আহমদ ছফার একটি ইন্টারভিউ ও বাঙালী মুসলমান জাতীয়তাবাদী

আহমদ ছফার যে ইন্টারভিউটি পড়তে অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সেটি ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে কোলকাতা বইমেলা উপলক্ষে ‘স্বাধীন বাংলা সাময়িকী’ প্রকাশ করেছিলো। এই ইন্টারভিউর চুম্বক কিছু অংশ এখানে আমি তুলে ধরছি সঙ্গে ব্রেকে আমার নিজের বক্তব্যযুক্ত করেছি। পুরো ইন্টারভিউটি যারা পড়তে চান তাদের জন্য লিংকযুক্ত করে দিয়েছি।

 

[আনন্দ প্রকাশনীর বিরোধীতা করতে গিয়ে তসলিমা নাসরিনের লজ্জ্বা উপন্যাসকে রীতিমত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে ছফা ইন্টারভিউর এক পর্যায়ে বলেন]

 

-তসলিমাকে নিয়ে আনন্দবাজার যা করেছে গোটা দুনিয়ার কাছে আনন্দবাজার বাংলাদেশকে তুলে ধরল একটি সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দেশ হিশেবে। কিন্তু কে মৌলবাদী, ভারত না বাংলাদেশ? মৌলবাদ উত্থান হচ্ছে ভারতে, বিজেপি এবার দিল্লির ক্ষমতায় আসছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সংসদে এবার জামায়াত পেয়েছে মাত্র তিনটি আসন। এই আনন্দবাজারের দৌরাত্ম্য আমরা বাংলাদেশে চলতে দেব না। বই যেমন সংস্কৃতির বাহন, তেমনি পণ্য। ইকোনমিক্স-এ একটা কথা আছে-Nurse the baby protect the child, Free the adult আমাদের প্রকাশনা শিল্প পরিণত না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিতেই হবে।

 

[কোলকাতার বই একুশে বইমেলায় প্রবেশ করতে পারে না কিন্তু কোলকাতার বইমেলায় তো বাংলাদেশের প্রকাশনী আমন্ত্রিত হয় এই প্রশ্ন করতেই ছফা উত্তেজিত হয়ে উঠেন]

 

-আহমদ ছফা: (উত্তেজিতভাবে প্রশ্ন শেষ করতে না দিয়ে) দেখুন, আমরা ভাষার জন্যে রক্ত দিয়েছে, রক্ত দিয়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভাষাভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা কেন কোলকাতাকে অনুসরণ করতে যাবো। …একবার আনন্দবাজারের বাদল বসু আমার একটা ইন্টারভিউয়ের প্রতিবাদ করে খুব খারাপ কথা বলেছিলেন। তারপর আমাদের দেশের প্রবীণ লেখক শওকত ওসমান বললেন, আমমদ ছফা খুব খারাপ লোক। উনি(শওকত ওসমান) খুব খারাপ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, সেই শব্দটা আমি বলছি না। এরপর একদিন আমি শওকত ওসমানকে সাথে নিয়ে ঢাকার নিউ মার্কেটে গেলাম। নিউ মার্কেটের সব বইয়ের দোকানে শওকত ওসমানের বই চাইলাম, কিন্তু কোন বইয়ের দোকানই শওকত ওসমানের কোনও বই দিতে পারে না। কিন্তু যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বই চাইলাম, দেখা গেল মুদি দোকানও তা দিতে পারে। শেষে আমি শওকত ওসমানকে বললাম, সুনীল আপনার বড় না ছোট? তিনি বললেন, ছোট, অনেক ছোট। ওকে আমি জন্মাতে দেখেছি। আর জানবেন শওকত ওসমান লেখক হিশেবে ছোট লেখক নন, তার অনেক লেখা আছে উৎকর্ষের বিচারে যা বেশ ভাল। এই অবস্থা দেখে শওকত ওসমানকে আমি বললাম, দেশটা আমরা বল ছেড়ার জন্য স্বাধীন করেছি?

 

[আনন্দ প্রকাশনীর বিরোধীতা করতে গিয়ে ছফা এরপর বাংলাদেশের ৯০-এর সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে একদম চেপে গিয়ে অস্বীকার করে ফেলেন]

 

-বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর বাংলাদেশে তিন জন মানুষ মারা গেছেন। আর মমতা বন্দোপাধ্যায় এখানকার ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছে, কোলকাতা শহরতলীতেই মারা গেছেন একশজন। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একশ জনকে আমরা পঞ্চাশ ধরতে পারি। এই তিনজন মানুষের মৃত্যুকে নিয়ে পৃথিবীব্যাপী আনন্দবাজার যে কাণ্ডটা করল এটা কোন দরিদ্র প্রতিবেশীর প্রতি কোন ভদ্রোলোক করে না। মনে বিষ না থাকলে এটা সম্ভব নয়।

 

[লিটলম্যাগটি ছফাকে প্রশ্ন করেছিলো , ‘প্রশ্ন: যদি বলা হয় প্রতিযোগিতায় না পারার কারণে এই ক্ষোভ? এর উত্তরে ছফা ফের তসলিমাকে ‘ছোট লেখক’ ও বাংলাদেশী ৫ জন লেখককে আনন্দ পুরস্কার দেয়াকে ‘ভারতীয় সংস্কৃতি আগ্রাসন’ হিসেবে দেখেছেন! ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে তো বৃহত অর্থে এই অঞ্চলের সংস্কৃতিকেই বুঝা। এমনকি আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষাটির আরো দুটি বোন হচ্ছে যথাক্রমে অহমিয়া ও হিন্দি যারা একই মায়ের সন্তান। ছফার সংস্কৃতি বিশ্বাস তাই ঘোলাটে। তার ‘বাঙালী মুসলমানের সংজ্ঞা তাই তার ভক্তদের কাছেই প্রশ্ন তোলা রইল। যাই হোক ছফা যা বলেছিল-]

 

-আহমদ ছফা: হ্যা, একথা বলতে পারেন। তবে আমি রেপড হচ্ছি আপনি ভাববেন না আমি মজা পাচ্ছি। আনন্দবাজারের একটা সাকসেসফুল ব্যাপার আছে। পশ্চিম বাংলার বাঙালির টাকা নেই। কিন্তু আনন্দবাজার টাকা করেছে। সাহিত্যটাকে তারা ব্যবসায়ের পণ্যে পরিণত করেছে এবং সমস্ত লেখককে তারা পূজা সংখ্যার লেখক-এ পরিণত করেছে। তারা তাদের পচাত্তর বছরের ঐতিহ্য দিয়ে বাংলাদেশের গ্রোয়িং প্রসেসে হস্তক্ষেপ করেছে। একজন সাধারণ লেখককে পুরস্কার দিয়ে তুলে ধরে, অন্যদিকে একজন সত্যিকার ভাল লেখককে অপমান করে। যেমন তারা তসলিমা নাসরিনকে পুরস্কার দিয়ে দুই কোটি টাকা আয় করেছে। আপনি যদি চান আমি হিশাব দেব। এখানে তারা পাচটি আনন্দ পুরস্কার দিয়েছে। এর মধ্যদিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনের হস্ত এখানে প্রসারিত হচ্ছে। হিন্দির এত বড় এজেন্ট হচ্ছে আনন্দবাজার। আমি এইভাবে ব্যাখ্যা করবো।

 

[বাংলাদেশের নতুন সাহিত্য ভাষা (বাঙালী মুসলমানের স্বকীয়তা?) তৈরি হয়েছে কিনা প্রশ্নে ছফার উত্তর ছিলো]

 

-আহমদ ছফা: এখনো পারিনি। কিন্তু আমরা বসে থাকব, এটা ভাবাও ঠিক নয়।

 

[ছফার তীব্র পশ্চিমবঙ্গ বিরোধীতা মুসলিমবাদ থেকে কিনা এরকম প্রশ্নও করা হয় এভাবে- “পশ্চিম বাংলা বা কোলকাতা সম্পর্কে আপনার এই সমালোচনা কি যুক্তিবাদী মননশীল জায়গা থেকে না কোনও ধর্মীয় অনুভূতি থেকে”

 

-বাইরের লোক যখন দেখেবেন, আমি যখন সাফারার, অন্য লোক এর মধ্যে ধর্মীয় সত্তা খুজে পাবেন। কিন্তু আসল ব্যাপারটা আমার জীবনে। আমি আমার গ্রামে থাকতে পারি না, মোল্লারা আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। কারণ আমি ইসলামের কিছুই করি না, বিশ্বাসও করি না। আমার জীবনের মধ্যে কাজ করে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, উপজাতি। মুসলমান সমাজকে সকলে কনডেম করেন। বাংলা সাহিত্যের ষাটভাগ সাহিত্য সাম্প্রদায়িক সাহিত্য। সুতরাং আমার জনগোষ্ঠীর ওপর যে সাংস্কৃতিক অত্যাচারগুলো হয়েছে, আমি সেটাকে যদি ডিফেন্ড করি অনেকে সাম্প্রদায়িক মনে করতে পারেন।

 

[ছফা “আমার জনগোষ্ঠির উপর সাংস্কৃতিক অত্যাচার” বলতে যে বাঙালী মুসলমানকে বুঝিয়েছেন এটা বুঝতে নিশ্চয় বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই? ছফাকে এ জন্য ‘বাঙালী মুসলমান জাতীয়তাবাদী লেখক’ বলি। এটাকে কি ভক্তরা নিন্দা হিসেবে দেখেন? আমি মনে করি না ছফা সাম্প্রদায়িক ছিলেন। পুরো ইন্টারভিউ যারা পড়বেন তারা ছফার সুচিন্তাশীলতার পরিচয় পাবেন। অনেক সত্য বলেছেন। একইভাবে স্ববিরোধীতাও করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের “অমুসলিম সাহিত্যিকদের” প্রতি তার ক্ষোভের কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে ভারতকে খারাপ দেখাতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের মৌলবাদী অবস্থাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে গেছেন। বাংলাদেশে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আহমদ শরীফ ও তসলিমা নাসরিনের উপর যা ঘটেছিলো সেসব থাকার পরও ছফা উত্তরে বলেন]

 

-প্রশ্ন: স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা মৌলবাদী বাধা কি এখানে আছে?

আহমদ ছফা: না, সেরকম আমি কিছু মনে করি না

 

আমি নিজে মনে করি বাংলাদেশের প্রবলতম প্রগতিশীল লেখকটিও ভেতরে ভেতরে ‘বাঙালী মুসলমান’ জাতীয়তাবাদী। এটা বললে তাদেরকে সাম্প্রদায়িক বলা হয় না। তারা চেয়েছেন বাঙালী মুসলমানের নিজস্ব যে সমাজ, খাদ্য, জীবনযাপন, প্রেম-ভালোবাসা তার একটা নিজস্বতা গড়ে উঠবে যার সঙ্গে বাঙালী হিন্দুর কোন মিল থাকবে না। এটি করতে গিয়ে উনারা একটি সংক্রীর্ণ জাতীয়তাবাদী মানসিকতায় আটকে ছিলেন যা একজন পাঠককে উদার্য হতে দেয় না। বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত কোন পাঠক বৃহত মানবজাতির প্রতি যে দর্শন তাদের লেখায় সন্ধান পায় সেখানে ছফাদের আনন্দবাজার জুজুই সংক্রীর্ণ করে রেখেছে। আহমদ ছফার উপন্যাস “অলাতচক্র” একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমানদের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান নিয়ে লেখা। সেখানেও পশ্চিমবঙ্গের প্রতি তিনি সুবিচার করেননি। একদিন এখান থেকে যারা নিজেদের দেশ হারিয়ে চলে গিয়েছিলেন তারা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলো ছফা সেখানে অনেক মানবিক হতে পারতেন। যাই হোক, আহমদ শরীফ তার একটি বইয়ে শিখা গোষ্ঠির লেখকদের মুসলমানদের মঙ্গলকামনাকারী হিসেবে দেখিয়েছিলেন। তারা কেউ মুক্তচিন্তার জন্য কিছু করেননি বা তারা সেরকম ছিলেন না বলেছিলেন। ছফাও এই ইন্টারভিউতে সেটা বললেন। কিন্তু তিনি নিজেও কিন্তু বাঙালী মুসলমানদের “নিজের জনগোষ্ঠি” হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন। আমি যেহেতু সব রকম পরিচয়ের উর্ধে নিজেকে একজন মানুষ ভাবার দর্শনকে উপরে রাখি তাই পাঠক হিসেবে ছফা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় লেখক।

http://আহমদ ছফার ইন্টারভিউর লিংক এখানে

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix