ইসলাম কি? প্রচার আর কায়েম

আল্লাহ ও তার রাসূলের জমিনে, ইসলাম কায়েম, ইসলাম গ্রহণে জবরদস্তি নেই, ইসলাম প্রচার, তোমার ধর্ম তোমার কাছে আর আমারটা আমার, দ্বিন নিয়ে জবরদস্তি নেই

একজন অমুসলিমের জন্য তো ইসলাম মানার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন নামাজ পড়া, হজ করা, রোজা, যাকাত ইত্যাদি ইসলামী রীতি পালনের জন্য তাদের ইসলাম চাপ প্রয়োগ করতে বলেনি। এ জন্যই দ্বিন নিয়ে জোরজবরদস্তি করতে নিষেধ করা আছে। কিন্তু যখনই আল কায়দা, তালেবান, জেএমবি, আইএসের কথা উঠে তখনই লোকজন বলা শুরু করে দ্বিনের বিষয়ে কোন জবরদস্তি নেই। আইএস-আল কায়দা তাই ইসলাম সম্মত কাজ করছে না…। ইসলামকে বুঝতে হলে আপনাকে তাই একদম শুরুতেই “ইসলাম কায়েম” ও “ইসলাম গ্রহণ” – এই দুটি জিনিসকে পরিস্কার বুঝতে হবে। ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে ইসলাম সাবধান করে দিয়েছে যে একে নিয়ে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। কাফেরদের কাছে দ্বিন নিয়ে যাও যাতে তারা জানতে পারে। কিন্তু তাদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার প্রয়োজন নেই। যদিও ইসলামের ইতিহাসে নবীজি একথা সব জায়গায় মান্য করেননি। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি ইসলাম গ্রহণের শর্তে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। যাই হোক, একটা কথা সব সময় শুনবেন, কিছু লোক কোথাও জিহাদীদের বোমাবাজি হলেই অত্যন্ত বিজ্ঞের মত বলবে, ইসলাম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। যারা এসব করছে এরা তাই প্রকৃত মুসলমান নয়। বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক এটাই সাধারণত প্রচার করা হয়। আসলে যারা বোমাবাজি করছে, কাফেরদের জিম্মি করছে সেটা ইসলাম কায়েম করার জন্য করছে। “ইসলাম কায়েম” সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। ‘লা-ইকরাহা ফিদ্দীন।‘- ইসলাম গ্রহণে জবরদস্তি নেই। কিন্তু ‘লি তাকূনা কালিমাতুল্লাহি হিয়াল উলইয়া।’- রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব যেন হয় ইসলামের, আল্লাহর দ্বীনের। অর্থ্যাৎ ইসলাম গ্রহণের জন্য একজন অমুসলিমকে জোর করা যাবে না কিন্তু একটা অমুসলিম দেশে ইসলাম কায়েম করার জন্য যদি মুসলিমরা গায়ের জোর দেখানোর সামর্থ রাখে তাহলে তারা সেটাই প্রয়োগ করবে!

ইসলাম কায়েম আসলে রাষ্ট্র ক্ষমতা ইসলামের হাতে নেয়া। এটি ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। “তোমার ধর্ম তোমার কাছে আর আমারটা আমার”। সূরা কাফিরুন, আয়াত- ৬ । “ধর্মের ব্যাপারে কোন জোরজবরদস্তি নেই”– সূরা আল বাকারা, আয়াত- ২৫৬।… এগুলো শুধু ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম কায়েম সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। এর ফয়সালা মুসলমানরা তলোয়ার দিয়েই করবে। “আল্লাহ ও তার রাসূলের জমিনে” একজন ঈমানদার মুসলিম বেঁচে থাকা পর্যন্ত কাফের-মুশরিকদের বানানো আইন, তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কখনো নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। এমনকি তাদের জানমালও নিরাপদ নয় মুসলিমদের হাতে। নবী মুহাম্মদ বলেছেন-

মুসলিম শরীফে আছে-
//أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الْإِسْلَامِ وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ (আমাকে মানুষের সাথে জিহাদ করার আদেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা এই সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল এবং নামায প্রতিষ্ঠা না করবে ও যাকাত না দিবে। যখন তারা উপরের কাজগুলো সম্পাদন করবে তখন তারা আমার হাত থেকে নিজেদের জান ও মাল নিরাপদ করে নিল।)//

এই হুমকি ইসলাম গ্রহণের জন্য নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে নবী মুহাম্মদকে একজন নবী স্বীকৃতি দিয়ে মুসলিমদের অধীন বা বশ্যতা মেনে নিয়ে অমুসলিমরা জিজিয়া কর দিয়ে তৃর্তীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে বসবাস করতে পারবে এবং এতে তাদের ইসলাম গ্রহণ করার প্রয়োজেও নেই। কাজেই ইসলাম সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার কথা বলে না- এরকম গুলিয়ে ফেলা সম্পূর্ণই অজ্ঞতা। রাষ্ট্র ক্ষমতায় ইসলামকে বসাতে হলে কি মুখের মিষ্টি কথাতে কাজ হবে? আপনি ইংলেন্ডে গিয়ে ব্রিটিশদের বলবেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম কায়েম করুন আর তারা সেটা শুনে ইসলামী শাসনতন্ত্র বানিয়ে ফেলবেন- এমনটা যে কোনদিন সম্ভব না সেটা তো নবী মুহাম্মদ তার ইসলাম ঘোষণার প্রথম ১৩ বছর মক্কাতেই বুঝে ফেলেছিলেন। তারপরই নতুন ইসলামের জন্ম হয়েছিল মদিনাতে। যে ইসলাম- ইসলাম গ্রহণ করানোর চেয়ে “কায়েম” করতে ব্যস্ত। সুরা তওবাতে বলা হয়েছে-

//তারপর (এই) নিষিদ্ধ মাস অতিক্রান্ত হলে সকল মুশরেকদের যেখানে পাবে হত্যা করবে, তাদেরকে পাকড়াও করবে, তাদেরকে ঘেরাও করবে, তাদের অপেক্ষায় প্রত্যেক ঘাটিতে ওৎ পেতে বসে থাকবে। কিন্তু তারা যদি তাওবাহ করে, সলাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও, নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।” (সূরা আত-তাওবাহ: ৫)।//

এই আয়াত একই সঙ্গে ইসলাম কায়েম ও ইসলাম গ্রহণের পথ বাতলে দিয়েছে। ইসলাম কায়েম করতে হবে কিভাবে মেরেধরে ভীতি সঞ্চার করে করতে হবে সেটা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে নামাজ, যাকাত প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হলে তাদের মুক্তি সেকথাও বলা হয়েছে। মানে ইসলাম গ্রহণে জোর করলাম না- কিন্তু গ্রহণ না করে কূল পাবে না সেই ব্যবস্থাই করা হবে!

কিছু মানুষ আমাদের লেখালেখির জবাব দিতে এসে বলেন, কেন আমরা ইসলামের সমালোচনা করি। ইসলাম পালন করি না- সেটা না করলেই তো হয়, শুধু শুধু কেন ইসলামের সমালোচনা করি…। কিন্তু ঘটনা তা নয়। ইসলাম গান নিষিদ্ধ করেছে তার মানে এই না যে আপনি সেটা মানতেও পারেন আবার নাও মানতে পারেন। এর মানে হচ্ছে ইসলাম কায়েম করতে হবে যাতে কেউ গানবাজনার মজলিশ বসাতে না পারে। আপনি পর্দায় বিশ্বাস করেন না- তার মানে এই না যে সেটা আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন। ইসলাম কায়েম করতে হবে যাতে আপনি বেপর্দায় চলাফেরা করতে না পারেন। এটি ইসলাম গ্রহণ করার বিষয় নয়, এটি ইসলাম কায়েমের বিষয়। দেখবেন সৌদি সহ কঠিন ইসলামী শাসনের দেশে কোন অমুসলিম নারীও কঠিন পর্দা থেকে কোন ছাড় পান না। ইউরোপের গণতান্ত্রিক সমাজে হিজাব, বুরখা পড়ে চলতে কোন বাধা নেই কিন্তু সৌদিতে কোন অমুসলিম নারী লং স্কাটও পরতে পারবেন না। একা একা চলাফেরা করতে পারবেন না। কারণ সেখানে ইসলাম কায়েম হয়েছে। কোন ইউরোপীয়ান নারীকে সৌদি আরবে গেলে ইসলাম গ্রহণের জন্য চাপ দেয়া হবে না কিন্তু তাকে ইসলামকে মেনে চলতে হবে এবং এটা মানতে সে বাধ্য। অমুসলিম কাফেরদের দেশে মুসলিমদের সমস্ত অধিকারের জন্য তারা চিল্লাচিল্লি করলেও ইসলামী দেশে কাফেরদের কোন অধিকার নেই। তারা ইসলামকে মানতে বাধ্য…।

ইসলামী বক্তা জাকির নায়েককে একজন শ্রোতা প্রশ্ন করেছিলেন যে, যদি একজন মুসলিম মদ বিক্রি করতে দেখে তাহলে তার কি কর্তব্য। এরকম প্রশ্ন শুনলে সাধারণত জাকির চনমন হয়ে উঠে। হাত-পা নেড়ে সে যা বলল সেটা সত্য হলে যে কোন অমুসলিম দেশের জন্য মুসলিম এক আতংকের নাম। জাকির নায়েক বললেন, ভাই যদি আপনি কোন অমুসলিম দেশে বসবাস করেন তাহলে আপনাকে দেখতে হবে আপনি সেখানে কোন অবস্থায় আছেন। যদি সেখানে মুসলিমরা গায়ের জোর দেখানোর মত অবস্থায় থাকে তাহলে মুসলিমদের উচিত হবে দোকানিকে মৌখিকভাবে দোকান বন্ধ করার কথা প্রথমবার জানিয়ে সাবধান করা। কথা না শুনলে মুসলিমদের হক হচ্ছে গায়ের জোরে মদ ব্যবসায় বাধা দিতে হবে। আর যদি শুধু মৌখিকভাবে বাধা দানের অবস্থায় থাকেন তাহলে সেটাই করবেন। আর যদি সে রকম অবস্থা না থাকে তাহলে মনে মনে এর বিরোধীতা করতে হবে। এটাই হচ্ছে জিহাদ…। বাহ্, ইসলাম মুসলিমদের জন্য মদ নিষেধ করেছে ঠিক আছে, কিন্তু অমুসলিম বা কাফেররাও সেটা মানতে বাধ্য? মুসলিমদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ হওয়াও হারাম বা কুফরি। এটা সব আলেমই বলে থাকেন। কিন্তু একজন মুসলিম যখন সংখ্যালঘু তখন তাকে কতখানি ভন্ড হতে হবে সেটাও পরিস্কার করে বলেছেন বিশিষ্ট আলেম হযরত মাওলানা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ (রাহ)-

//“ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা না মানলে রামরাজ্য কায়েম হবে। শিরক ও মূর্তিপুজার আধিপত্য হবে। তার চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা অনেকটা সহনীয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা মেনে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।“-(মাসিক আল কাউসার )।//

আলেম সাহেব বা জাকির নায়েক যে মিথ্যা বলেননি সেটা প্রমাণ হওয়া উচিত। সহি মুসলিম শরীফ থেকে তুলে দিচ্ছি-

//مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ (তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখে সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়। হাত দিয়ে বাধা দিতে না পারলে জবান দিয়ে বাধা দিবে। তাও করতে না পারলে অন্তর দিয়ে হলেও বাধা দিবে। এটি সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়”। [সহীহ মুসলিম])//

ইসলাম গ্রহণে তেমন জোরজবরদস্তি নেই কিন্তু “ইসলাম কায়েম” করতে হলে গায়ের জোর ছাড়া বিকল্প নেই। আজকের প্রযুক্তির যুগে এখন আর মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া লাগে না। ইসলাম কায়েম করতে বা শিরককে বাধা দিতে একেফর্টিসেভেন বা গাড়িবোমা, মানববোমা দিয়ে মুসলিমদের সংখ্যাধিখ্যতার অভাব পূরন করা যায়। যে সব মুসলিম অতিতে সংখ্যার অভাবে মনে মনে শিরককে বাধা দিতেন তারা এখন একটা আগ্নাস্ত্র নিয়ে স্বশরীরেই করতে সক্ষম। কদিন আগে আমেরিকায় সংখ্যালঘু মুসলিম দম্পত্তি সংখ্যাগুরু কাফেরদের গুলি করে খতম করে দিয়েছিল। যুগ পাল্টেছে, কাজেই মুসলিমদের সংখ্যায় বেশি হওয়ার আগেই ইসলাম কায়েমের জন্য জিহাদ করতে এখন আর অপেক্ষা করতে হয় না। ইসলাম গ্রহণের জন্য কোন জিহাদী ইসলামপন্থি কোন অমুসলিমকে সেভাবে জোর করবে না কিন্তু ইসলাম কায়েম করতে গিয়ে আপনার কখন বোমার আঘাতে পঞ্চপ্রাপ্তী হবে বুঝতেই পারবেন না! দুনিয়াতে তাবলীগ জামাত (দাওয়াতি ইসলাম) করা দলের সংখ্যা খুব বেশি নেই। কারণ বুঝিয়ে-শুনিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে অমুসলিমরা সবাই মুসলিম হয়ে গেলেই ইসলাম কায়েম করতে আর কোন বাধা থাকবে না- এই তত্ত্বে ইসলামী স্ককলাররা আর বিশ্বাস করেন না। তাই তাবলিগ জামাতের চেয়ে আল কায়দা, তালেবান, আইএস, জেএমবি, আনসারুল্লাহদের সংখ্যা দিনকে দিন বড়তেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে…।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix