আজানের সময় পূজা বন্ধ

সুষুপ্ত পাঠক: জয় গোস্বামী আমার প্রিয় কবি ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কিন্তু তার সব কথায় তো একমত হতে পারি না। আজ সেরকম একটি বিষয় নিয়ে কথা বলব। সেক্যুলার ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে কবিকে মানুষ হিসেবেও ভালো লাগে। যারা বিজেপি করে তারা উনাকে নিয়ে গালাগালি করতেই পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গকে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের হোক এটা চান। এটাই বড় কথা। কিন্তু আজান নিয়ে জয় যেটা বললেন মানতে পারলাম না। আনন্দবাজারে জয় গোস্বামী বাংলার ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উদাহরণ দেখাতে গিয়ে নিজের একটি ঘটনার কথা উদাহরণ দিলেন এভাবে-
“কলকাতা থেকে যেতে দু’ঘণ্টা। আসতে দু’ঘণ্টা। গাড়িতে। জায়গাটা প্রায় গ্রাম। সেখানে এক বইমেলা। ছোট্ট মাঠ ঘিরে কয়েকটি মাত্র বইয়ের স্টল। সেই বইমেলারই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বসে আছি মঞ্চে, আরও কয়েক জন অতিথির সঙ্গে। এক অতিথি মাইকে কথা বলতে শুরু করেছেন সবেমাত্র। হঠাৎ ভাষণের মাঝপথে তিনি চুপ করে গেলেন। আমি অবাক। কিছু বুঝতে পারছি না। বক্তাও চুপ করেই দাঁড়িয়ে আছেন। আয়োজকদের এক জন আমাদের কাছে এসে খুব নিচু গলায় বললেন: “এখন আজান শুরু হয়েছে। বইমেলার বাইরেও তো মাইক আছে। যেন আজানের সময় মাইকের আওয়াজে বিঘ্ন না ঘটে, তাই বক্তাকে একটু নীরব থাকতে বলা হয়েছে।” এ বার খেয়াল করলাম, সত্যিই তো, আজানের সুর তো ভেসে আসছে! এ গ্রামে প্রবেশ করার সময় একটি ছোট মসজিদ পার হয়েছিলাম বটে। একটু পরেই আজান শেষ হল। বক্তা আবার তাঁর কথা শুরু করলেন।

এই হল আমাদের আসল বাংলা। আজান দেওয়া হচ্ছে মসজিদে, তাকে সম্মান জানিয়ে বক্তৃতারত ব্যক্তিকে নীরব থাকতে বলা হল। এই যে পারস্পরিক সম্মানদানের প্রথা বা ইচ্ছা, একে যাঁরা তোষণ বলেন, তাঁরা অনেকটাই বোঝেন না। আসগর আলি মণ্ডলরা, শফিকুল আলমরা এখনও বিজয়া করতে আসেন আমাদের বাড়ি। আমরা ইদের সময় তাঁদের বাড়ি ফিরনি খেতে যাই। সেই সম্প্রীতির মধ্যে বিষ মেশানোর চেষ্টা চলছে এখন” এটা কি সন্মান? যদি তাই হয় তাহলে মসজিদেরও কি সন্মানের দায়িত্ব থাকবে না? মসজিদ কবে সন্ধ্যার আরতীকে সন্মান জানিয়ে একটু পরে আজান দিয়েছে? সন্মানের কথাই যদি উঠল তাহলে বারবার আজানের সময়ই কেন শব্দ সংগীত ভাষা স্তব্ধ হয়ে যাবে? কখনো গির্জা, মন্দির কোন বইমেলা বা জনসভাকে থামিয়ে দিয়ে স্তব্ধ করল না কেন?

আজানকে সন্মান দেয়ার প্রশ্নটা আসছে কেন? যে যার মত যেমন চলবে। আজানের সঙ্গে কি গানের সংঘাত? কেন ও কিসের সংঘাত? কিসের কারণে আজানকে একা বাজতে দিতে হবে? না হলে কেন আজানের অসন্মান হবে? বাংলাদেশের মত ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে রোজার সময় দুর্গা পুজা হলে প্রশাসন থেকে বলে দেয়া হয় সন্ধ্যার মাগরিবের নামাজের সময় মন্ডবের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। সন্মানের এই জবরদস্তের সঙ্গে যারা পরিচিত তারা জানে আজান শুনলে সব থামিয়ে দেয়ার একটা প্রক্টিস আবহমানকাল জুড়েই বাংলায় ছিলো। মুঘল সুলতানী আমলে কি সে প্রক্টিস ছিলো না? সেটা রপ্ত হয়ে গেছে জেনারেশন বাই জেনারেশন।

আসলে আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কোন ইতিহাসই নেই। যা আছে তা পাশাপাশি থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেয়ার ইতিহাস। এটাকেই সহিষ্ণুতা বলছি আমরা। আজান দিলে বইমেলার বক্তা কথা বন্ধ করে চুপ করে যাবেন, অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে রইবে এটা একটা সম্প্রদায়ের পিঠ চাপড়ে দেয়ার মত। তোমরা নামাজ পড় আমরা বইমেলায় যাই- এইরকম কি? নাকি বইমেলার চেয়ে আজান বড়? ক্রিকেট মাঠে আজানের সময় পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের খেলা থামিয়ে দেয়াটা কবি দেখেছেন নিশ্চিয়? কি বলবেন এটাকে, সন্মান? বিপক্ষ দলকেও খেলা থামাতে বাধ্য করে, কোন রকম অনুমতির তোয়াক্কা না করে এই সন্মান কি আর ব্যক্তিগত থাকল? মাইকে ভোর চারটা বাজে আজান দিয়ে কি করে নিশ্চিত করে শুধুমাত্র নামাজী মুসলমানকেই সজাগ করার কথা ভাবা হয়েছে? মসজিদ কি সন্মান দেখিয়ে মাইকে আজান দেয়া বন্ধ করেছে? হিন্দুরা বৌদ্ধ খ্রিস্টানকে কেন মাইক দিয়ে আজান শুনতে বাধ্য করছে? তারা কি আজান শুনে মসজিদে যাবে? মন্দিরে সহিষ্ণুতার নির্দশন দেখিয়ে আজান প্রচার হয়েছে। কবে কোথায় কোন মসজিদে শাঁখ বাজতে শুনব? নাহলে ‘পারস্পরিক সম্মানদানের প্রথা’ সোনার পাথরবাটি হয়ে গেলো না? শুধু কি একপাক্ষিক এই সহিষ্ণুতা আর সন্মান? সহিষ্ণুতা কেন মসজিদ থেকে আসে না?

জয় গোস্বামীর ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উদ্দেশ্যেই এই লেখা ছিলো। আমি এই লেখা আরেকটি প্যারা তুলে দিচ্ছি যার সঙ্গে আমি দু্‌ইশো ভাগ একমত-
“দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলায় এসে এক আদিবাসী পরিবারে আহার করতে বসলেন। সেই ছবি ছাপা হল সংবাদপত্রে। কিন্তু আমরা ভুলে যাচ্ছি না তো যে, এই ‘আদিবাসী-দরদি’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিছিল থেকেই ছিটকে বেরিয়ে কয়েক জন যুবক বিদ্যাসাগরের মূর্তি খণ্ড খণ্ড করে দিয়েছিল? অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত তাঁর খাদ্যরুচির কথা প্রকাশ করেছিলেন বলে দেবলীনার বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয় এবং গণ-ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয় তাঁকে। আমরা পুরুষ, আমরা বুঝব না, গণ-ধর্ষণের হুমকির সামনে পড়লে এক জন নারী কতখানি অপমানবোধ করেন। বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি বলেছেন: “বাক্-স্বাধীনতার নামে দেবলীনা যা খুশি তা-ই বলতে পারেন না।” অর্থাৎ, এ বার আমাদের কথা বলার ইচ্ছেকেও বিজেপি দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। তা-ও কী নিয়ে কথা? রাজনীতি নিয়ে নয়, নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, খাদ্যরুচি নিয়ে”।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix