিস্টরা বেশ গোঁড়া। অনেক কমিউনিস্ট মার্কসকে প্রফেটের মত করে অনুসরণ করে। লেলিন, মাও, ক্যাস্ত্রকে মার্কসের বিশ্বস্ত সাহাবীর মত মনে করে। যে কারণে কমিউনিজম বহু দেশে গোঁড়ামির মত চর্চা হয়। যখনই নতুন কিছু এসে হাজির হয় তখন তারা মার্কেসের কিতাব খুলে দেখে এটাকে গ্রহণ করার অনুমতি আছে কিনা! অথচ মার্কস একটা বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা প্রণোয়ন করে গিয়েছিলেন। সেই ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক বলেই যুগের প্রয়োজনে ভিন্ন বাস্তবতায় ভিন্ন সমাধান বের করতে হবে। ধর্মের মত করে কমিউনিজমকে তাই অনুসরণ করা যাবে না। ভারতে ৩০ বছরের উপরে কমিউনিস্টরা পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছিলো। তাদের গোঁড়ামীর একটি উদাহরণ দেই। ব্যাংকে যখন কম্পিউটার এলো তখন কমিউনিস্টরা তুমুলভাবে তার বিরোধীতা শুরু করেছিলো। এটাকে তারা সাম্রাজ্যবাদীদের গোপন ষড়যন্ত্র মনে করেছিলো!

যখন আপনি আপনার মতবাদকে অপরিবর্তনীয় মনে করবেন তখনই আপনি নতুন যুগের সঙ্গে তাল মানিয়ে নিতে সংস্কারগুলোকে স্বীকার করে নিতে পারবেন না। যেমন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনায় চীন, রাশিয়াকে এখন আর কোন কমিউনিস্টই ‘সহি কমিউনিস্ট’ মনে করে না! মানে বিশেষ কিছু অলঙ্ঘণীয় বিধান পরিবর্তন আপনাকে বিশুদ্ধ কমিউনিস্ট হতে দিবে না। এই গোঁড়া কমিউনিস্টরা যারা মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে তারা এক সময় ইসলামের সঙ্গে কমিউনিজমের খিচুরী পাঁকায়। মুসলিমদের পরিবারগুলোর মজ্জাগত মুসলিম জাতীয়তাবাদ যেহেতু ছোট থাকতেই ব্রেনওয়াশ করা থাকে, তার মধ্যে গোঁড়া মার্কসবাদ একসময় মুহাম্মদের খিলাফত জিহাদ একাকার হয়ে যায়। এখন বাংলাদেশের বামদের ‘নফস’ ‘ইনসানিয়াত’ ‘ইনসাফ’ ‘জালিম’ ‘শুকরিয়া’ ‘কসুর’ ‘জান-জবান’ ইত্যাদি কষ্ট আরোপিত তথাকথিত ইসলামী পরিভাষা দিয়ে নিজেদের মুসলমানদের মধ্যে মিশে যাবার চেষ্টা তাই সবটাই ভনিতা নয়।

‘জিহাদ’ শব্দটি বদরুদ্দিন উমার বহু বছর ধরে বিপ্লবের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। জিহাদ মানে ন্যায় যুদ্ধ। জিহাদ, গণিমত মাল, জিজিয়া কর, যুদ্ধবন্দিদের বিষয়ে ইসলামের বিধান, দাস ব্যবস্থা বিষয়ে ইসলামের বিধান- এগুলো কোন কিছু তাদের কাছে বিবেচ্য নয় কারণ তারাও বুর্জোয়া পুঁজিবাদী শ্রেণীশত্রুদের পরাজিত করে একই রকম বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস করেন। কোলকাতার হিন্দু বাম বুদ্ধিজীবীদের বই পড়লে মনে হতে পারে খিলাফত জিজিয়া খুবই উপদেয় জিনিস যে সকলের সেটা গ্রহণ করা উচিত! সেরকম একটি বইটির নাম বোধহয় ‘ওহাবী থেকে খিলাফত আন্দোলন’।

পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থি তরুণদের আমি দেখি অদ্ভূত আত্মঘাতি মানসিকতা! তারা ব্যবসা শিল্প প্রতিষ্ঠাকে রীতিমত নীতি বিরুদ্ধ মনে করে! তারা কেউ নিজেরা বিড়লা টাটা হওয়ার স্বপ্ন দেখে না আবার পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসা অবাঙালীদের হাতে দেখে নিজেদের পরাধীন মনে করে। বাংলাদেশে এত এত বৃহত শিল্প প্রতিষ্ঠান দেখে তারা বাঙালী হিসেবে গর্ব করে কিন্তু নিজেরা চুল দাড়ি বড় করে কাঁধে একটা বিপ্লবী ঝোলা ঝুলিয়ে কফি হাউসে বিপ্লবের তুফান ছুটায়। পশ্চিমবঙ্গে ছেলেমেয়েরা তাই চাকরি বাকরিব জুটিয়ে একটা ফ্ল্যাট গাড়ি করতে পারলে জীবন ধন্য মনে করে। ব্যবসা তো খুব খারাপ কাজ। ওসব মাড়োয়ারী অশিক্ষিত আনকালচার্ডদের কাজ। এইরকম একটা নেগেটিভ মনোভাব তৈরি হওয়ার পিছনে পশ্চিমবঙ্গে ৩০ বছরের উপর বাম শাসনকে অনেকে দায়ী করেন। কতাটা সত্যি তা অবশ্য তর্ক দাবী রাখে।

তবে বামপন্থিদের পা কিন্তু মাটিতে নেই। তারা একটা অভিন্ন কমিউনিস্ট উম্মাহ যেটা ইসলাম মুসলমানদের ধ্বংস করতে জিনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেই কমিউনিস্ট উম্মাহ ভারতীয় প্রায় অনুপ্রাণিত চিন্তকদের সকলকে বাতিল করেছে মার্কসবাদ দিয়ে। ভারতে ইংরেজ শাসনকে একটা সময় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় মনে করতেন রামমোহন, বিদ্যাসাগার। এমনকি স্যার সৈয়দ আহমদও। বিদ্যাসাগর কেন গরীব মানুষদের নিয়ে শ্রেণী সংগ্রাম করেননি তাই তিনি মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া, জমিদার ও ইংরেজ শাসনের তাবেদার! সিপাহী বিপ্লবের সময় বিদ্যাসাগর স্কুল খুলে দিয়ে সৈন্যদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বলে নকশালরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙ্গে ফেলেছিলো। বরীন্দ্রনাথকে “জমিদার” বানিয়ে তাকে বাত্য করার চেষ্টাও করেছে। হিন্দু ব্যাকগ্রাউন্ডের বামপন্থিরা এসব করেছে খাঁটি গোঁড়া বামপন্থি সেন্টিমেন্ট থেকে। মুসলমান বামপন্থিরা করেছে তাদের মজ্জাগত ইসলামিক পারিবারিক শিক্ষা গভীরে যে মুসলিম জাতীয়তাবাদ সেই অনুপ্রেরণায়…।

অবশ্যই এটাই এদেশের বামপন্থিদের চূড়ান্ত কথা নয়। আমি দুই বাংলার অধঃপতিত বামদের কথা বলেছি। সত্যিকারের আদর্শবাদী বিপ্লবীরা নমস্য।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix