অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর উপর সাইবার বুলিং ও বাংলাদেশের ভবিষ্যত

চঞ্চল চৌধুরী একটা বেসরকারী টেলিভিশনের সঙ্গে ফোনে দু:খ করে বলেছেন, তার সঙ্গে কাজ করেন যে ‘শিল্পী সমাজ’ তারা কেউ প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসেনি। আমার প্রশ্ন হলো, কেন এগিয়ে আসবে ভাই? মোশাররফ করিম যখন বলেছিলো, ‘পোশাক নয় মানসিকতার জন্যই ধর্ষণ হয়’ তখন মুসলমানরা তার উপর চড়াও হয়, সে সময় আপনারা কেউ সরব হয়েছিলেন? শরীয়ত বয়াতিকে যখন গ্রেফতার করা হয়েছিলো, চোখের সামনে এত বড় মৌলবাদী উত্থান দেখে আপনারা চুপ করে ছিলেন কেন? ভাবেছেন এইসব অশিক্ষিত গরীব বয়াতিরা ঠিক ঢাকার কালচারাল সোসাইটির মধ্যে পড়ে না। ওরা কেন ধর্ম নিয়া গান করতে যায়? শরীয়ত বয়াতি, রিতা দেওয়ানদের উপর মুসলমানদের লাগাতার হুমকি, মামলার সময় আপনারা কেন চুপ করেছিলেন? ফরিদা পারভিন কেন চুপ ছিলেন? ভাবেছেন ওরা আমাদের ‘লেভেলের না’! ঠিক এটাই আপনার ক্ষেত্রে ঘটছে। আপনার সহশিল্পীরা মনে করছে আমরা তো আর ‘হিন্দু’ নই! আমাদের মায়ের সঙ্গে ছবি দিলে আমাদের মায়ের মাথায় হিজাব থাকবে…। ওরাও একদিন আপনার মত অসহায় বোধ করবে। কারণ তামিম সাবিকরা হজ করে নামাজের ছবি পোস্ট করেও বউয়ের ছবি পোস্ট করে গালি খায়। সাকিবের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে যারা খারাপ কথা বলেছিলো তাদের বিরুদ্ধে ক্রিকেটাররা রুখে দাঁড়ায়নি। কাজেই একদিন আফগান ক্রিকেটের মত ভাবিকালের ক্রিকেটারদের প্রবাসী ক্রিকেটও চালাতে হতে পারে। যদি এখন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হত তাহলে হয়ত সেই দিনটা কাউকে দেখতে হবে না।

চঞ্চল চৌধুরী, শাল্লার ঝুমন দাস আপনের গ্রেফতারের সময়ও তো আপনি/আপনারা কেউ প্রতিবাদ করেননি। একটা লুম্পেন মাওলানার সমালোচনা করে সে কি অন্যায় করেছিলো? ঝুমন এখনো জেলে পঁচছে। আপনার মত যাদের এদেশে সর্বক্ষণ ধর্মীয় পরিচয় অস্বস্তিকরভাবে আড়াল করে ‘মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, ‘বাঙালী মুসলমান’ যে দেশের প্রগতিশীলদের জাতীয়তাবাদ, সেই দেশে একজন ধর্মহীন শুধু্ই ‘মানুষ’ হবার চেষ্টা বা ভান ঝুমনের মত কেউ গ্রেফতার হলে আপনি হয়ত অস্বস্তির কারণেই চুপ থাকেন, পাছে আপনার সহকর্মীরা আপনাকে ‘হিন্দুর প্রতি দুর্বল’ ভেবে বসে! তাই আপনাকে নাসিরনগর, শাল্লা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার ঘটনাগুলোর সময় চুপ থাকাকে মেনে নিলেও আপনার সহকর্মীদের নিরবতার কি কারণ- সেটি আপনি একান্ত ভেবে দেখবেন। তারা মৌলবাদীদের নজরে পড়তে চায় না? আসলেই কি তাই? অন্তত এই সোশাল মিডিয়ার যুগে তাদের ফেবসবুক পোস্ট থেকে তাদের চরিত্র তো অনুমান করা যায়…।

চঞ্চল চৌধুরী একটা কবিতা লিখেছেন তার উপর সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বন্যা বয়ে যাবার পর। চঞ্চলের কবিতাটা এরকম: ‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, মানুষ নিয়ে নয়/ এমনি করে সভ্যতা শেষ, হচ্ছো তুমি ক্ষয়/ধর্ম রক্ষের ঝাণ্ডা তোমায় কে দিয়েছে ভাই?/ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করো, জ্ঞান কী তোমার নাই?/ সব ধর্মই এক কথা কয়, মানুষ সেবা করো/ধর্মের নামে ব্যবসা করে ভাবছো তুমি বড়…৷’

অসাধারণ কবিতা। আমি নিশ্চিত এই কবিতার পর আপনার ইনবক্সে চুপি চুপি আপনার সহশিল্পীদের শুভেচ্ছায় ভরে গেছে। তবে তফাতটা কি জানেন? বাঙালী মুসলমানকে যখন পাকিস্তানীরা ‘হাফ হিন্দু’ বলে মন্তব্য করেছিলো তখন মাওলানা ভাষানী বলেছিলেন, ‘আমরা যে মুসলমান সেইটা কি লুঙ্গি তুলে দেখাতে হবে’? আপনার সহশিল্পীদের দেখবেন সেই গল্প করছে খুশি মনে। ভাষানীর সেই প্রতিবাদ তাদের মনে ধরেছে। আজ যদি আপনি বলেন, আমি হিন্দু না মুসলমান আয় আমি প্যান্ট খুলে দেখাই” দেখবেন আপনার “সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ব” কি করে তারাই খুঁজে পায়! কত কিসিমের লোক যে দেখতে পাবেন তখন। “চঞ্চলকে যারা গালি দিয়েছে তাদের যেমন সমর্থন করি না, তেমনি চঞ্চলের অশ্লীল কথাকেও সমর্থন করি না”- এরকম জাস্টিফাই শোনার অভিজ্ঞাত আপনার নেই। আমাদের আছে। বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের উপর মুসলিম মৌলবাদীদের যে ক্রমাগত চাপ আস্ফল চলছে তার শুরুই হয়েছিলো ব্লগার কিলিংয়ের মাধ্যমে। বলাই বাহুল্য সেসময় আপনারা সকলেই চুপ ছিলেন। আমরা কিন্তু আপনাদের কারোর সময়ই চুপ করে থাকিনি…।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সর্বশেষ

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix