অন্যসব ধর্ম থেকে ইসলামের সমালোচনা কেন বেশি করা হয়?

কেন ইসলাম নিয়ে বেশি লিখতে হয়? কেন অন্য ধর্ম ও ধার্মিকরা বেশি প্রাধান্য পায় না? একটু চোখকান খোলা থাকলে আর জেগে না ঘুমালে বুঝতে পারবেন কেন ইসলাম নিয়ে এতবেশি সমালোচনা হয়। আজকে একটা ইসলামিক জঙ্গির পোস্টে ‘হালাল খাবার’ বিষয়ক পোস্টে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মেরিনে কাজ করা বাংলাদেশী ছেলেরা, ইউরোপ প্রবাসী ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারা কমেন্ট করছিলো কি করে তারা হালাল মাংস ভেবে খাবেন? ফাস্টফুডে যে মাংস দেয় সেটাকি বিসমিল্লাহ বলে জবাই করা হয়, শুকোর রান্নার পাত্রেই যদি গরুর মাংস রান্না করে, এ কারণে মুসলিম দোকান থেকে ক্রয় করি…। এগুলো হচ্ছে অবস্থা। শিক্ষিত ও উন্নত দেশে বসবাস করা, বহু জাতি সভ্যতার কাছাকাছি থেকেও কেন একটা মাল্টিকালচার নিজেদের মধ্যে রপ্ত করতে পারল না? কই হিন্দুদের তো বিশেষ কোন শপ দেখা যায় না? তারা তো এককালে ভীষণ ছোঁয়াছুঁয়ির জালে বন্দি ছিলো, কিন্তু তারা ইউরোপ আমেরিকায় বিশাল কমিউনিটি গড়ে তুললেও কখনো এরকম হারাম হালাল নিয়ে তো চিন্তিত হয়নি। আমার বন্ধু ইতালিতে শেফের কাজ করে। রোজ তাকে গরুর মাংসের রেসিপি টেস্ট করতে হয়। অথচ সে ধর্ম বিশ্বাসী হিন্দু। তার কথা, ‘ধর্মের চেয়ে কর্ম বড়’! কিন্তু মুসলিমরা কি অনুসন্ধান করে? মাংস হালাল কিনা? বিসমিল্লাহ বলে জবাই কিনা? শুকরের মাংস বিক্রি করে এমন দোকানের চাইতে “হালাল শপ” থেকে শপিং করা ভালো। বডি স্পেতে এ্যালকহল নেই তো? বেগানা নারীদের সঙ্গে হাত মেলানো যাবে না!… এরকম একটি সম্প্রদায়কে নিয়ে কথা বেশি হবে না কেন? তাদের ধর্মীয় রাষ্ট্র চাওয়া ও পৃথিবীর সকলকে মুসলমান বানানোর মিশন মিলে তাদেরকে পরিণত করেছে ভয়ানক এক ধর্ম সম্প্রদায়।

ধর্মের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে খিস্ট ধর্মের উপর বল প্রয়োগ করেছিলো ইউরোপীয়নারা। তাদের রেঁনেসা এসেছিলো খিস্ট ধর্মের তীব্র সমালোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণ যা জনগণকে সজাগ করেছিলো। কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে সেরকম কিছুর আগমন কখনোই ঘটেনি। এখন ইন্টারনেটের যুগে সেরকম লেখালেখিকে বামপন্থি ও লিবারাল দাবীদারদের কাছে “ইসলাম বিদ্বেষী”! ভাবা যায়? আপনি জিহাদ, কতল, জিজিয়া কর, যুদ্ধবন্দিনী, গনিমতের মাল, খিলাফত, তিন তালাক, বহু বিবাহ, পর্দা প্রথার সমালোচনা করলে সেটা হবে “ইসলাম বিদ্বেষ”! তাহলে কি করে মুসলমানদের আপনি আধুনিক করে তুলবেন?

সম্প্রতি একজন বামপন্থির লেখা একজন আমার নজরে এনেছেন যিনি দাবী করেছেন, বোরখা বা পুরো শরীল ঢেকে রাখার যে পর্দা সেটা ইসলাম পূর্ব জাহিলি যুগের পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তাদের প্রিয় নবীজি ও ইসলামের নাকি এরকম বর্বর প্রথা নেই। এগুলো হচ্ছে পৌত্তলিক জাহিলি সংস্কৃতি! তাহলে দেখুন ইসলাম কি বলেছে-

“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (১)

মুহাম্মদের অধিক প্রিয় সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরকে আদেশ করেছেন যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে তখন যেন মাথার উপর থেকে ওড়না/চাদর টেনে স্বীয় মুখমন্ডল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে। (২)

পরিস্কার করে মুহাম্মদের সান্বিধ্য পেয়েছেন এমন একজন সাহাবী বলছেন কুরআনের এই আয়াত দিয়ে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন নারীরা মুখ ঢেকে ফেলবে চাদর দিয়ে এবং একচোখ কেবল খোলা রাখবে চলাচলের সুবিধার্থে! অথচ ভাম ভাইটি বলছে আপাদমস্তক বোরখায় ঢেকে রাখার বিধার ‘জাহিলি যুগের পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি’। শুনলে আশ্চর্য হবেন ইসলাম পূর্ব কথিত জাহিলি যুগেই (অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ) ছিলো নারীর মুখ খুলে চলার সংস্কৃতি! কুরআনে এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত কথিত জাহিলি যুগের মেয়েরা ছিলো চলাফেলার স্বাধীন। কুরআনে আয়াত ডা্‌উনলোড হলো, “তারা যেন গ্রীবা ও বক্ষদেশ মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে” (৩)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা এই আয়াতের প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে বলেন, “এই আয়াত নাযিল হলো যখন তখন তারা নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করেছিলেন” (৪)। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন- “‘ফাখতামারনা’ অর্থ তারা মুখমন্ডল আবৃত করেছেন” (৫)। আল্লামা আইনী ও আল্লামা শানকীতী বলেন এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর নারীরা তাদের চাদের এক অংশ ছিঁড়ে মুখ ঢেকে ফেলে (৬)।

ইসলাম নারীদের শুধুমাত্র শরীরের কাপড় দেখা যাবে সেরকম অনুমতি ছাড়া মুখ হাত দেখা যাবে তার কোন অনুমতি দেয়নি সেরকম একটি আয়াত নাযিল হলো সুরা নূরে। “(হে নবী!) মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ থাকে তা ছাড়া নিজেদের আভরণ প্রদর্শন না করে” (৭)। এই আয়াতের ব্যাখা করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, যে, ‘সাধারণত যা প্রকাশিত’ অর্থ হচ্ছে কাপড়’ (৮)। মানে কাপড় দেখা যাবে মুখ চোখ নাক চুল হাত পা নয়! নবীর একদম কাছের ও প্রিয় সাহাবী একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যেখানে ইসলামের নারীর পর্দার বিধান একদম পরিস্কার করে দিয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “নারী হল সতর তথা আবৃত থাকার বস্ত্ত। নিশ্চয়ই সে যখন ঘর থেকে বের হয় তখন শয়তান তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। আর সে যখন গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে তখন সে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকে (৯)।

তো এই হচ্ছে ইসলামে নারীর পর্দার বিধান। অথচ বাম ভাইটি ইসলামকে ‘হেফাজত’ করতে গিয়ে বললেন এগুলো ইসলামের আগে পৌত্তলিক কাফের মুশরিকদের পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি। মানে তার প্রিয় নবীজি কিছুতে বর্বব পর্দা প্রথা দিতে পারেন না। অথচ ইসলাম পূর্ব যুগেই বিবি খাদিজা যিনি মুহাম্মদের প্রথম স্ত্রী, তিনি ব্যবসা করতেন এবং পুরুষ কর্মী নিয়োগ করতেন তার প্রতিষ্ঠানে। মুহাম্মদ ২৫ বছর বয়েসে তার প্রতিষ্ঠানেই চাকরি নিয়েছিলেন। ইসলাম পূর্ব যুগে সমাজে নারীর যে প্রবল ক্ষতায়ন ছিলো তার একটি উদাহরণ আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ। তাকে মক্কার সকলেই ভয় করে চলত। শলা পরামর্শ বৈঠকে হিন্দের উপস্থিতি প্রমাণ করে নারী নেতৃত্ব সেযুগে ছিলো। হিন্দ যখন আবু সুফিয়ানকে তালাক দিয়েছিলো তখন সে একাই বাকী জীবন কাটিয়েছিলো। এখানে নারী নিজের দায়িত্ব ও নিজ অভিভাবক হওয়ার প্রমাণ মেলে যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ ইসলাম প্রেমি ভামরা এখন পর্দা ও নারী বৈষম্যের দোষ ইসলাম পূর্ব আরব উদার সংস্কৃতির ঘাড়ে চাপাচ্ছে। এগুলো প্রতিবাদ না হলে নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হবে। সত্য লিখে রাখা তাই অতিব জরুরী…।

…………………………………………

(১) সূরা আহযাব : ৫৯

(২) ফাতহুল বারী ৮/৫৪, ৭৬, ১১৪

(৩) সূরা নূর : ৩১

(৪) সহীহ বুখারী ২/৭০০

(৫) ফাতহুল বারী ৮/৩৪৭

(৬) উমদাতুল কারী ১৯/৯২

(৭) সূরা নূর : ৩১

(৮) তাফসীরে তাবারী ১৮/১১৯

(৯) আলমুজামুল আওসাত, তবারানী

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক পেজ

সাবস্ক্রাইব করুন

শেয়ার করুন

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on google
Google+
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit
Share on tumblr
Tumblr
Share on telegram
Telegram
Share on pocket
Pocket
Share on skype
Skype
Share on xing
XING
Share on stumbleupon
StumbleUpon
Share on mix
Mix