আকায়েদ উল্লাহ’র জিহাদের নেপথ্যে আল্লাহ কর্তৃক ঝুঁকিহীন ব্যবসার প্রতিশ্রুতি?

বাংলাদেশী আকায়েদ উল্লাহকে নিয়ে সবাই লিখবেন। একদল সব দোষ চাপাবেন ট্রাম্পের সম্প্রতি জেরুজালেমকে ইজরাইলের রাজধানী ঘোষণার স্বীকৃতিকে। আর তিন-চারটা ভাঙ্গা রেকর্ড তো রেডি আছেই, আকায়েদ সহি ইসলামের অনুসারী ছিলো না, সন্ত্রাসীদের কোন ধর্ম নেই …ইত্যাদি। বাম ভাই এবং ইসলামিস্ট ভাইরা অলরেডি সেটা করা শুরু করেছেন। এমনকি মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেন পরোক্ষভাবে আমেরিকায় আকায়েদ উল্লাহর মত যুবকদের অবাধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করার সুযোগ চাইছে! আমেরিকায় সুখ স্বাচ্ছন্দময় জীবন লাভ করেও অতিসাম্প্রতিককালের বাংলাদেশী মুসলমানদের ইসলাম কায়েম করতে গিয়ে ধৃত হওয়া কিছু কীর্তিমানের নাম দেখুন। ‘২০১৯ সালে ৭ জুন বৃহস্পতিবার বিকেলে নিউইয়র্ক সিটির জনবহুল ও বিখ্যাত টুরিস্ট স্পট টাইমস স্কয়ারে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিকল্পনা করার অভিযোগে কুইন্সের অধিবাসী বাংলাদেশী আশিকুল আলম (২২)-কে গ্রেফতার করা হয়। ২০০৪ সালে আগস্টে নিউইয়র্কের রাজধানী আলবেনিতে সন্ত্রাসবাদী পরিকল্পনার অভিযোগে আটক করা হয় সেখানকার সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত মসজিদে আস-সালামের ইমাম ইয়াসিন আরেফ (৩৪) ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেনকে (৪৬)। কাঁধে রেখে ছোড়া যায় এমন মিসাইল কিনে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন তারা। ইয়াসিন আরেফ ইরাকী হলেও মোহাম্মদ হোসেন বাংলাদেশী! ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর ১ হাজার পাউন্ডের নকল বিস্ফোরকভর্তি ট্রাকসহ ম্যানহাটনের নিউইয়র্ক রিজার্ভ ব্যাংকের ভবন থেকে আটক হয়েছিলো বাংলাদেশী রেজওয়ানুল আহসান নাফিস’। আমরা জানি না মনের গোপন ঘরে জিহাদের হিংসার আগুন কত অভিবাসী মুসলিমরা লালল করে আছে। আত্মসমালোচনা, নিজেদের ছেলেমেয়েদের ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ থেকে সংস্কৃতিমুখী করার উদ্যোগ যেখানে ছিলো কাঙ্খিত সেখানে মুসলিম বাবা-মাও চিরকালীন ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বে আস্থা রাখলেন। ছেলেমেয়েদের নির্দোষ দাবী করে এর পেছনে আমেরিকার মুসলিম বিদ্বেষকেই তারা দায়ী করেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলিও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের আইডোলজিকে আমলে না এনে এফবিআইকে সব দোষ দিয়ে পরোক্ষভাবে অপরাধপ্রবণ করে তোলার চেষ্টাই করছেন। একের পর এক বাংলাদেশী অভিবাসী তরুণরা কেন জিহাদের চেতনায় আত্মঘাতি হয়ে উঠছে তার হদিস না খুঁজে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ড্রামের নেত্রী কাজী ফৌজিয়া বলেছেন, ‘কয়েক শ মানুষ আমেরিকার জেলে আছে এমন সাজানো কেসে, তারা সবাই বাংলাদেশি নয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশি যুবকদের কেন টার্গেট করছে সেটা চিন্তার বিষয়।’ (নিউজ কাটিং: প্রথম আলো)

কেন আকায়েদ উল্লাহর মত মুসলিম তরুণরা জিহাদের চেতনায় আকৃষ্ট হয়? এর পিছনে কি ধর্মীয় কোন অনুপ্রেরণা আছে? কুরআন শরীফে স্বয়ং আল্লার জবানে বলা হয়েছে তিনি মুসলমনাদের সঙ্গে একটা ব্যবসা করতে চান। এমন ব্যবসা যেখানে নিশ্চিত প্রফিট, কোন ঝুঁকি নেই। আসুন কুরআন থেকেই পড়ি-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ [٦١:١٠]
تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ [٦١:١١]
يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ [٦١:١٢]
وَأُخْرَىٰ تُحِبُّونَهَا ۖ نَصْرٌ مِّنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ ۗ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ [٦١:١٣]
‘হে মুমিনগণ ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রণদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দিবে। (আর তা হচ্ছে এই যে) তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহ্র পথে তোমাদের  জান ও মাল দ্বারা জ্বিহাদ করবে। তোমাদের এ কাজই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম যদি তোমরা জান। তিনি তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে দিয়ে প্রবাহিত হয় নদীসমূহ ও (তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন) স্থায়ী জান্নাত সমূহের উন্নত আবাসস্থলে। আর এটাই হচ্ছে মহা সফলতা। আর তোমরা তো আখেরাতকে ভালবাস।আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য সমাগত ও বিজয় নিকটবর্তী। আর আপনি মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন’(আসসাফঃ ১০-১৩)।

আকায়েদ উল্লাহরা আমেরিকাতে শুরুতে বেশ্যালয় আর শুরিখানাগুলো চষে ফেললে তো এই আয়াত কেল্লাফতে! সব পাপ ধুয়ে মুছে সরাসরি জান্নাতে যেতে কে না চাইবে? বাংলাদেশী আকায়েদ উল্লাহ নিজের শরীরে বোমা বেধে নিজেও কাফেরদের সঙ্গে শহীদ হতে চেয়েছিলো। জিহাদ করতে গিয়ে শহীদ হলে কি মিলবে তা বিশিষ্ট আলেমদের ব্যাখাই সরাসরি কোট করে দিচ্ছি, ‘আল্লাহ্র কথা “يَغْفِرْ لَكُمْ زُنُوبَكُمْ” “তিনি তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন” এর অর্থ কী ?অবশ্যই সকল গুনাহ। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা  مِنْ زُنُوبِكُمْ  “তোমাদের কতিপয় গুনাহ” বলেনি। কুরআনে যে সকল স্থানে يَغْفِرْ لَكُمْ বলা হয়েছে, সেগুলির অধিকাংশের পরে مِنْ زُنُوبِكُمْ এসেছে। আর مِنْ زُنُوبِكُمْ আসলে অর্থ হয় কতিপয়। কিন্তু এখানে বলা হয়েছে শুধু زُنُوبَكُمْ । তাই এখানে অর্থ হবে সকল গুনাহ। কারণ, زُنُوبَ শব্দটি বহুবচন এবং তা كُمْ সর্বনামের সাথে সংযুক্ত। আর বহুবচন যখন সর্বনামের সাথে সংযুক্ত যুক্ত হয়, তখন ব্যাপকতার অর্থ প্রদান করে। অর্থাৎ, সকল গুনাহই ক্ষমা করা হবে এমনকি ঋণও’।

জিহাদ অর্থ্যাৎ বিধর্মীদের ধরে কুপাকুপি করাকে নামাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে ইসলামে মনে করা হয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রায় দিয়েছেন,

‘হানাদার যে শত্রু দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের ক্ষতি করে ঈমানের পর তাঁকে হঠানোর চেয়ে কোন বড় ফরয কাজ আর নেই’। কুরআন বলছে, ‘তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ দিয়ে জ্বিহাদ কর’(তাওবাহঃ৪১)। ‘তোমাদের জ্বিহাদের জন্য হাল্কা ও ভারি সরঞ্জাম নিয়ে বের হয়ে পড়’ (তাওবাহঃ৪১)।

জ্বি ভাই, জানি এখনি বলবেন জিহাদ মানে জঙ্গিবাদ না। জিহাদ মানে ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করা। জিহাদ মানে সন্ত্রাস নয়। আল্লামা ইবনে রুশদ বলেছেন, ‘যেখানে জ্বিহাদ শব্দটি সাধারণভাবে উল্লেখ হয়েছে, সেখানে জ্বিহাদের অর্থ কিতাল বিসসাইফ তথা তরবারী দ্বারা যুদ্ধ করা। আর কাফেরদের সাথে তরবারীর যুদ্ধ ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে, যতক্ষণ না তাঁরা লাঞ্ছিত হয়ে স্বীয় হস্তে জিযয়া না দিবে’। শায়খ আবদুল্লাহ আজম ক্ষুব্ধভাবে বলেন,

‘জিহাদের অর্থের পরিবর্তন করবেন না। জিহাদ মানে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করা। এটাই জ্বিহাদের শরয়ী অর্থ। চেয়ারে বসে চা পান ও আপেল খেয়ে ইসলাম সম্পর্কে লেখালেখি করা বা মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুতবা দেয়ার নাম জ্বিহাদ নয়’।

তো, মুমিন মুসলমান ভাইরা, আকায়েদ উল্লাহকে নিয়ে এবার আপনারা গর্ব করুন! সে তো আল্লার রাস্তায় জিহাদ করেছে! আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ [٩:١١١]
‘আল্লাহ মুমিনদের কাছে থেকে তাঁদের সম্পদ ও প্রাণসমূহ জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহ্র পথে লড়াই করবে এবং এতে তাঁরা (শত্রুদের) মারবেও এবং (শত্রুদের হাতে) মরবেও। এ ব্যাপারে যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে, তাতে তিনি অবিচল। আর আল্লাহ্র চেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী আর কে হতে পারে? অতএব, তোমরা যে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছ, তা নিয়ে আনন্দিত হও, আর এ হল মহা সাফল্য’(আততাওবাহঃ১১১)।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix